ধর্ম বনাম সমাজ
প্যানিক পলিটিক্স ও আল্ট্রা সেক্যুলার এলিট শাহবাগী!
এক.
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইনে নারী নিপীড়ন, হেনস্তা এবং ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের নামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসছে। তবে প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনা কি আকস্মিকভাবে বেড়ে গেছে, নাকি আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার হার বেড়েছে? বিষয়টি সরল নয়, বিগত সময়েও নারীরা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তবে বর্তমানের পার্থক্য হলো এসব ঘটনা শহরকেন্দ্রিক এবং মিডিয়ার কাভারেজের আওতায় আসছে। একইভাবে, অন্যান্য অপরাধ যেমন চুরি, ছিনতাই এগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই, ঘটনাগুলোর অধিকাংশই ঢাকা ও আশপাশের শহরকেন্দ্রিক। প্রায় প্রত্যেকটা ঘটনায় দ্রুতই মিডিয়া কভারেজ পাচ্ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটি কি নিছকই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে? আমার কাছে মনে হয়েছে এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক, সামাজিক, সংস্কৃতিক ও তামুদ্দনিক ক্ষমতার লড়াই।
দুই.
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী শহুরে এলিট শ্রেণী আধিপত্য বিস্তার করেছিল,যারা নিজেদেরকে হাজার বছরের খাঁটি বাঙালি পরিচয় দিয়ে এসেছে। যাদের অনেকেই বামপন্থী, সেক্যুলার বা লিবারেল দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। গত দুই-তিন দশক ধরে তারা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশি সমাজকে প্রভাবিত করেছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, টিভি-সিনেমা ও একাডেমিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এদের অনেকে শাহবাগী, সুশীল,বা প্রগতিশীল বলে পরিচিত হলেও, এদের আসল পরিচয় হলো—তারা ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক হেজেমনি প্রতিষ্ঠাকারী শ্রেণী।
এই শ্রেণী একটি ডি-ফ্যাক্টো (de facto) বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল, যেখানে তারাই নির্ধারণ করত, কীভাবে বাংলাদেশি সমাজ চিন্তা করবে, কোন নৈতিকতা গ্রহণযোগ্য হবে, এবং কোন বিশ্বাস বা রীতিনীতি আধুনিকতার মানদণ্ডে টিকবে। সাধারণ জনগণ তাদের এই একচেটিয়া আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করলেও, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমর্থনের এবং, ডেমোক্রেসির অনুপস্থিতির ফলে তারা এটি বজায় রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে হাসিনা শাহীর সাথেই এই এলিট শ্রেণীর ক্ষমতার পতন ঘটে। তারা বুঝতে পারে যে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের হেজেমনিক ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাদের স্থানচ্যুতি ঘটেছে। ফলে তারা একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করছে—গণমাধ্যম এবং নগরভিত্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তিন.
এই সাবেক কালচারাল ফ্যাসিস্ট এলিট শ্রেণী এখন এক ধরনের প্যানিক পলিটিক্স (panic politics) বা আতঙ্ক-সৃষ্টির রাজনীতি অনুসরণ করছে। তারা প্রচার করছে যে, নারীদের স্বাধীনতা ভয়াবহ হুমকির মুখে, রাস্তাঘাটে নারীরা নিরাপদ নয়, ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বাড়ছে, এবং বাংলাদেশ আরও রক্ষণশীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এটা সত্য যে, সমাজে নারীরা নিপীড়নের শিকার হয়, এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোও নারীবিরোধী বক্তব্য দেয়। তবে প্রশ্ন হলো, এই সাবেক এলিট শ্রেণী হঠাৎ করে নারী অধিকারের বিষয়ে এত উদ্বিগ্ন হলো কেন? এর উত্তর নিহিত রয়েছে তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টায়। তারা চায় একটি সামাজিক মেরুকরণ সৃষ্টি করতে, যেখানে একদিকে থাকবে তথাকথিত প্রগতিশীল গোষ্ঠী এবং অন্যদিকে থাকবে রক্ষণশীল বা ইসলামপন্থী গোষ্ঠী। এই মেরুকরণের মাধ্যমে তারা নিজেদের হারানো রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে চায়।
ফলে তারা শহরকেন্দ্রিক ঘটনাগুলোকে সামনে এনে জাতীয় পর্যায়ে সংকট তৈরি করতে চায়। তাদের কৌশল হলো মিডিয়া ও সংস্কৃতি জগতে আধিপত্য বজায় রাখা, নারীবাদী ও সেক্যুলার এজেন্ডাকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের উপর প্রভাব বিস্তার করা ইসলামপন্থীদের সাথে দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়া, যাতে সমাজের দুই প্রান্তে দুটি চরমপন্থী অবস্থান তৈরি হয় এবং তারা নিজেদের আধুনিক ও মানবিক গোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, রাজনৈতিক পুনরুত্থান ঘটানো। সমাজে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাষ্ট্রকে বাধ্য করা যাতে তারা সাংস্কৃতিক পরিসরে আবারও জায়গা ফিরে পায়। তাদের এই পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছে শহরে আরবান নারী ও সামাজিক মাধ্যম ইউজ করা নারীরা।
চার.
বাংলাদেশে নারী নিপীড়ন, ধর্মীয় উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সংঘাত নিছকই সামাজিক ঘটনা নয়—এটি একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের লড়াই। সাবেক শহুরে এলিট শ্রেণী তাদের হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে প্যানিক সৃষ্টি করছে, এবং শহরকেন্দ্রিক বাস্তবতাকে ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। আমাদের এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে শুধুমাত্র মিডিয়ার প্রচারিত চিত্র নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করা হবে। না হলে, আমরা শুধুমাত্র এক শ্রেণীর প্রোপাগান্ডার শিকার হবো এবং বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব হবে না।
শহুরে ফেমিনাজির ভুল আন্দোলন
শহুরে ফেমিনাজিরা তাদের স্বাধীনতা চাই। স্বাভাবিক, বাট সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে গেছে যে নারীরা শুধু বিড়ি খাওয়ার স্বাধীনতা চায়!
নারীর স্বাভাবিক জীবনযাপনের যে স্বাধীনতার আন্দোলন, তার একটি নেগেটিভ বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। বাংলার পিছিয়ে পড়া সাধারণ নারীদের প্রকৃত অধিকার, ন্যায্যতা এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, তা শহুরে নারী সমাজের ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নারীদের বিলাসী ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের স্বাধীনতার আন্দোলনের মাধ্যমে থমকে গেছে। এজন্য কি এই শহুরে নারীরা দায়ী থাকবে না?
বিপ্লবী বোন আমার, আপনার বিড়ি খাওয়ার স্বাধীনতার চেয়ে, গ্রামের মহিলা বেগমের স্বামী পুরষ আলী তাকে যে প্রতিদিন প্রহার করে, সেই নির্যাতন থেকে মুক্ত হওয়ার স্বাধীনতা, কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলার নুনুতন্ত্রের দায় কি ধর্মের ওপরই বর্তায়?
অনেকের মতে বাংলাদেশে 'নুনুতন্ত্র' (পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থা) বা প্যাট্রিআর্কি বিরাজ করছে ব্যাপকভাবে এবং এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ধর্ম ও হুজুর আর নারী বিদ্বেষী পুরুষ সমাজ। অনেকের মতে তাদের কারণে নারীদের প্রতি এত অসহিষ্ণুতা, অসহনশীলতা এবং ভায়োলেন্স। বাট রিয়ালিটি কি তাই?
আমাদের বুঝতে হবে পুরা পৃথিবীর সমাজ বা রাষ্ট্রই চলে পেট্রিয়ার্রকির উপর দিয়া সুতরাং আলাদাভাবে শুধু বাংলাদেশকেই দায়ী করা বা বাংলাদেশের পুরুষ সমাজ বা ধর্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো টা আসলে সঠিক জ্ঞানের পরিচয় না বা হয়তো জানাশোনার অভাবেই এই দায় দেওয়া। আমি যদি ধরি যে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নয়ন হয়েছে এমন একটা দেশকে, তাহলে আমি দেখতে পাবো প্যাট্রিআর্কি কতটা গভীরভাবে প্রোথিত এসব দেশে ! আচ্ছা উদাহরণ হিসাবে জাপানের কথা ধরি, ভদ্রতায় সুশীলতায় কিবা সামাজিক প্রথার সর্বোচ্চ ইতিবাচক উদাহরণ যেখানে বিরাজমান সেই জাপানের সোসাইটি হচ্ছে ৯০% পেট্রিআর্কি এর উপর, যেখানে সমাজের এবং রাষ্ট্রের এমন কিছু নেই যা পুরুষ দ্বারা শাসিত না বা চালিত না এবং জাপানি সোসাইটি নারীর প্রতি যত কনজারভেটিভ ধারণা পোষণ করে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। নারীদের প্রতি জাপানিজ পুরুষদের যে দৃষ্টিভঙ্গি আপনার কাছে খুবই ব্যাকডেটেড মনে হবে। সুতরাং জাপানি সোসাইটির পুরুষেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বা ক্ষমতায়নে নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এর সাথে যদি বাংলাদেশী পুরুষদের যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটা তুলনা করেন আপনি অবশ্যই বাংলাদেশের পুরুষদেরকে আগায় রাখতে বাধ্য হবেন।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশে তাহলে এত বেশি নারীর প্রতি ভায়োলেন্স কেন? উত্তর হচ্ছে দারিদ্রতা। বাংলাদেশে নারীর প্রতি যে ভায়োলেন্স তার একমাত্র কারণ হচ্ছে দরিদ্র, গরিবি এবং আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে এখনো নিজে থেকে সাবলম্বী হতে না পারা সুতরাং নারীর প্রতি যে ভায়োলেন্স, এই ভায়োলেন্সের জন্য ধর্মকে দায়ী করা কিংবা সমাজের সমস্ত পুরুষকে কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে দেওয়া এটা আসলে পজেটিভ বার্তা পৌঁছে দেয় না।
দেখেন বাংলাদেশের সোসাইটি অর্থনৈতিকভাবে প্রগ্রেসিভ না হলেও সোশ্যাল যে লার্নিং প্রসেস এই লার্নিং প্রসেসে আমাদের নারীরা এখন অনেক বেশি প্রগ্রেসিভ, এরা গোটা বিশ্ব এবং বিশ্বায়নের সমস্ত ধ্যান ধারণা তাদের মধ্যে আছে এবং তারা নিজেদের যে রোলস এবং রাইটস এটা নিয়ে তারা সচেতন এবং একই সাথে তাদের প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে প্রচুর ভোকাল ফলে তাদের যে সামাজিক মর্যাদাহীন অবস্থা বাংলাদেশে নাই এইসব নিয়ে তারা কথা বলে। আমাদেরকে এটাও বুঝতে হবে নারীর প্রতি ভায়োলেন্স এইটার জন্য যতটা না আমাদের সোশ্যাল রিলিজিয়ন কিংবা সোশ্যাল পিপলসের দায়, তার চেয়ে দায়টা বেশি রাষ্ট্রের উপর যায়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রটা পুরোটাই হচ্ছে সেকুলার কিন্তু বাংলাদেশের সোসাইটি ও সোশ্যাল সিস্টেম সেকুলার না হলেও পুরোপুরি মিক্সড প্রথাভিত্তিক অর্থাৎ এখানে ধর্মই যে শুধু আমাদের সোসাইটির কালচার, সংস্কৃতি, প্রথা কিবা ধ্যান ধারণা তৈরি করে তা কিন্তু না ধর্ম জাস্ট একটা পার্ট, ছোট্ট পার্ট। বাংলাদেশের মানুষের যে চিন্তা প্রসেস, এখানে ধর্ম শিক্ষাব্যবস্থা, সাহিত্য, নাটক, সিনেমা, গান এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী যে বিষয়টা সেটা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাপকভাবে বাংলার মানুষের থট প্রসেসকে ধারণ করে আছে। সুতরাং ধর্মকে দায় দিয়ে আপনি পার পেয়ে যাবেন না। এবং আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া এটা এত বেশি মিসোজিনিস্ট আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। সুতরাং নারীর প্রতি ভায়োলেন্সের জন্য ধর্মকে এবং হুজুরদের তাই দেওয়া বন্ধ করেন।
বাংলার মানুষের নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা চেতনার পরিবর্তনে অবশ্যই এসব বিষয়ের খেয়াল রাখতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতি: বিরোধিতার সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ
১.
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধিতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা যেন এক অনিবার্য বাস্তবতা। আমরা রাজনীতিকে এমনভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, এক দল অপর দলের বিরুদ্ধে লেগে থাকাই যেন রাজনীতির মূল চেহারা। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রতিপক্ষকে শুধু বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করে, যা প্রায়শই ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সংঘাতে পরিণত হয়। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এতটাই তীব্র যে, রাজনীতির সুস্থ পরিবেশই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা একে অপরকে সহ্যই করতে পারে না; সুযোগ পেলে হয়তো প্রতিপক্ষকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতেই উদ্যত হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই চরম বিরোধিতার শেকড় কোথায়? বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিক বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু তা কি শুধু ঘৃণার ওপর ভিত্তি করে চলবে? ৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হলেও এই বিদ্বেষমূলক রাজনীতির পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বরং বিরোধিতা আরও চরম রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন এখন আদর্শ বা নীতির লড়াই নয়, বরং ব্যক্তিগত আক্রমণ, ষড়যন্ত্র ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার এক নোংরা খেলা।
২.
একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শ, নীতি ও পরিকল্পনার প্রতিযোগিতা। জনগণ তখন বিচার করতে পারবে, কোন দলের নীতি ও দর্শন দেশের জন্য উপযোগী। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সরকার পরিবর্তন হয় জনগণের রায় অনুযায়ী, যেখানে আদর্শের প্রতিযোগিতায় যোগ্য দল জয়ী হবে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আদর্শ মানুষের কাছে তুলে ধরার পরিবর্তে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচারে বেশি মনোযোগী। ফলাফল—জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত আদর্শ সম্পর্কেই জানে না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক শিক্ষার অভাব। জনগণকে রাজনীতির শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর, কিন্তু দলগুলোর মধ্যেই রাজনৈতিক পরিপক্বতা নেই। তাদের রাজনীতি একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গোষ্ঠীসংঘর্ষে রূপ নিয়েছে, যেখানে নীতি ও আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা দখলই প্রধান লক্ষ্য। এই অদূরদর্শী রাজনীতির কারণে দলগুলো জনগণের পরিবর্তে অগণতান্ত্রিক শক্তির কাছে আশ্রয় নেয়—ভারত, সামরিক বাহিনী কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী শক্তির সমর্থন লাভের চেষ্টা করে। জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে ক্ষমতায় যাওয়ার এই প্রবণতাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে।
৩.
ফলশ্রুতিতে, আমরা এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস করছি যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিণত হয়েছে এক ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষে। প্রতিদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমরা দেখি, দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রেষারেষি ও বিদ্বেষ কেবল বাড়ছে। এই সংস্কৃতি থেকে মুক্তি না পেলে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ সম্ভব হবে না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝাতে হবে—রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং জনগণের কল্যাণের জন্য আদর্শ ও নীতির প্রতিযোগিতা। অন্যথায়, আমাদের রাজনীতি শুধুই দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর বিশৃঙ্খলার একটি চক্র হয়ে থাকবে। তাদের এই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেখানে ঘৃণা বিদ্বেষ ও শুধুই বিরোধিতার ছড়াছড়ি, এই রাজনীতি দেখতে দেখতে বাংলার জনগণ খুবই বিরক্ত এবং তাদের এগুলো দেখতেও দৃষ্টিকটু।
গণতন্ত্র ও গণমানুষের রাজনীতি: চিন্তা-চেতনা ও পথের সমন্বয়
১.
গণতন্ত্র কি বলে? সব মত, পথ, চিন্তা-ধারার মানুষ রাজনীতি করতে পারবে, তাদের চিন্তাধারা প্রকাশ করতে পারবে এবং প্রকাশ্যে তাদের কার্যকলাপ জারি রাখতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশে যে ঝামেলাটা তৈরি হয়েছে, যখন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক ভাবে সচেতন জনগণ আপনার গণতন্ত্র মেনে নিয়েছে, তখন অবশ্যই তাদের প্রকাশ্য এবং পুরোপুরিভাবে তাদের চিন্তা-চেতনা ও মত-পথকে প্রকাশ করতে দেওয়া উচিত। সেকুলার হিসাবে যখন রাজনীতি করবেন, তখন আপনি আপনার সমস্ত চিন্তাধারার নিয়েই রাজনীতি করবেন, আপনি সেটা প্রচার এবং প্রসার করবেন, কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দেবেন না। জোর করে চাপিয়ে দেওয়াটাই ফ্যাসিবাদ বা ফ্যাসিজমের মধ্যে পড়ে। এই যে ভিন্ন সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশনের বিশ্বাসী যারা, তাদের রাইটে নিয়ে আপনার কনসার্ন থাকতে পারে, কিন্তু আপনি যদি গনের রাজনীতি করতে চান, আপনাকে গণ মানুষের চিন্তার দিকেই আপনার অবস্থানের জানান দিতে হবে। আপনি দেখছেন, গণমানুষ আপনার এই রাইট নিয়ে নেতিবাচকভাবে সোচ্চার সুতরাং, আপনার উচিত এ বিষয়টাকে চেপে দেওয়া এবং গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে সাথ দেওয়া।
২.
আপনাকে এটাও বুঝতে হবে, বর্তমানের দুনিয়ায় রাজনীতি হচ্ছে পপুলিজমের রাজনীতি। এখন গণমানুষের যে আকাঙ্ক্ষা, কামনা, চাওয়া-পাওয়া, এগুলাকেই গুরুত্ব দিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। এই গনের রাজনীতি বা পপুলিজমের রাজনীতি কিন্তু আমরা তৈরি করিনি, এইটা তৈরি হচ্ছে লিবারেল দেশগুলো থেকে, অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্ব থেকে। কারণ পশ্চিমা বিশ্বের লিবারেলরা গত ৫০ থেকে ৬০ বছর পৃথিবীকে যেভাবে জোর করে বিভিন্ন মতবাদ, চিন্তা-চেতনা, হাবিজাবি রাইটের কথা বলেছে, তার আসলে কোন গ্রাউন্ডই নাই, এবং মানুষকে এইসব মানতে তারা বাধ্য করেছে যা আবার তাদের গণমানুশেরা কখনোই এইসব পছন্দ করেনি, তারা মনে করেছে এইসব বিষয় তাদের জোর করে চাপিয়ে দেয়া। এর ফলেই পশ্চিমা বিশ্বের মানুষেরা মুক্তির পথ হিসেবে পাগলা ধরনের হলেও পপুলিস্ট রাজনীতিবিদদের তাদের ত্রাতা হিসেবে মেনে নিয়েছে। তারা নির্বাচিত হচ্ছে, হাবিজাবি চিন্তা ধারা, ও রাইটস গুলোকে বাতিল করে দিচ্ছে।
৩.
দেখেন, আপনার শক্তি-সামর্থ্য আছে তাহলে আপনি পপুলিস্ট হলেও রাজনীতিতে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারবেন। সুতরাং, আপনি আপনার শক্তি-সামর্থ্যে অটল থাকেন, কিন্তু গনের বিরোধী হন না, কারণ এরাই আপনার শক্তি। আপনি যে নয়া বন্দবোস্তের কথা বলছেন, এরাই সেটা আপনাকে হতে দেবে। আপনার নয়া বন্দবস্ত হবে গণমানুষের রাজনীতি আমাদেরকে এটাও বুঝতে হবে, গণমানুষ আসলে বিশাল বড় কিছু চায় না। গণমানুষ দেশকে উন্নতির চরম শিখরেও দেখতে চায় না। গণমানুষের চাওয়া মূলত তার চিন্তা-চেতনার, তাদের সামাজিক অনুশাসনের আর তার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও বিশ্বাসের সংরক্ষণ। গণমানুষ চাই সমাজে শৃঙ্খলা আসুক, সামাজিক প্রথা, লোকায়ত বিশ্বাসের একটা সংরক্ষণ হোক, লোকাচার-লোকরীতিকে ক্ষমতাবানদের শ্রদ্ধা করুক। এর বাইরে গণমানুষের চাওয়া-পাওয়াটা খুবই কম। সুতরাং, আপনি রাজনীতি করবেন, গণমানুষের রাজনীতি করবেন এবং গণমানুষকে ভুলিয়ে রাখা সবচেয়ে সহজ এবং সস্তা। এই বিষয়টা আপনি যত দ্রুত বুঝবেন, ততই ভালো।
৪.
সুতরাং, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণমানুষ কারা, আপনাকে বুঝতে হবে। তাদের বৈশিষ্ট্য, ফিচার আপনাকে বুঝতে হবে। তাদের চাওয়া-পাওয়ার প্রকৃতি আপনাকে বুঝতে হবে। বাংলার এই গণমানুষের যে চাওয়া-পাওয়া, এটা কি খুবই বিধ্বংসী, ধ্বংসযজ্ঞ কিংবা বিনাশকারী দেশের জন্য? যদি উত্তর না হয়, তবে অবশ্যই গণমানুষের চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করে আপনাকে রাজনীতি করতে হবে এবং নিশ্চিত হয়ে আপনি তাদের সাথে রাজনীতি করতে পারেন। আর উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবে তাহলে অবশ্যই আপনাকে গণমানুষের চিন্তা-চেতনার পরিবর্তনে কাজ করতে হবে ইতিবাচকভাবে।
সুতরাং, নতুন রাজনৈতিক দল কিংবা আরো যত রাজনৈতিক দল রয়েছে, তাদের প্রতি আহ্বান, গণমানুষের চিন্তা-চেতনা, চাওয়া-পাওয়া, আকাঙ্ক্ষার বিষয়গুলি ইতিবাচক হিসেবে নিন। জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকে ইতিবাচক ভাবেই নিতে হবে এবং নেন। গণবিরোধী রাজনীতিতে জড়ায়েন না। আবার আপনার মাথায় এটাও ঢুকায় নিতে হবে, গণবিরোধী রাজনীতি মানে কোন বিদেশি শক্তির সাথে আপনাকে আতাঁত করতেই হবে! নতুবা কোন অগণতান্ত্রিক শক্তির সাথে আপনাকে নিগোসিয়েসনে যাইতে হবে এবং এগুলাই হচ্ছে বাংলাদেশ বিরোধী রাজনীতি এবং বাংলার মানুষের ও বাংলার রক্তের বিরোধী রাজনীতি। যা দেশদ্রোহীতার সামিল।
রাষ্ট্র ও দল: রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি
রাষ্ট্রের আালাদা স্বত্বা আছে, এই কারণে রাষ্ট্রকে হইতে হয় ইন্ক্লুসিভ কেননা রাষ্ট্রের মধ্যে ভিন্ন জাতি,ঘরনা, ভাষা বা ধর্মের লোক থাকে। এই কারণে রাষ্ট্রকে হতে হবে উদার। কিন্ত ওপরপক্ষে রাজনৈতিক দল ইন্ক্লুসিভ না হলেও চলে কেননা রাজনৈতিক দল তৈরি হয় সমমনার চি্ন্তা ও মত থেকে বাট এই রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় যাবে তাদের অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ইনক্লুসিভনেস ধারণ করতে হবে।
একটা রাষ্ট্রের পলিটিক্যাল পার্টি গুলার যে রাজনীতি সেটা কি হবে সেটা তারা নিজেরাই ঠিক করবে। কিন্তু যখন তারা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যাবে তখন তাদেরকে এটা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে রাষ্ট্রের রাজনীতি হবে তাদের পলিটিক্যাল পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মত না। রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে সে অবশ্যই তার পলিটিক্যাল পার্টির কর্মী মনে করবে না, সুতরাং নাগরিক তার মতামত দিবে, পার্টি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে। একটা পলিটিক্যাল পার্টির আদর্শ থাকবে এটা স্বাভাবিক বাট সেই আদর্শকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা গিয়ে জোর করে জনগণের উপর চাপায় দিলে সেটাই হবে ফ্যাসিবাদ।
পলিটিকাল পার্টি দের ধ্যানে জ্ঞানে ঢুকায় নিতে হবে যে একটা রাষ্ট্রের রাজনীতি মূলত -
-ন্যায় বিচার
-ন্যায় ব্যবহার
-সত্য ও
-সাধুতার ভিত্তিতে
সমাজ, সংহতি ও ব্যক্তির অবস্থান
ব্যক্তি ও সমষ্টির চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার সমন্বয়ে সমাজ পরিচালিত হয়। তবে আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে ব্যক্তি ও সমষ্টির চাহিদা আলাদা আলাদাভাবে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু এই ভিন্ন চাহিদার মধ্যে একটি সংহতি থাকা আবশ্যক। সামাজিক সংহতি না থাকলে সমাজ সবার সমষ্টিগত আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দিতে পারে না, এবং এর ফলে সমাজ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। মানুষ এমন এক জীব, যার চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার তালিকা অনেক বড়। সমাজ এই বড় তালিকার চাহিদাকে তার ছোট পরিসরে পূরণ করতে চেষ্টা করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়। আবার সমাজ সবসময় সমষ্টিকে প্রাধান্য দেয়, ফলে সমাজের কাছে ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ব্যক্তি মূল্যহীন না হলেও সমাজের কাছ থেকে সে পূর্ণ মূল্যায়ন পায় না। তবে এটাই স্বাভাবিক; না হলে সমাজ তার গতিশীলতা হারাবে এবং অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। কিন্তু সমষ্টি সমাজের কাছে সবসময়ই প্রিয়, এবং সমষ্টিও সমাজের উদ্দেশ্যকে প্রতিনিয়ত সেবা করে যায়।
প্রশান্তি কী ?
প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...
-
নির্বাচনী সহিংসতা দরিদ্র ও অনুন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেখুন, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে এমনকি স...
-
1. আমরা কুসংস্কারের সাথে অতি পরিচিত। এই কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, মিথ, মিথলজি ,সবকিছুই আমাদের সোসাইটি ও রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দ...
-
Donald Trump will become an example for all the nationalists and Ultra Nationalist political fanatics across the world. Who thinks that a Na...




