নির্বাচনী সহিংসতা দরিদ্র ও অনুন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দেখুন, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে এমনকি সৌদি আরবেও। যেসব দেশে রাজতন্ত্র বা মনার্কি প্রচলিত, সেখানেও সীমাবদ্ধ কিছু নির্বাচন হয়। সুতরাং নির্বাচনী ব্যবস্থা মোটামুটি একটি সাধারণ এবং সর্বজনীন বিষয়। নির্বাচন হয় না এমন কোন রাষ্ট্র আপনি খুবই কমই দেখবেন। কিন্তু আপনি লক্ষ করবেন যে উন্নত দেশগুলোতে নির্বাচন নিয়ে এত মাতামাতি হয় না এবং জনগণ বিষয়টি নিয়ে এত ঘাটাঘাটি করে না। অপরদিকে, যত পশ্চাৎপদ, দুর্বল বা অনুন্নত দেশ, সেসব দেশে নির্বাচন নিয়ে তত বেশি মাতামাতি হয় এবং এটা ভয়ংকর রকমের বিপজ্জনক সেই দেশের শান্তি, সহাবস্থান ও সম্প্রীতির জন্য। এই ধরনের দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রচুর সহিংস হয়ে থাকে। আপনি সহজেই বুঝে ফেলবেন যে, যে দেশে যত বেশি নির্বাচনী সহিংসতা, সেই দেশ তত বেশি পশ্চাৎপদ, বর্বর, অসভ্য এবং জনগণও ঠিক সেরকমই।
আমার উপরের কথার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো এই যে, আপনি আপনার দেশকে বিচার করতে পারবেন আপনার দেশের নির্বাচনী পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী। আপনি যদি দেখেন যে আপনার দেশের সাধারণ মানুষ নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতি করছে, এবং তাদের আলোচনায় নির্বাচনী নেতা বা রাজনৈতিক দলের কোনো ইশতেহার, পরিকল্পনা বা নীতি নিয়ে কোনো কথাই নেই শুধুমাত্র কে কেমন নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে, নেতা কেমন পোশাক পরেছেন, কেমন কথা বলছেন তাহলে বুঝতে হবে যে আপনার দেশ সভ্য, শিক্ষিত বা উন্নত দেশ নয়। সুতরাং আপনি আপনার দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা দেখেও আপনার দেশকে একটা মানদণ্ডে নিয়ে আসতে পারেন এবং আপনার দেশ উন্নত নাকি অনুন্নত, শিক্ষিত নাকি মূর্খ, সভ্য নাকি বর্বর সেটা বিচার করতে পারেন।
আবার দেখুন, যখন আপনার দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বা রাজনৈতিক দলের খুচরা-পাতিনেতাগুলোও একটা মারমুখী অবস্থানে থাকে, উভয় পক্ষই মারমুখী অবস্থানে থাকে, ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, ব্যাপক ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা সৃষ্টি করে মনে হয় যেন গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে তখন আপনাকে বুঝতে হবে যে আপনি একটি পশ্চাৎপদ দেশের নাগরিক। আপনার দেশ বসবাসের জন্য একটি ভালো দেশ নয়। সুতরাং আপনার দেশের সাধারণ জনগণের এই আত্মোপলব্ধিতে আসা উচিত যে আপনার দেশ বসবাসের জন্য একটি ভালো দেশ নয়। আমি বলছি না যে আপনার দেশ কখনোই ভালো হবে না। তবে আপনার দেশ একটি উন্নত দেশের কাতারে যেতে হলে তাকে প্রচুর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আমরা সহজেই এই উপসংহারে পৌঁছাতে পারি যে নির্বাচন, নির্বাচনী সহিংসতা কিংবা নির্বাচন ঘিরে অতিরিক্ত মাতামাতি যা সাধারণ মানুষের মন-মস্তিষ্কে আঠার মতো লেগে থাকে ,কখনোই ইতিবাচক কিছু নয়। বরং এটি একটি দেশের জনগণ, সামাজিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, শান্তি ও শৃঙ্খলার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নির্বাচন মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই। আর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যখন শত্রু-শত্রু খেলায় রূপ দেওয়া হয়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরেই কোথাও বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। বুঝতে হবে সামথিং ইজ রঙ উইথ দ্যা প্রসেস অফ ইলেকশন ! আমরা যদি আফ্রিকা বা এশিয়ার অনেক অনুন্নত দেশে তাকাই, দেখি নির্বাচন মানেই সেখানে সহিংসতা, প্রাণহানি, এমনকি গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি। এই বাস্তবতা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই নিজেদের নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব করার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নির্বাচনী সহিংসতা আজ একটি প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় , আমরা এখনো পুরোপুরি সভ্য, সহনশীল ও পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পৌঁছাতে পারিনি। বিষয়টি আমাদের গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

