গত দুই দিন আগে ইন্ডিয়া তে একটা খুবই ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটে গেছে। ভারতের চিফ জাস্টিস বা প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তার এক শুনানিতে কর্মহীন যুবকদের ককরোচ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে অভিহিত করেছেন বলে সোশ্যাল মিডিয়া তে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এর ফলশ্রুতিতেই ক্ষুব্ধ ইউথরা স্যাটায়ার ও ফ্রাস্ট্রেশন এর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে 'কক্রোচ জনতা পার্টি ' বা সিজেপি নামে একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করে বসেছে।
সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, পিওরলি স্যাটায়ারিক্যাল ও সোশ্যাল মিডিয়া ড্রিভেন এই উদ্যোগটি মাত্র দুই দিনের মধ্যেই প্রায় সেভেন মিলিয়ন ফলোয়ার ক্রস করে ফেলেছে। এটা শুধু মিম কালচারের জনপ্রিয়তা না বরং ইউথ ফ্রাস্ট্রেশন, আনএমপ্লয়মেন্ট ক্রাইসিস, রাজনৈতিক ডিসকানেক্ট এবং মেইনস্ট্রিম পলিটিক্স এর প্রতি অনাস্থারও একটা প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ।
একটা রাষ্ট্রের ইউথ কতটা অসহায় হইলে, সরকার ইউথ রিলেটেড বিষয়গুলাকে কতটা ইগনোর করলে, স্যাটায়ার করে তৈরি করা একটা দল 'কক্রোচ জনতা পার্টি' দুই দিনের মধ্যে প্রায় সেভেন মিলিয়ন ফলোয়ার ক্রস করে, সেটা চিন্তার বিষয়।
আপনি চিন্তা করেন, দেখেন নেপাল কিংবা বাংলাদেশ এর ইউথরা যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের কথা, বার্তা, চিন্তা-চেতনা প্রকাশ করতে পেরেছে, ইন্ডিয়া তে কিন্তু সেই জায়গাটা অনেক সীমিত।
একেতো ভারতের মিডিয়া ব্যাপক বেশি সরকার ঘেষা তার চেয়েও তাদের সুশীল সমাজের মানুষেরা খোলাখুলি ভাবে সরকারবিরোধী কথা বলতে ব্যাপক ভয় পাই, কারণ বর্তমান যে সরকার বিজেপি তারা মূলত ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের উপর নির্ভর করেই ক্ষমতায় আছে। আর তাদের অধিকাংশ জনগণ বা তার সাপোর্টারেরা মোটামুটি অশিক্ষিত কিবা কম শিক্ষিত হলেও ধর্মের প্রতি তাদের একটা আলাদা অন্ধ ভক্তি রয়েছে । ভারতের অধিকাংশ জনগণকে আমি অশিক্ষিত বলছি না; কিন্তু জনগণের একটা বড় অংশের রাজনৈতিক মতামত রিলিজিয়াস সেন্টিমেন্ট এর ওপর হেভিলি নির্ভরশীল। যারা কর্মসংস্থান ,স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা কিবা সুন্দর সরকারি ব্যবস্থার চাইতেও ধর্মীয় সরকারকে বেশি গুরুত্ব দেয় ।
ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপিও মূলত এই রিলিজিয়াস সেন্টিমেন্ট এর ওপর নির্ভর করেই ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তারা একটা জায়গায় ভুল করছে। রিলিজিয়াস সেন্টিমেন্ট হয়তো একটা দলকে ক্ষমতায় বসাতে পারে, হয়তো বিশ-পঁচিশ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখতেও পারে। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর জনগণকে খাদ্য দিতে হয়, জব ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়, বিচারব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে হয়, এবং রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে হয়।
এই জায়গাগুলোতে ব্যর্থতা তৈরি হলে মানুষের ফ্রাস্ট্রেশন অন্যভাবে প্রকাশ পায়।
'কক্রোচ জনতা পার্টি'র মতো স্যাটায়ারিক্যাল রাজনৈতিক প্রতীক তখন শুধু মিম থাকে না, এটা ইউথ ফ্রাস্ট্রেশন এর কালেক্টিভ এক্সপ্রেশন হয়ে যায়। অনেকে এটাকে সিরিয়াসলি নেওয়া শুরু করে, কারণ তারা মূলধারার রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পায় না।
আর এই কারণেই ভারতের এই ঘটনাটা আরও ইন্টারেস্টিং, ভারতের চিফ জাস্টিস বা সিজিআই সূর্য কান্ত এক শুনানিতে কর্মহীন যুবকদের 'ককরোচ' বা তেলাপোকা ধরনের উপমা দেওয়ার পর থেকেই জনতা ও বুঝতে পারে তারা মূলত ককরোচই , আর এই থেকেই তৈরি হয় এই পলিটিক্যাল পার্টি। সোশ্যাল মিডিয়াতে এই 'কক্রোচ জনতা পার্টি' নিয়ে ব্যাপক স্যাটায়ার শুরু হয়। ইউথরা সেই অপমানসূচক শব্দকেই উল্টো আইডেন্টিটি ও প্রতিবাদের ভাষায় কনভার্ট করে ফেলেছে।
আপনি এইটার সাথে বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনে রাজাকার শব্দটাকে তুলনা করতে পারেন। যদিও বাংলাদেশে রাজাকার শব্দটা অপমানসূচক কিন্তু জুলাই আন্দোলনে সরকার যখন তাদেরকে রাজাকার হিসাবে ঘোষণা দিল, ছাত্র জনতা রাজাকার শব্দের মাধ্যমেই নিজেদেরকে চিত্রায়িত করতে পারছিলেন, নিজেদের ক্ষোভকে উগলে দিতে পারছিলেন এবং একটা প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী সরকারের বিরুদ্ধে তাদের ফ্রাস্টেশন ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করতে পারছিলেন, আর সরকারকে উৎখাত করতে পারছিলেন।
এটাই ফ্রাস্ট্রেশন এর একটা ক্লাসিক রূপ যখন মানুষ সরাসরি রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে না, তখন তারা স্যাটায়ার, মিম, আয়রনি এবং ডিজিটাল কালচারকে অস্ত্র বানায়। কারণ তারা অনুভব করে যে তাদের বাস্তব সমস্যা জব ক্রাইসিস, এক্সাম করাপশন, ইনইকুয়ালিটি, সোশ্যাল প্রেসার, ফিউচার ইনসিকিউরিটি এসব নিয়ে রাষ্ট্রের আগ্রহ কম, কিন্তু সিম্বলিক পলিটিক্স নিয়ে আগ্রহ বেশি।

No comments:
Post a Comment