সমাজ ও রাজনীতি



সমাজ ও রাজনীতি, সোসাইটি ও পলিটিক্স যে নামেই ডাকি না কেন, সমাজ আসলে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের চাইতেও গভীর কিছু। আমরা যদি মেনে নিই যে একজন মানুষের সবচেয়ে মৌলিক বিষয় হচ্ছে তার রুহ বা আত্মা যদিও তার অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা যায় না, তবু মানুষ অনুভব করে এবং দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বাস করে এসেছে যে তার সত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার মন, তার আত্মা বা রুহ। ঠিক তেমনভাবেই, সমাজ আমাদের সেই আত্মার অস্তিত্ব ও প্রভাবকে প্রকাশ করে। এক অর্থে, সমাজ হলো আমাদের সম্মিলিত আত্মা, আমাদের collective soul।

কিন্তু রাজনীতি যখন এই সমাজের উপর অতিরিক্ত ও ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তখন এই আত্মাগুলোর স্বাভাবিক সম্মিলন ব্যাহত হয়। কারণ রাজনীতি মূলত একটি বাহ্য বিষয় রাজনীতি ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বাইরে রাজনীতি খুব কমই দেখা যায়। রাজনীতির প্রায় প্রতিটি আলোচনা, বিতর্ক, সমর্থন কিংবা বিরোধিতা সবকিছুর কেন্দ্রেই থাকে ক্ষমতা। কিন্তু যখন এই ক্ষমতা ও ক্ষমতার রাজনীতি একটি সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, তখন সেই সমাজের প্রতিটি আত্মা অবধারিতভাবে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করে। আর এই কারণেই অতিরিক্ত রাজনীতি একটি সমাজকে আত্মিকভাবে, রোহানিয়াতের দিক থেকে, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

একটা সমাজের মধ্যে সবকিছুই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটা সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তার মানুষ ব্যক্তি মানুষ এবং সম্মিলিত ব্যক্তি, বা collective individuals। যখন অনেকগুলো individual একসাথে হয়, তখনই সমাজ তৈরি হয়। আবার এটাও আমাদের বুঝতে হবে যে, সমাজে কোনো আংশিক ব্যক্তি নেই, বরং আছে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি whole individuals। কারণ পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের নিয়েই একটি সমাজ গঠিত হয়।

ব্যক্তি কখনোই একা বাস করতে পারে না, পারবেও না। ইতিহাসে আপনি এমন কোনো উদাহরণ পাবেন না। ইতিহাসের মূল শিক্ষাই হচ্ছে সমাজের অস্তিত্ব এবং সমাজের মধ্যেই মানুষের অস্তিত্ব। ইতিহাস কখনোই সমাজের বাইরে যায়নি; বরং সমাজকেই সে বারবার ভেঙেছে, গড়েছে এবং নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। প্রতিটি সময়, প্রতিটি কাল, প্রতিটি যুগের ব্যক্তি বা বংশের ইতিহাস আসলে তার সমাজের ইতিহাস। সমাজের বাইরে ব্যক্তির কোনো ইতিহাস কখনোই রচিত হয়নি, হবেও না এটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

কিন্তু রাজনীতি হচ্ছে এই সমাজের ইতিহাসের একটি অংশ মাত্র। সমাজ রাজনীতিক ইতিহাসের অংশ নয়; বরং রাজনীতিই সমাজের একটি অংশ। সেইভাবেই ইতিহাস রচিত হয়েছে, এবং ভবিষ্যতেও ইতিহাস ঠিক সেইভাবেই রচিত হতে থাকবে।

সুতরাং মানুষের যে ইতিহাস human history ,সেটা মূলত তার সমাজের ইতিহাস, তার সমাজ ভাঙা-গড়ার ইতিহাস। মানুষের যাত্রা, মানুষের পথচলা, সবকিছুই সমাজের ভেতর দিয়েই সংঘটিত হয়েছে। এই কারণেই একটি সমাজের প্রকৃত আত্মা হচ্ছে তার পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের আত্মার সমিলিত রূপ। সমাজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আপনি এর গুরুত্ব কল্পনাতেও পুরোপুরি ধরতে পারবেন না।

কিন্তু আমাদের যারা ক্ষমতার আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, কিংবা যারা রাষ্ট্র, দেশ বা জাতির ধারণাকে সবার উপরে রাখতে চায়, তাদের কাছে সমাজ ক্রমশ অবহেলার বিষয় হয়ে উঠছে আর এই প্রবণতাটা ভয়ংকর। আপনি সমাজ ভেঙে রাজনীতি গঠন করতে পারেন না, সমাজ ভেঙে কোনো দেশ বা কোনো জাতি গঠন করতে পারেন না। সমাজ সেটা কখনোই মেনে নেবে না। কারণ একটি সমাজ হচ্ছে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। সমাজে আপনি রাজনীতি ঢুকাইছেন মানে আপনি ক্ষমতার ক্ষমতা কেন্দ্রিক যে দ্বন্দ্ব এটা কি জারি রাখছেন এবং এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যক্তি খুবই গৌণ হয়ে পড়ে যা সমাজকে তার অস্তিত্বের হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। 

একটি জাতি, একটি দেশ বা একটি রাষ্ট্র কখনোই ব্যক্তিকে গড়ে তোলে না; একটি সমাজই একজন ব্যক্তিকে গড়ে তোলে। সুতরাং সমাজকে গুরুত্বহীন ভেবে রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিতে গেলে বিষয়টা অনিবার্যভাবেই বিপরীতমুখী ও ভয়াবহ হয়ে উঠবে এবং তা হবেই।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...