নির্বাচনী সহিংসতা: একটি দেশের পশ্চাৎপদতার আয়না

নির্বাচনী সহিংসতা দরিদ্র ও অনুন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেখুন, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে এমনকি সৌদি আরবেও। যেসব দেশে রাজতন্ত্র বা মনার্কি প্রচলিত, সেখানেও সীমাবদ্ধ কিছু নির্বাচন হয়। সুতরাং নির্বাচনী ব্যবস্থা মোটামুটি একটি সাধারণ এবং সর্বজনীন বিষয়। নির্বাচন হয় না এমন কোন রাষ্ট্র আপনি খুবই কমই দেখবেন।  কিন্তু আপনি লক্ষ করবেন যে উন্নত দেশগুলোতে নির্বাচন নিয়ে এত মাতামাতি হয় না এবং জনগণ বিষয়টি নিয়ে এত ঘাটাঘাটি করে না। অপরদিকে, যত পশ্চাৎপদ, দুর্বল বা অনুন্নত দেশ, সেসব দেশে নির্বাচন নিয়ে তত বেশি মাতামাতি হয় এবং এটা ভয়ংকর রকমের বিপজ্জনক সেই দেশের শান্তি, সহাবস্থান ও সম্প্রীতির জন্য। এই ধরনের দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচুর সহিংস হয়ে থাকে। আপনি সহজেই বুঝে ফেলবেন যে, যে দেশে যত বেশি নির্বাচনী সহিংসতা, সেই দেশ তত বেশি পশ্চাৎপদ, বর্বর, অসভ্য এবং জনগণও ঠিক সেরকমই।

আমার উপরের কথার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো এই যে, আপনি আপনার দেশকে বিচার করতে পারবেন আপনার দেশের নির্বাচনী পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী। আপনি যদি দেখেন যে আপনার দেশের সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি করছে, এবং তাদের আলোচনায় নির্বাচনী নেতা বা রাজনৈতিক দলের কোনো ইশতেহার, পরিকল্পনা বা নীতি নিয়ে কোনো কথাই নেই শুধুমাত্র কে কেমন নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে, নেতা কেমন পোশাক পরেছেন, কেমন কথা বলছেন তাহলে বুঝতে হবে যে আপনার দেশ সভ্য, শিক্ষিত বা উন্নত দেশ নয়। সুতরাং আপনি আপনার দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা দেখেও আপনার দেশকে একটা মানদণ্ডে নিয়ে আসতে পারেন এবং আপনার দেশ উন্নত নাকি অনুন্নত, শিক্ষিত নাকি মূর্খ, সভ্য নাকি বর্বর সেটা বিচার করতে পারেন।

আবার দেখুন, যখন আপনার দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বা রাজনৈতিক দলের খুচরা-পাতিনেতাগুলোও একটা মারমুখী অবস্থানে থাকে, উভয় পক্ষই মারমুখী অবস্থানে থাকে, ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, ব্যাপক ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি করে মনে হয় যেন গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে তখন আপনাকে বুঝতে হবে যে আপনি একটি পশ্চাৎপদ দেশের নাগরিক। আপনার দেশ বসবাসের জন্য একটি ভালো দেশ নয়। সুতরাং আপনার দেশের সাধারণ জনগণের এই আত্মোপলব্ধিতে আসা উচিত যে আপনার দেশ বসবাসের জন্য একটি ভালো দেশ নয়। আমি বলছি না যে আপনার দেশ কখনোই ভালো হবে না। তবে আপনার দেশ একটি উন্নত দেশের কাতারে যেতে হলে তাকে প্রচুর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আমরা সহজেই এই উপসংহারে পৌঁছাতে পারি যে নির্বাচন, নির্বাচনী সহিংসতা কিংবা নির্বাচন ঘিরে অতিরিক্ত মাতামাতি যা সাধারণ মানুষের মন-মস্তিষ্কে আঠার মতো লেগে থাকে ,কখনোই ইতিবাচক কিছু নয়। বরং এটি একটি দেশের জনগণ, সামাজিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, শান্তি ও শৃঙ্খলার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

নির্বাচন মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই। আর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যখন শত্রু-শত্রু খেলায় রূপ দেওয়া হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরেই কোথাও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। বুঝতে হবে সামথিং ইজ রঙ উইথ দ্যা প্রসেস অফ ইলেকশন ! আমরা যদি আফ্রিকা বা এশিয়ার অনেক অনুন্নত দেশে তাকাই, দেখি নির্বাচন মানেই সেখানে সহিংসতা, প্রাণহানি, এমনকি গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি। এই বাস্তবতা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই নিজেদের নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব করার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নির্বাচনী সহিংসতা আজ একটি প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় , আমরা এখনো পুরোপুরি সভ্য, সহনশীল ও পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পৌঁছাতে পারিনি। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সমাজ ও রাজনীতি



সমাজ ও রাজনীতি, সোসাইটি ও পলিটিক্স যে নামেই ডাকি না কেন, সমাজ আসলে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের চাইতেও গভীর কিছু। আমরা যদি মেনে নিই যে একজন মানুষের সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হচ্ছে তার রুহ বা আত্মা যদিও তার অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা যায় না, তবু মানুষ অনুভব করে এবং দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বাস করে এসেছে যে তার সত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার মন, তার আত্মা বা রুহ। ঠিক তেমনভাবেই, সমাজ আমাদের সেই আত্মার অস্তিত্ব ও প্রভাবকে প্রকাশ করে। এক অর্থে, সমাজ হলো আমাদের সম্মিলিত আত্মা, আমাদের collective soul।

কিন্তু রাজনীতি যখন এই সমাজের উপর অতিরিক্ত ও ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তখন এই আত্মাগুলোর স্বাভাবিক সম্মিলন ব্যাহত হয়। কারণ রাজনীতি মূলত একটি বাহ্য বিষয় রাজনীতি ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বাইরে রাজনীতি খুব কমই দেখা যায়। রাজনীতির প্রায় প্রতিটি আলোচনা, বিতর্ক, সমর্থন কিংবা বিরোধিতা সবকিছুর কেন্দ্রেই থাকে ক্ষমতা। কিন্তু যখন এই ক্ষমতা ও ক্ষমতার রাজনীতি একটি সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, তখন সেই সমাজের প্রতিটি আত্মা অবধারিতভাবে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করে। আর এই কারণেই অতিরিক্ত রাজনীতি একটি সমাজকে আত্মিকভাবে, রোহানিয়াতের দিক থেকে, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

একটা সমাজের মধ্যে সবকিছুই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটা সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তার মানুষ ব্যক্তি মানুষ এবং সম্মিলিত ব্যক্তি, বা collective individuals। যখন অনেকগুলো individual একসাথে হয়, তখনই সমাজ তৈরি হয়। আবার এটাও আমাদের বুঝতে হবে যে, সমাজে কোনো আংশিক ব্যক্তি নেই, বরং আছে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি whole individuals। কারণ পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের নিয়েই একটি সমাজ গঠিত হয়।

ব্যক্তি কখনোই একা বাস করতে পারে না, পারবেও না। ইতিহাসে আপনি এমন কোনো উদাহরণ পাবেন না। ইতিহাসের মূল শিক্ষাই হচ্ছে সমাজের অস্তিত্ব এবং সমাজের মধ্যেই মানুষের অস্তিত্ব। ইতিহাস কখনোই সমাজের বাইরে যায়নি; বরং সমাজকেই সে বারবার ভেঙেছে, গড়েছে এবং নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। প্রতিটি সময়, প্রতিটি কাল, প্রতিটি যুগের ব্যক্তি বা বংশের ইতিহাস আসলে তার সমাজের ইতিহাস। সমাজের বাইরে ব্যক্তির কোনো ইতিহাস কখনোই রচিত হয়নি, হবেও না এটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

কিন্তু রাজনীতি হচ্ছে এই সমাজের ইতিহাসের একটি অংশ মাত্র। সমাজ রাজনীতিক ইতিহাসের অংশ নয়; বরং রাজনীতিই সমাজের একটি অংশ। সেইভাবেই ইতিহাস রচিত হয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও ইতিহাস ঠিক সেইভাবেই রচিত হতে থাকবে।

সুতরাং মানুষের যে ইতিহাস human history ,সেটা মূলত তার সমাজের ইতিহাস, তার সমাজ ভাঙা-গড়ার ইতিহাস। মানুষের যাত্রা, মানুষের পথচলা, সবকিছুই সমাজের ভেতর দিয়েই সংঘটিত হয়েছে। এই কারণেই একটি সমাজের প্রকৃত আত্মা হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের আত্মার সমিলিত রূপ। সমাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনি এর গুরুত্ব কল্পনাতেও পুরোপুরি ধরতে পারবেন না।

কিন্তু আমাদের যারা ক্ষমতার আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, কিংবা যারা রাষ্ট্র, দেশ বা জাতির ধারণাকে সবার উপরে রাখতে চায়, তাদের কাছে সমাজ ক্রমশ অবহেলার বিষয় হয়ে উঠছে আর এই প্রবণতাটা ভয়ংকর। আপনি সমাজ ভেঙে রাজনীতি গঠন করতে পারেন না, সমাজ ভেঙে কোনো দেশ বা কোনো জাতি গঠন করতে পারেন না। সমাজ সেটা কখনোই মেনে নেবে না। কারণ একটি সমাজ হচ্ছে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। সমাজে আপনি রাজনীতি ঢুকাইছেন মানে আপনি ক্ষমতার ক্ষমতা কেন্দ্রিক যে দ্বন্দ্ব এটা কি জারি রাখছেন এবং এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যক্তি খুবই গৌণ হয়ে পড়ে যা সমাজকে তার অস্তিত্বের হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। 

একটি জাতি, একটি দেশ বা একটি রাষ্ট্র কখনোই ব্যক্তিকে গড়ে তোলে না; একটি সমাজই একজন ব্যক্তিকে গড়ে তোলে। সুতরাং সমাজকে গুরুত্বহীন ভেবে রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিতে গেলে বিষয়টা অনিবার্যভাবেই বিপরীতমুখী ও ভয়াবহ হয়ে উঠবে এবং তা হবেই।

গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বাংলাদেশ !

স্ট্রং ইকোনমিক দেশগুলোতে ডেমোক্রেসি সাধারণত ভালোভাবে কাজ করে এবং তুলনামূলকভাবে বেশি ইফেক্টিভ হয়। কিন্তু দুর্বল অর্থনীতি, কম শিক্ষা, এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশে ডেমোক্রেসি প্রায়ই ব্যর্থ হতে বাধ্য। এবং ডেমোক্রেসির এই ব্যর্থতা পুরোটাই সেই দেশের জনগণের উপর বর্তায়। যদিও একটি গণতন্ত্রের কার্যকারিতা তার জনগণের উপরই নির্ভর করে এবং জনগণই নির্ধারণ করে গণতন্ত্র কীভাবে পরিচালিত হবে, তবুও বাস্তবতা হলো গণতন্ত্রের সফলতা বা ব্যর্থতা অনেকাংশে একটি দেশের জনগণের চিন্তাভাবনা, চেতনা, শিক্ষা এবং সামগ্রিক মানসিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গণতন্ত্র মানুষকে একটি ক্ষণস্থায়ী চেতনা দেয় ,এই অনুভূতি যে সে নিজেই তার নেতা নির্বাচন করতে পারছে। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা শুরু হয় এই নির্বাচনের পর। নির্বাচিত নেতার চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকার অনেক ক্ষেত্রেই তার জনগণের চিন্তা ও চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈপরীত্য এতটাই গভীর হয় যে নেতা ও জনগণের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী গ্যাপ তৈরি হয় চিন্তার গ্যাপ, চেতনার গ্যাপ এবং উন্নয়নের গ্যাপ। এই গ্যাপ পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ প্রায়ই নিজেদের বঞ্চিত, নির্যাতিত ও বৈষম্যের শিকার বলে মনে করে। এই কারণেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই পুরোপুরি সফল বলা যায় না। এমনকি সবচেয়ে সফল গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও জনগণকে গণতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করতে দেখা যায়।  
অর্থাৎ, গণতন্ত্র যেমন কিছু সাফল্য তৈরি করে, তেমনি তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে গভীর ও কাঠামোগত ব্যর্থতা।


ঠিক ওপরের এই লেখাটাকেই বা যুক্তিকে আমরা যদি বাংলাদেশী প্রেক্ষাপটে তুলনা করতে যাই তবে আমাদের গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বাংলাদেশের যে শিরোনাম এটাকে আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারব কেননা বাংলাদেশ একটি অতিরিক্ত জনবহুল দেশ, আয়তনে ছোট, জনসংখ্যা বিশাল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাপক অশিক্ষা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা, শক্তিশালী কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক এস্টাবলিশমেন্ট, স্ট্রং বুরোক্রেসি কিন্তু উইক ম্যানেজমেন্ট। তার ওপর রয়েছে অশিক্ষিত রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দল, যাদের দুর্নীতি ও দালালির ইতিহাস দীর্ঘ এবং গভীর। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে ডেমোক্রেসি কার্যকর হয় না, হয়নি, এবং নিকট ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। গত পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখা যায়, ডেমোক্রেসির মান ক্রমাগত অবনতি হয়েছে। তবে একই সময়ে মানুষ আরেকটি বিষয় উপলব্ধি করেছে: একটি শক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কিংবা শক্ত হাতে রাষ্ট্র পরিচালনা, সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে এবং জনগণের চিন্তাচেতনাকে উন্নয়নমুখী করতে পারে, শর্ত একটাই, সেই নেতৃত্ব যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়। সমস্যা হলো, গত পনেরো বছরে আমরা এমন কোনো শাসন পাইনি। ডেমোক্রেসিহীন শাসন হলেও তা দুর্নীতিতে ডুবে থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনার সেই সম্ভাবনাটিও নষ্ট হয়েছে।

আমি এখানে স্বৈরশাসন বা ডিক্টেটরশিপের পক্ষে কথা বলছি না। আমি বলছি বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ডেমোক্রেসি , বুরোক্রেসি এবং মিলিটারি ক্যাপাসিটির মধ্যে একটি কার্যকর মেলবন্ধন। এমন একটি সমন্বিত কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার ভারসাম্য থাকবে। শুধুমাত্র নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়া, এই বাস্তবতায় ক্রমশ একটি ভয়ংকর ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।


ভয়ের রাজনীতি ও একটা ম্যাস পলিটিক্যাল পার্টির পতন

একটি রাজনৈতিক দলের আত্মিক বা রুহানিয়াতের মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন সমাজ বা দেশের সাধারণ জনগণ ওই দলের নেতা-কর্মীদের ভয় পেতে শুরু করে।

যখন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা দেশে ও সমাজে আতঙ্ক ছড়ায়, কিংবা এমন আচরণ ও কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় যা সাধারণ মানুষের কাছে ভয়ংকর ও আতঙ্কজনক বলে প্রতীয়মান হয়, তখন সেটি স্পষ্টভাবে ওই রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে মৌলিক আদর্শ ও ঘোষিত ম্যানিফেস্টোর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানকে নির্দেশ করে। সুতরাং সেই রাজনৈতিক দলকে ভয় পাওয়ার পেছনে সাধারণ জনগণের যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়। এই ভয় থেকেই একসময় জনগণ ওই দলটিকে আর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।

প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই বোঝা উচিত, দলের সুপ্রিম নেতা কিংবা উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব যতই জ্ঞানী, দক্ষ বা আদর্শবান হোক না কেন যদি তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ নেতাকর্মী দ্বারা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়, তবে সেই রাজনৈতিক দল একটি দেশ পরিচালনার নৈতিক বৈধতা হারিয়ে ফেলে। ভয়ের কারণ যাই হোক না কেন, এই ভয়ই হলো পতনের প্রথম ও সবচেয়ে নিশ্চিত লক্ষণ। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতা হারানোর আগেই পতনের শিকার হতে পারে যখন সাধারণ জনগণ তাকে ভয় পায়, তার দ্বারা আতঙ্ক তৈরি হয় এবং জনগণ আর দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কিত করতে পারে না। এই অবস্থায় জনগণ ওই রাজনৈতিক দলকে এড়িয়ে চলে, এমনকি ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করে। একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এর চেয়ে বড় পতন আর কী হতে পারে?

যখন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী বা তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা এমন আচরণ বা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, যার ফলে সমাজের সাধারণ মানুষ তাদের ভয় পেতে শুরু করে, তখন বুঝে নিতে হবে ওই রাজনৈতিক দলটি রুহানিয়াতি বা আত্মিকভাবে মৃত্যুর পথে অগ্রসর হচ্ছে। 

এই বাস্তবতা প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
আবার দেখেন, কোনো দলের সুপ্রিম লিডার বা উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব যতই ভালো হোক না কেন, তাদের পরিকল্পনা ও নীতিমালা যতই উৎকৃষ্ট হোক না কেন যদি দলের কর্মীদের আচরণ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে এবং সমাজে ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে, তাহলে সেই দল আর টেকসই থাকে না। তখন সেই দল আর জনগণের দল হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেওয়ার অবস্থানেও থাকে না। যখন জনগণ কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মীদের কর্মকাণ্ডের কারণে ভয় পেতে শুরু করে, তখন স্পষ্টভাবে বুঝে নিতে হবে ওই রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। সুতরাং প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই এই বিষয়টির প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া অত্যাবশ্যক।

গণতন্ত্র এবং শত্রু বানানোর শিল্প !


মানবসমাজের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানুষের বেঁচে থাকার জীবনসংগ্রামে প্রতিযোগিতা, সংগ্রাম, যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উপস্থিত। যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, মানুষ একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর প্রবণতা প্রদর্শন করেছে। ইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই আমরা এই চিত্র দেখতে পাই, মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে, রক্তপাত ঘটিয়েছে, ধ্বংস ও ধ্বংসলীলায় লিপ্ত হয়েছে। এই সহিংসতা কখনো একই জাতির মানুষের মধ্যে, কখনো ভিন্ন জাতির মধ্যে, কখনো একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে, আবার কখনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। প্রেক্ষাপট বদলালেও মানুষের এই বৈশিষ্ট্য ,সংঘাতপ্রবণতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত অপরিবর্তিত থেকেছে। ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ বলেই প্রতীয়মান হয়।

আপনি যতই ইতিহাস পাঠ করুন বা প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবনধারা নিয়ে গবেষণা করুন না কেন, মানবইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই আপনি মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ধ্বংস এবং আধিপত্যের লড়াই লক্ষ্য করবেন। অনেক সময় এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ বা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি যে এই সংঘর্ষগুলো নিজ গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সীমানার বাইরের ‘অপর’ এর সঙ্গে বেশি সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এই চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এখন ভিন্ন গোষ্ঠী বা ধর্মের বা 'অপরের' সঙ্গে সংঘর্ষের চেয়ে একই জাতির ভেতরে, একই রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যেই দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা অধিক প্রাধান্য পাচ্ছে। একে বলা যায় আন্তঃগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, স্বজাতি দ্বন্দ্ব কিংবা আন্তঃধর্মীয় সংঘর্ষ। 

এই প্রবণতাটি মূলত বিংশ শতাব্দীর পর থেকে স্পষ্টভাবে বিকশিত হতে শুরু করে। এ সময় ন্যাশনাল স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের ফলে স্বজাতির মধ্যে সরাসরি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পূর্বের তুলনায় অনেকাংশে কমে যায়। বিংশ শতাব্দীর পূর্বে যেখানে গোত্রে-গোত্রে বা স্বজাতির মধ্যেই ব্যাপক সহিংসতা দেখা যেত, সেখানে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই ধরনের সংঘর্ষ তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়। একই সঙ্গে মানুষ নিজেদের পরিচয়কে বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে সংজ্ঞায়িত করতে শেখে যার নাম দেওয়া হয় রাষ্ট্র বা জাতিরাষ্ট্র। এই জাতিরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোতে গণতন্ত্রকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিক বা গোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানোর একটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হয়। তবে একই সঙ্গে এই ব্যবস্থায় একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতাও অনিবার্য হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে এক গোষ্ঠী থেকে অন্য গোষ্ঠীর হাতে স্থানান্তরিত হয়। যে গোষ্ঠী জনসমর্থন, কৌশল বা সাংগঠনিক শক্তিতে অন্যদের ছাড়িয়ে যেতে পারে, সে-ই ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করে। এর ফলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ লাভ করে। বলা যায়, মানুষের ঐতিহাসিক যুদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রবণতাকে গণতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে এনে ‘সভ্য’ ও বৈধ রূপ দিয়েছে।

তবে এর সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন সমস্যারও জন্ম হয়। যদিও রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ এখনো বিদ্যমান, তবু একই দেশের মানুষ, একই জাতি কিংবা একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই একটি স্থায়ী শত্রুতার মানসিকতা গড়ে ওঠে। এই মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনীতির মাধ্যমে সচেতনভাবে তৈরি ও উসকে দেওয়া হয়।
ডেমোক্রেসির দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পারস্পরিক লড়াইয়ের ধারণাটিকে সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এই ব্যবস্থাতেই। অন্যান্য শাসনব্যবস্থাতেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রে এই দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতাকে একটি বৈধ ও কাঠামোবদ্ধ রূপ দেওয়া হয়।

এখানেই গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত সংকটটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থা মানুষকে কেবল ভিন্নমতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, ধীরে ধীরে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। রাজনৈতিক মতভেদ সামাজিক ও মানসিক বৈরিতায় রূপ নেয়। একসময় মতের অমিল নয়, বরং মানুষ নিজেই মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই অর্থে বলা যায়, গণতন্ত্র মানুষের সহজাত দ্বন্দ্বপ্রবণ বা যুদ্ধপ্রবণ মানসিকতাকে নতুন করে সৃষ্টি করেনি; বরং সেই প্রবণতাকেই রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করেছে।

আদর্শিক রাষ্ট্র ও ও সমাজের অস্তিত্বহীনতা


মডার্ন দুনিয়ায় আদর্শিক রাষ্ট্র বলে আসলে কিছু নেই, ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ আদর্শিক রাষ্ট্র সব সময় মাল্টি-কালচারাল ও মাল্টি-রিলিজিয়াস বিশ্বাসে আস্থাশীল। সুতরাং বর্তমানে রাজনীতিবিদরা কিংবা যারা নিজেদের আদর্শিক বলে মনে করেন, তারা যদি নিজেদের চিন্তা-চেতনা ও আদর্শকে ভালোভাবে যাচাই করেন, তাহলে দেখবেন তারা সত্যিই মাল্টি-কালচারালিজম, মাল্টি-ন্যাশনালিজম কিংবা মাল্টি-রিলিজিয়নকে তাদের আদর্শিক রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে স্থান দিতে ইচ্ছুক কি না। সেই প্রশ্নের উত্তর পেলেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর এ মডার্ন দুনিয়ায় আদর্শিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাবে না এ কারণেই যে এর রাজনীতিবিদরা যেমন দুর্নীতিবাজ এবং ধান্দাবাজ বিপরীত পক্ষে তার জনগণও প্রচন্ডরকম অসৎ এবং দুর্নীতিপরায়ণ,  অসততা,  দায়িত্বহীনতা , কাণ্ডজ্ঞানহীনতার মত অনেক ব্যাড কোয়ালিটি তাদের মধ্যে বিরাজমান । এর ফলেই আধুনিক সময়ে আদর্শিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ক্রমহ্রাসমান খেয়াল করবেন। এবং অধিকাংশ জনগণ হচ্ছে মাল্টি কালচার মাল্টিন্যাশনালিজম মাল্টি রিলিজিয়নকে অস্বীকার করে। 

একটা আদর্শিক রাষ্ট্রের বিষয়টা আসলে খুবই মজাদার। মজাদার এই কারণে যে, কোনো রাষ্ট্র শুধু রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনেতার কারণে আদর্শিক, মডার্ন, আধুনিক কিংবা দুর্নীতিহীন ও শৃঙ্খল রাষ্ট্রে পরিণত হয় না। মূল বিষয়টা যায় বটম-টু-আপ প্রক্রিয়ায়। অর্থাৎ অধিকাংশ জনগণ যদি সৎ হয়, অধিকাংশ জনগণের মধ্যে যদি সিভিক সেন্স থাকে, যদি শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা শক্তভাবে কাজ করে, তাহলেই সেই রাষ্ট্র আদর্শিক হওয়ার পথে এগিয়ে যায়। জনগণের ভালো হওয়াটাই মূল চালিকাশক্তি; সেই কারণেই একটি রাষ্ট্র আদর্শিক রূপ নিতে তুলনামূলকভাবে অগ্রগামী হয়ে ওঠে। ফলে একটা আদর্শিক রাষ্ট্রে যতটা রাষ্ট্রনায়কের বেশি প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতন সদযোগ্য নাগরিকের অর্থাৎ আদর্শিক রাষ্ট্রের পূর্ব শর্ত হচ্ছে জনগণের আদর্শ জনগণ যেন সৎযোগ্য দক্ষ বিবেকবান হয়। 

আর এই আধুনিক সময়ে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের যুগে, এমনকি ব্যক্তি-স্বৈরাচারিতার যুগে, মানুষকে সম্পূর্ণ সভ্য, দক্ষ ও শৃঙ্খল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখানে মানুষ রাষ্ট্রকে ভয় পায়, কিন্তু রাষ্ট্রের আইনকে সম্মান করতে শেখে না। ফলে মানুষ ভয়ের কারণে আইন মানে, নৈতিকতা বা দায়িত্ববোধের কারণে নয়। রাষ্ট্র এখানে শ্রদ্ধার জায়গা হারিয়ে কেবল ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়, আর সেখানেই মূল সমস্যাটা।

এই আধুনিক সময়ে মানুষের যে গভীর বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, সেই বিচ্ছিন্নতার ফলেই দুর্নীতি, অসততা, অদক্ষতা ও অবহেলার মতো নেগেটিভ গুণগুলো বেড়ে উঠছে। এর ফলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নাগরিকের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে মজার ও বিপজ্জনক বিষয় হলো, সোসাইটি ও রাষ্ট্রের মধ্যকার পার্থক্য, আর ব্যক্তি ও নাগরিকের মধ্যকার পার্থক্য, এই দুটোই এখন এক ধরনের গ্যাপে পড়ে গেছে।
আসলে ব্যক্তি থেকেই সোসাইটি তৈরি হয়, আর সোসাইটি থেকেই রাষ্ট্র। কিন্তু এখন রাষ্ট্রের কার্যক্রমে সোসাইটির মূল্য ও উপস্থিতি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্র কেবল ব্যক্তির ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করছে, বা নাগরিককে শুধু প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে দেখছে—যার কারণে সংকট আরও গভীর হচ্ছে।

এই কারণেই আধুনিক সময়ে আদর্শিক রাষ্ট্রের নানা সমস্যা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বাস্তবে আদর্শিক রাষ্ট্র কখনোই গড়ে ওঠে না। যদি কোনো রাষ্ট্র তার সোসাইটিকে টিকিয়ে রাখতে পারে, যদি রাষ্ট্র সোসাইটির ভ্যালু ও ভূমিকার শতভাগ স্বীকৃতি দিতে পারে, তখনই কেবল একটি রাষ্ট্র আদর্শিক রাষ্ট্রে রূপ নিতে পারে। কারণ একটি সোসাইটিই পারে তার দেশের জনগণকে, নাগরিককে এবং সামাজিক মানুষকে সভ্য, যোগ্য, দক্ষ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে। একটি রাষ্ট্র একা কখনোই সেটা পুরোপুরি পারে না। একটা রাষ্ট্রের যখন তার নাগরিকের লার্নিং প্রসেস সোশ্যালাইজেশন শিখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে তখন সোসাইটির ভূমিকাটা কমে যায় ফলে ঝামেলাটা তৈরি হয় দেখেন সোশ্যালাইজেশন লার্নিং শিখুন সবকিছু ভূমিকাতে সোসাইটিকে অগ্রগামী রাখতে হবে কারণ রাষ্ট্র তার নাগরিককে শেখাবে হাউ টু বি এ কম্পিউটার সিটিজেন বাট একটা সোসাইটি তার ব্যক্তিবর্গ কে শেখায় হাউ টু বি এ গুড হিউম্যান বি ং দ্যাটস দ্যা ডিফারেন্স বিটুইন সোসাইটি অ্যান্ড স্টেট। 

আর এই মডার্ন দুনিয়ায় সোসাইটির ভূমিকা কমে যাওয়ার কারণেই কিংবা সোসাইটির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হওয়ার কারণে আদর্শিক রাষ্ট্র কখনোই প্রতিষ্ঠিত লাভ করবে না করতেও পারবেন না।

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...