একটা রাষ্ট্র স্বাধীন হওয়ার পর যদি সেই রাষ্ট্রই তার নিজ নাগরিকদের দেশদ্রোহী বা দেশবিরোধী হিসেবে ঘোষণা দিতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে রাষ্ট্রটির ভিতেই কোথাও গুরুতর সমস্যা আছে। যেন শুরু থেকেই সেই রাষ্ট্র একটি মৌলিক ফল্ট নিয়ে তার যাত্রা শুরু করেছে ।
কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে এটা স্বাভাবিক হতে পারে না যে, তার নিজের নাগরিক ,যে তার স্বজাতি, স্বভাষা, স্বধর্ম ও স্বসংস্কৃতির মানুষ তাকেই শত্রু বানিয়ে ফেলবে।
তাই একাত্তরের পক্ষের শক্তি , বিপক্ষের শক্তি, জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি, জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তি এই বিভাজনের রাজনীতি শেষ করতে হবে।
একটি রাষ্ট্রকে সাসটেন করতে হলে পুরো সমাজকে কোনো না কোনোভাবে ইন্টিগ্রেট করতে হয়। বিভিন্ন দর্শন, মত ও পার্থক্যের মানুষকে আপনাকে ইন্টিগ্রেট করতে হবে।
আপনি একাত্তরের বিপক্ষের শক্তি কিংবা জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তিকে অপরাধী বলতে পারেন। বলতে পারেন তারা দেশের আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ করেছে, এবং সেই অপরাধের জন্য তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যেতে পারে। কিন্তু তাদের দেশবিরোধী বা দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করা সমস্যার সমাধান নয়। আর এই শত্রু-শত্রু খেলা যাকে তাকে রাষ্ট্রবিরোধী বা দেশদ্রোহী ঘোষণা করা, এটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের ভেতরেই গভীর বিভাজন তৈরি করে। আর একটি গভীরভাবে বিভক্ত সমাজ বা রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।
কারণ দেশদ্রোহী বা দেশবিরোধী এই লেবেল এমন এক জিনিস, যা কখনো শেষ হয় না; বরং ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। দেখেন আমরা ৫০ বছরেও একাত্তর বিরোধীদেরকে ইন্টিগ্রেট করতে পারেনি , যাকে তাকে ৭১বিরোধী বানায় দিয়েছে, এই কারণেই জুলাই হয়েছে। আবার এই জুলাইয়ের বিরোধীদেরও যদি আপনি ইন্টিগ্রেট না করতে পারেন , আবার কোন বিপ্লব আন্দোলন হবে না তার নিশ্চয়তা আপনি দিতে পারেন না। সুতরাং ৭১ বিরোধীদেরকেও আপনাকে সোসাইটিতে ইন্টিগ্রেট করতে হবে, তেমনি জুলাইয়ের বিরোধীদেরও আপনাকে সোসাইটিতে অ্যাডাপ্ট ইনটিগ্রেট করতে হবে।
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ,সে তার রাষ্ট্রের বিরোধীদেরও জায়গা দেয়। এমনকি যারা রাষ্ট্রের প্রচলিত দর্শনের বিপরীত চিন্তা করে, তাদেরও সেই রাষ্ট্রের ভেতরে থাকার ও মত প্রকাশের সুযোগ দেয়।
রাষ্ট্রের কাজই হলো বহুমত ,পথ ও দর্শনের মানুষকে একত্রে রাখা, ইন্টিগ্রেট করা। বাংলাদেশেও শেষ পর্যন্ত সেই কাজটাই করতে হবে, সব মানুষকে একই রাষ্ট্রের ভেতরে জায়গা দিয়ে, একসাথে নিয়ে।
No comments:
Post a Comment