বাংলা নাটক ও সিনেমা শিল্প কেন আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে তাদের আবেদন হারিয়ে ফেলেছে?







এর নানা কারণ থাকলেও সংক্ষেপে বললে, মূল সমস্যা হলো আধুনিক নাটক ও সিনেমা বিদেশি ধাঁচকে অন্ধভাবে অনুকরণ করছে। ফলে বাংলা সমাজের নিজস্ব মৌলিকতা ও স্বকীয়তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাটক শিল্প, যা এক সময় আমাদের গর্ব ছিল, তা আমরা আজ হারিয়ে ফেলেছি। আবার আধুনিক দর্শক শ্রোতার বিকৃত রুচিও এর কারণ।  ১০-১২ বছর আগেও হুমায়ূন আহমেদ, হানিফ সংকেতের মতো নির্মাতারা অসাধারণ নাটক বানাতেন, যেগুলো আমাদেরকে আবেগিকভাবে নাড়া দিত এবং সেগুলোকে আমরা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে, বিশেষ করে ২০২০ সালের পর থেকে, যে ধরনের নাটক ও সিনেমা তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে না আছে কোনো শৈল্পিক গুণ, না আছে কোনো আলাদা আকর্ষণ। গত ১০ বছরে তৈরি হওয়া নাটক ও সিনেমাগুলো দেখলে মনে হবে, প্রতিটির স্ক্রিপ্ট, কাহিনী এবং প্লট একই রকম। এগুলোর মধ্যে কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি নাটক ও সিনেমার সংলাপগুলোতেও শৈল্পিক মর্যাদার অভাব দেখা যায়। এই নাটকগুলো এখন আর শিল্প বলে মনে হয় না, বরং মনে হয় যাত্রাপালার মতো। যাত্রাপালারও তো একটা শৈল্পিক মর্যাদা ছিল, কিন্তু বর্তমান নাটক ও সিনেমায় সেই মর্যাদাটুকুও অবশিষ্ট নেই।

নতুন পরিচালকরা বাংলা নাটক ও সিনেমার ঐতিহ্যবাহী ধারাকে ধরে রাখতে পারছেন না। বরং তারা ভারতীয়, পাকিস্তানি বা অন্যান্য বিদেশি সিনেমা ও সিরিজের ছাঁচ অনুসরণ করে সেগুলোর মতোই নির্মাণ করতে চাইছেন। এর ফলে বাংলা নাটক ও সিনেমার স্বকীয়তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে, এবং আমরা আর নতুন কোনো মৌলিক সৃষ্টি করতে পারছি না। এর অন্যতম কারণ হলো, অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে আমরা ঠিকভাবে নাটক ও সিনেমা বানাতেই পারছি না। আমাদের পরিচালকদেরও গলদ থাকার ফলে নতুন নাটক ও সিনেমাগুলো শৈল্পিক মর্যাদা পাচ্ছে না। পরিচালকরা সস্তা আয়ের জন্য অতি দ্রুত নাটক ও সিনেমা বানিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু সেই নাটক ও সিনেমাগুলো কুখাদ্য হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে। হয়তো নাটকটি প্রচুর ভিউ পাচ্ছে, কিন্তু তার মধ্যে কোনো আলাদা বিশেষত্ব থাকছে না।

এর আরেকটি কারণ হতে পারে আমাদের নতুন দর্শক-শ্রোতা গোষ্ঠী। তারাও বিদেশি নাটক ও সিনেমার দ্বারা প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত। তারা বিদেশি নাটক ও সিনেমার বিশাল বাজেটের মুভি দেখে বাংলার কম বাজেটের মুভি ও নাটককে তাদের কাছে সাধারণ মনে হয়। ফলে তাদের রুচিরও বিকৃতি ঘটেছে। এই বিকৃত রুচির যোগান দিতে গিয়েই পরিচালকরা অখাদ্য ও কুখাদ্য তৈরি করে বাংলার শিল্পকে ধ্বংস করে ফেলেছেন। একটি নতুন দর্শক শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যারা মূলত বিনোদনের জন্যই নাটক ও সিনেমা দেখে এবং বিদেশি ছাঁচে তৈরি এসব কন্টেন্ট গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফলে বাংলা নাটক ও সিনেমার গুণগত মান ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।

নতুন যুগের নাটক ও সিনেমার জন্য তরুণ নির্মাতাদের প্রয়োজন। তবে শুধু বয়সে তরুণ হলেই চলবে না; তাদের মানসিকভাবে সেই পরিপক্কতা থাকতে হবে, যাতে তারা বাংলার সমাজকে বুঝতে পারে, বাংলার মানুষের চিন্তা-চেতনা ও মননকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে পারে এবং বাংলার জনগণকে ভালোভাবে রিড করতে পারে। তাহলেই বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নাটক ও সিনেমা তৈরি হবে। এজন্য পেশাদার স্ক্রিপ্ট রাইটারদেরও প্রয়োজন।

নতুন প্রজন্মের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা: সামাজিক হস্তক্ষেপ ও স্বাধীনতার সংঘাত



মানুষ সাধারণত নিজের সম্পর্কে কম ভাবে, বরং অন্যের জীবন নিয়ে ভাবতে বেশি পছন্দ করে। অন্যের ভুল-ত্রুটি, ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামানো মানুষের স্বভাব। এই "নাক গলানো"কে আমরা নেতিবাচকভাবে দেখলেও, আসলে এটি সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া। যখন আপনি সমাজে বসবাস শুরু করেন, তখন কিছু নিয়ম ও আচরণ মেনে চলতে হয়। সমাজে সামাজিক সদস্য হিসেবে টিকে থাকতে হলে এই নাক গলানোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।  

সমাজ কখনই সমাজ হয়ে ওঠে? এর জন্য কিছু পূর্বশর্ত প্রয়োজন, যার মধ্যে অন্যতম হলো পারস্পরিক সহযোগিতা (মিউচুয়াল কোঅপারেশন) এবং পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া (মিউচুয়াল ইন্টারেকশন)। এই দুটিই মূলত নাক গলানোর মাধ্যমেই ঘটে। সুতরাং, নাক গলানো খারাপ কিছু নয়, বরং এটি একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া। আপনার সমাজে নাক গলানো থাকা মানে আপনার সমাজ সক্রিয় ও জীবন্ত। সমাজের কার্যকারিতা নির্ভর করে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার উপর, আর এই মিথস্ক্রিয়া তখনই সম্ভব যখন আমরা অন্যের জীবন নিয়ে ভাবি।  

আধুনিক পুঁজিবাদী যুগে, যেখানে ভোগবাদ ও পণ্যের মূল্য মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেখানে নাক গলানোর বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখা স্বাভাবিক। পুঁজিবাদ মানুষকে সমষ্টি থেকে ব্যক্তিতে পরিণত করতে শেখায়। এটি মানুষকে শেখায় কীভাবে নিজের জন্য বাঁচতে হয়, অন্যকে উপেক্ষা করতে হয় এবং কেউ যদি তাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করে তবে তা নিন্দনীয় বলে মনে করতে হয়।  

পুঁজিবাদী সমাজে বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপ (ইন্টারফেয়ার) থাকলেও, আধুনিক ভোগবাদী সমাজ এই হস্তক্ষেপকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে আপনি সমাজের অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারবেন, কিন্তু সমাজের গতিশীলতা অনুভব করতে পারবেন না। কারণ, পশ্চিমা সমাজে নাক গলানোর অভাব রয়েছে। এই কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোর সামাজিক সদস্যরা একে অপরের নাম পর্যন্ত জানেন না।  

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় অগ্রগামী। কিন্তু তাদের সামাজিক কাঠামো তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুই দেশের নাগরিকরা সামাজিক হওয়ার চেয়ে বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা একটি মৃত সমাজের লক্ষণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সাহিত্য ও সামাজিক মাধ্যমও আমাদেরকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে শেখায়। প্রত্যেকে নিজের আলাদা জগৎ তৈরি করে, যেখানে সে নিজেই কেন্দ্রবিন্দু। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাকে আমরা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (ইনডিভিজুয়ালিজম) বলি, যেখানে ব্যক্তি মুখ্য এবং সমষ্টির চেতনা গৌণ।  

মানবিক সংযোগ (হিউম্যান কানেকশন) বা মানবিক সম্পৃক্ততার জন্য পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি এটাকে নাক গলানোর মাধ্যমে সরলীকরণ করেছি। নাক গলানো সমাজের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে এবং সমাজকে টিকিয়ে রাখে। সমাজের প্রতিটি স্তরে আমাদের চিন্তা ও নাক গলানো প্রয়োজন। এটাকে আমরা সামষ্টিক দায়বদ্ধতা বা সামাজিক প্রাসঙ্গিকতার প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারি।  

মজার বিষয় হলো, আপনি যখন অন্যের ব্যাপারে নাক গলান, তখন আপনি এটাকে সহানুভূতি ও সম্পৃক্ততা হিসেবে দেখেন। কিন্তু যখন অন্যরা আপনার ব্যাপারে নাক গলায়, তখন আপনি এটাকে আপনার ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করেন। সমাজের এই দ্বৈততা চিরাচরিত। কিন্তু কখন থেকে আমরা নাক গলানোর বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেছি? এই পরিবর্তন মূলত ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হয়, যখন মানুষ নিজেকে একটি আলাদা সত্তা হিসেবে ভাবতে শুরু করে।  

পুঁজিবাদ ও ভোগবাদ মানুষের সামাজিক চিন্তাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে। তথ্যের বিশাল প্রবাহ ও ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষকে আরও বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলেছে। ফলে, মানুষ সমাজের অনেক কিছুকে বাতিল করে দিয়েছে। বর্তমান সমাজে একা থাকার ইচ্ছা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা দোষের কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সমাজব্যবস্থায় এই প্রবণতা একটি মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে।  

বাংলাদেশের সমাজে ভোগবাদ ও পুঁজিবাদের প্রভাব থাকলেও, এটি এখনও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক চিন্তাকে আঁকড়ে ধরে আছে। নতুন প্রজন্ম, যারা পশ্চিমা ভোগবাদী ও পুঁজিবাদী চিন্তায় প্রভাবিত, তাদের সাথে পুরোনো প্রজন্মের মধ্যে একটি মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব দেখা যায়। এই নতুন প্রজন্ম ব্যক্তিকেন্দ্রিক, একাকীত্বপূর্ণ, স্বার্থপর, ভোগবাদী এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। তারা নাক গলানোর বিষয়টিকে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করে।  

এই নতুন প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য হলো তারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তারা তাদের ব্যক্তিসত্তাকে এমনভাবে রক্ষা করতে চায়, যেমনভাবে পুরোনো প্রজন্ম তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করে। এই পার্থক্য একটি সামাজিক বহিঃপ্রকাশ, যা নতুন ও পুরোনো প্রজন্মের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। নাক গলানোর বিষয়টি নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে হয়, যা তাদের সামাজিক চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক।

গ্রামের অশিক্ষিত ও মূর্খ মানুষরা কি সাম্প্রদায়িক?


প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে না, না মানে একেবারেই না। সাম্প্রদায়িক হতে তো মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং এইটা শহরেই উৎপত্তি শহর থেকেই গ্রামে ছড়ায়। দেখেন সাম্প্রদায়িকতা চিন্তা অনুভূতি তা জাগে মূলত যারা এইসব নিয়ে ভাবে। এবং এইটা মূলত ভাবার কাজটা শুরু হয় শহরকেন্দ্রিক মানসিকতায় যেখানে মানুষ মূলত স্বার্থপর ও এককেন্দ্রিক এবং ব্যক্তি কেন্দ্রিক একটা চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে। এই যে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি এইটা আপনি গ্রামে পাবেন না।

আদর্শিক রাজনীতি: বিভাজন ও সংঘাতের জন্মদাতা ও সমাজে ঘৃণার চক্র

 


আদর্শিক রাজনীতি খুবই ভয়ানক। যারা আদর্শিক রাজনীতি করে তাদের মূল ঝামেলা হচ্ছে এরা সবসময় নিজেকে ঠিক মনে করে। সে যে ভুল করতেও পারে এটা তারা বিশ্বাসই করে না। তাদের আদর্শের সাথে তারা কোনরকম নিগোসেশনে যাইতে চায় না, আপোসও করেও না, আপোস মানেও না। আদর্শ যতই রেসিস্ট কিবা ঘৃণাত্মক হোক না কেন। আদর্শিক রাজনীতি সব সময় বাইনারি ওয়েতে চলে। হয় ঠিক অথবা ভুল অর্থাৎ তুমি হয় আমাকে সাপোর্ট করবা অথবা যদি সাপোর্ট না কর অথবা নিউট্রাল থাকো তাহলে তুমি আমার বিরোধী। এবং এই যে তুমি আমার বিরোধী এইটা থেকে তার প্রচুর হেট করে এবং এই হেট গুলো খুবই মারাত্মক ঘৃণাত্মক,  এই ঘৃণাত্মক কর্মকাণ্ডকেও তারা মনে করে আদর্শের জন্য লড়ে যায়ওা, আদর্শের জন্য যুদ্ধ করে যাওয়া। আদর্শিক রাজনৈতিক নিউট্রালিটিকে ঘৃণা করে। 

বাংলাদেশের মতো একটা জনবহুল দেশে আদর্শিক রাজনীতির কোন ভাত নাই। বাংলাদেশের মতো গরীব এই জনবল দেশগুলোতে দরকার মধ্যমপন্থী এবং যেসব দল অর্থনীতি বেইজড প্ল্যান পলিসিকে বেশি গুরুত্ব দেবে এমন রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে যতগুলো আদর্শিক রাজনৈতিক দল আছে তাদের অধিকাংশই মূলত জাস্ট রাজনীতির ব্যবসা করে, আর কিছু না। আদর্শিক রাজনৈতিক দলগুলোর আরো একটা ঝামেলা তাহলে তারা রাজনীতির ময়দানে প্রচুর কেওয়াস  তৈরি করে। এরা রাজনীতির মাঠ গরম রাখতে চাই এই কারণে প্রচুর কে আওয়াজ তৈরি করে, এবং নিজেদের আদর্শ দিয়া ফ্লেক্স মারে। 

সুতরাং একটা বড় কোশ্চেন হচ্ছে আদর্শিক রাজনীতি কি শুধুই ধর্মীয়? না আদর্শিক রাজনীতিতে বাম, সেক্যুলার, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, এবং যত তন্ত্র-মন্ত্র-বাদ রয়েছে সবগুলো আদর্শকে সামনে রেখে যারা রাজনীতি করে তারাই আদর্শিক রাজনৈতিক দল। এবং এইসব দলসমূহ মানুষকে বা মানুষের রাজনীতি বাদ দিয়ে শুধু এইসব পরিভাষার ইউজ ব্যাপকভাবে করে তখন বুঝবেন এরা হচ্ছে আদর্শিক রাজনৈতিক দল এবং এদের কাছ থেকে আপনাকে নিরাপদ দূরত্ব বজায়  রাখতে হবে। কারণ হেট বা ঘৃণার উৎপাদক হচ্ছে আদর্শিক রাজনৈতিক দলসমূহ। 


রাজনৈতিক অযোগ্যতার ফল: গরিব রাষ্ট্রের মূল সমস্যা রাজনীতিবিদদের অদক্ষতা


একটি গরিব রাষ্ট্রের মূল সমস্যা কোথায়? এর উত্তর হলো রাজনীতি। যখন কোনো রাষ্ট্র সমস্যায় জর্জরিত হয়, তখন রাজনীতিবিদরা সেই সমস্যার মূল দায়ভার নাগরিকদের উপর চাপানোর চেষ্টা করেন। তারা বলে, দেশের এই দুরবস্থার জন্য নাগরিকরাই দায়ী। কিন্তু আসল সত্য হলো, একটি দেশ তখনই দুর্নীতিগ্রস্ত, গরিব ও তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে পরিচিত হয়, যখন সেই দেশের রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিবাজ, অদক্ষ ও অসৎ হয়।  

একটি দেশের নাগরিক যতই ভালো হোক, যদি সেই দেশের নেতৃত্বে থাকা রাজনীতিবিদরা সৎ ও দক্ষ না হয়, তবে সেই দেশের উন্নতি কখনোই সম্ভব নয়। আমাদের সুশীল সমাজ, শিক্ষিত ব্যক্তি বা নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই বলে থাকেন যে, একটি দেশের নাগরিকদের শিক্ষিত ও দক্ষ হওয়াই দেশের উন্নতির মূল চাবিকাঠি। কিন্তু এই কথাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভুলে ভরা। একটি দেশ তখনই এগিয়ে যাবে, যখন সেই দেশের রাজনীতিবিদরা সৎ ও দক্ষ হবে।  

উদাহরণ হিসেবে আমেরিকার কথা ধরা যাক। আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও অসংখ্য অদক্ষ ও অসৎ নাগরিক রয়েছে। তবুও দেশটি উন্নতির শিখরে রয়েছে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি উন্নত দেশেই অদক্ষ ও অশিক্ষিত নাগরিক পাওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের মূল সমস্যা হলো ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের সততা ও দক্ষতার অভাব।  

একটি দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে বা তার আশেপাশে যারা অবস্থান করেন, তাদের সাফল্য ও ব্যর্থতার দায়ভার পুরো দেশকে বহন করতে হয়। এই কারণেই আমি বলছি, রাজনীতিবিদদের সততা ও দক্ষতাই একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং উন্নতির পথে পরিচালিত করবে। নাগরিকদের সততা, শিক্ষা ও দক্ষতা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় না। বরং রাজনীতিবিদদের ভুল, দুর্নীতি ও অসততা দেশকে আরও বেশি সমস্যায় জড়িয়ে রাখে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো বাংলাদেশ।  

সুতরাং, দেশের উন্নতির জন্য নাগরিকদের চেয়ে রাজনীতিবিদদের সততা ও দক্ষতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিবিদরা যদি সৎ ও দক্ষ হন, তবে দেশের উন্নতি অবশ্যম্ভাবী।

সমাজের অমোঘতা: রাষ্ট্রের তুলনায় এক অদৃশ্য অথচ প্রভাবশালী বাস্তবতা

 গুরুত্বের দিক দিয়ে সমাজ বেশি গুরুত্ব পাবে না রাষ্ট্র? এইটা একটা খুবই ক্রিটিকাল প্রশ্ন। এবং আমাদেরকে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে যৌক্তিক এবং খুব সহজেই !  দেখেন আমরা জানি সমাঝের উৎপত্তি রাষ্ট্রের বহুকাল আগেই।  অর্থাৎ সমাজের উদ্ভব পৃথিবীতে মানুষের উদ্ভবের  ইতিহাস এর সমকালীন। মানুষ যখন থেকে নিজেকে চিনতে পেরেছে, তাকে কিভাবে পৃথিবীতে সারভাইভ করতে হবে, তখন থেকেই মানুষ সমাজের উৎপত্তি ঘটিয়েছে। অর্থাৎ সমাজের বাইরে মানুষের কোন ইতিহাস নেই। সমাজ তো মানুষকে অস্তিত্বের আনয়ন করিয়েছে, মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও তার বিকাশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে সমাজের। অপরপক্ষে রাষ্ট্র একটা গৌণ ও কৃত্রিম বিষয় সমাজের দৃষ্টিকোণে অর্থাৎ সমাজের থেকে এর গুরুত্ব কম।  আমরা অনেকেই বলি একটা রাষ্ট্রের অবশ্যই সার্বভৌম ক্ষমতা থাকতে হবে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসে যদি কোন কিছু সার্বভৌম থাকে সেটা সমাজ। সমাজকে আসলে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে না সমাজই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে ।  তবে সমাজের পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ মূলত হয় একটা সমাজের প্রত্যেকটা মানুষের কনসেন্ট দ্বারা যখন একটা সমাজের লঘু অংশ তার বৃহৎ অংশকে প্রভাবিত করতে পারে না তখন সমাজ স্থির থাকে অর্থাৎ সমাজের অধিকাংশের মতামতেই সমাজের চলমানতার ইতিহাস জারি থাকে । কিন্তু রাষ্ট্র হচ্ছে একটা কৃত্রিম ব্যবস্থা যেখানে সমাজ হচ্ছে একটা আদিম ও অকৃত্রিম ব্যবস্থা। সমাজের এই আদিম ও অকৃত্তিমতা সমাজকে রাষ্ট্রের চাইতে বেশি গুরুত্ব দেয়। এবং রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি পরিমাণে শক্তিশালী সংগঠন হিসাবে গুরুত্বের দাবিদার। 

সংবিধান: কোনো সীমানা নয়, পরিবর্তনের ধারায় এক চলমান সত্তা

 সংবিধান কোনো পবিত্র বস্তু নয়, এটি আমাদেরই তৈরি একটি বিধান। "পবিত্রতা"র অজুহাতে সংবিধানকে অপরিবর্তনীয় বা অচল করে রাখা পুরোপুরি অবান্তর। সংবিধানের এই ধারায় হাত দেওয়া যাবে না, ওই ধারায় সংশোধন করা যাবে না—এই ধরনের চিন্তাভাবনাকে আমি একেবারেই বাচ্চামি মনে করি। সংবিধান যুগের চাহিদা ও জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার জন্য অবশ্যই সুপরিবর্তনীয় হতে হবে। এটিকে বারবার সংশোধন ও পুনর্লিখন করা যেতে পারে। সংবিধানকে ধর্মীয় গ্রন্থের মতো অলঙ্ঘনীয় করে তোলা কখনোই সঠিক নয়। ধর্মীয় বিধান এক জিনিস, আর সংবিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংবিধানকে ধর্মীয় গ্রন্থের মতো পবিত্র ভাবা এবং সেভাবে আচরণ করা অনুচিত। সংবিধান পবিত্র নয়, এটি কেবল বিধানের সমষ্টি, যা দেশের অন্যান্য আইন একে অনুসরণ করবে। যদি সংবিধানের মাধ্যমে কারো চিন্তা, চেতনা, রাজনৈতিক মতবাদ বা আদর্শকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা অত্যন্ত হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যদি সংবিধান বইলা দেয় গোটা দেশের মানুষ কোন তন্ত্র, কোন মতবাদ বিশ্বাস করবে এর চেয়ে কোন বড় কৌতুক আর হতে পারে না। 

"সংবিধানকে মাথায় তুলে রাখতে হবে," "সংবিধানকে পবিত্র মানতে হবে," বা "সংবিধান এমন উচ্চতায় নিতে হবে যেখানে মানুষ একে সিজদা করবে"—এ ধরনের প্রতারণামূলক ধারণাগুলোর মূল কারণ হলো চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী, অতি বামপন্থী, আল্ট্রা সেকুলার, গোঁড়া-মৌলবাদী  অন্ধ দেশপ্রেমিকদের চরমপন্থা। তারা সংবিধানকে এমন এক উচ্চতায় তুলে ধরে, যেন এটি কোনো পবিত্র বস্তু। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংবিধান তো কেবল একটি আইনগত দলিল, যার কাজ মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত রাখা, কোনো পবিত্র আদর্শ হওয়া নয়।

সংবিধানকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে এটি জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় এবং তাদের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়। সংবিধানের মূল উদ্দেশ্য দেশকে রক্ষা করা নয়, বরং নাগরিকদের সরকারের অব্যবস্থাপনা, শোষণ, এবং অত্যাচারের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া। সংবিধান কোনো সরকারের স্বার্থে তৈরি নয়, এটি জনগণের জন্য তৈরি। তাই সংবিধানের মাধ্যমে কেবল নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে হবে, শাসকদের নয়।

জামাত ও প্রজ্ঞাহীনতার রাজনীতি

ইসলামিক রাজনৈতিক দলের মূল কাজ রাজনীতি করা, দাওয়াতি কার্যক্রম নয়। ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রাজনীতির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, দাওয়াতের মতো ব্যাপক কাজের জন্য এর বাইরেও অনেক সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব কাজ করছে। জামাত ইসলামের মূল সমস্যা হলো, তারা তাদের প্রকৃত ভূমিকা এবং কার্যপরিধি সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেনি। তারা তাদের নেতাকর্মীদের সঠিকভাবে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে—তাদের কাজ আসলে কী এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কীভাবে অর্জন করতে হবে, সেটাও তাদের অজানা রয়ে গেছে।

রাজনীতি অত্যন্ত কঠিন ও জটিল বিষয়। এটি সহজভাবে, নিছক আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিশ্লেষণক্ষমতা, ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ছাড়া সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। "ভাই ভাই" সম্পর্ক, সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া, কিংবা সবাই আমার আপনজন—এমন মন-মানসিকতা নিয়ে রাজনীতি করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং গভীর চিন্তা। আমার মতে, জামাত ইসলামীর একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলেও, তারা সেই লক্ষ্য কর্মীদের কাছে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। শিবির ও জামাত নিয়ে সমাজে যে বিশাল প্রত্যাশা বা হাইপ তৈরি হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত তাদেরই ক্ষতির কারণ হবে, কারণ এই দলগুলো মেধা বা প্রজ্ঞার চেয়ে সাধারণ, সহজ-সরল মানুষদের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামাত ইসলামীর অবস্থান স্পষ্ট নয়। দলের বেশিরভাগ কর্মী গ্রামীণ পটভূমি থেকে আসা সাধারণ মানুষ, যারা রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় দুর্বল। ফলে তাদের কর্মী বাহিনী শহরের এমনকি গ্রামের মানুষেরও ওপর প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হচ্ছে, এবং ইসলামের মূল শিক্ষা বা নীতি বোঝার ক্ষমতাও তাদের নেই। এই অদক্ষ কর্মী বাহিনীর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সফলতা অর্জন সম্ভব নয়; বরং এটি বিতর্ক ও সমস্যার জন্ম দেবে।

আধুনিক যুগে একটি ছোট ভুলও বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।  তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে একজন কর্মীর অসচেতনতা পুরো দলকে বড় ধরনের বিপর্যয়ে ফেলতে পারে। এ বিষয়টি রাজনৈতিক দল হিসেবে উপলব্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

আপনি যদি ইসলামিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হতে চান, তবে ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে। এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি শুধুই রাজনৈতিক দল হতে চান, তবে তুরস্কের একে পার্টি বা তিউনিসিয়ার এনাহদা পার্টির মতো কাজ করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে ইসলামিক আম্ব্রেলার বাইরে এসে কাজ করতে হবে। যতদিন আপনার দলের নামের সাথে 'ইসলামিক' শব্দটি থাকবে, আপনাকে ইসলামিক নীতির বাইরে গিয়ে কিছু করা থেকে বিরত থাকতে হবে, নতুবা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে।_

একটি উদাহরণ দিই— আপনি যদি হিন্দুদের উৎসবে সম্প্রীতি জানাতে পূজা মণ্ডপে যান, এটি ঠিক নয়। ঈদগাহে কোনো পুরোহিত এসে ঈদের নামাজের সময় সম্প্রীতি জানালে আপনার কেমন লাগবে? পূজা তাদের জন্য উপাসনা, যেমন আমার আপনার জন্য ঈদের নামাজ ইবাদত। তাদের উপাসনা করতে দিন, তাদের স্বাধীনতা দিন। সম্প্রীতি দেখাতে পূজা মণ্ডপে যেতে হবে না; বরং গরিব হিন্দুদের ঘরে যান, তাদের কষ্টের কথা শুনুন, তাদের পাশে দাঁড়ান। সেটাই প্রকৃত সম্প্রীতি।

আপনার মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করুন—রাজনীতি অথবা দাওয়াত। আপনি যা করবেন, তা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করুন, নতুবা বিভ্রান্তির শিকার হবেন।

উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ডানপন্থী রাজনীতি: বর্তমান বিশ্বে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম সবচেয়ে বেশি দেশে ডানপন্থী সরকার ও নেতারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। পৃথিবীর শক্তিশালী দেশসমূহের অনেকগুলোতেই এখন এই ডানপন্থী সরকার এবং ডানপন্থী নেতা আছেন, যাদেরকে বলা হয় খেপাটে নেতা, এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাদের Electorally Elected Fascists হিসেবেই মনে করেন। আমেরিকা, তুরস্ক, ভারত, রাশিয়া, আর্জেন্টিনা, এমনকি ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর কিছু কিছু জায়গায়ও এই ডানপন্থী নেতাদের জয়জয়কার পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। পৃথিবীর এখন যেকোনো দেশেই নির্বাচন হোক না কেন, এই ডানপন্থীরা ব্যাপক আকারে Ballot বিপ্লবের মাধ্যমে জিতে আসবে। সুতরাং, পৃথিবীর রাজনীতি তার আগের অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে যাবে।

গত ২ দশক আগেও যে Internationalism/আন্তর্জাতিকতাবাদ ও Free Trade/উদারনৈতিক বাণিজ্যিকরণের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল, তাতে কিছুটা ভাটা পড়বে। অধিকাংশ ডানপন্থী সরকার ও নেতারা অত্যন্ত বাগ্মী এবং বক্তৃতার জোরেই জনগণকে Manipulate করে তাদের Populism বা জনতুস্টিবাদ চালু রাখে তাদের ক্ষমতারোহনকে সহজ করে তোলে । এই নেতারা যতটা না কাজে, তার চেয়ে বেশি মুখে। তথ্যপ্রবাহ যতটা সহজলভ্য হচ্ছে, মানুষ ততটাই নিজেদেরকে গুটিয়ে ফেলতে চাচ্ছে। দুই দশক আগেও ধারণা ছিল যে মানুষের আন্তর্জাতিক মনোভাব দিন দিন বাড়বে; কিন্তু এই তথ্য প্রবাহের যুগে মানুষ যেন Xenophobic ও উগ্র জাতীয়তাবাদকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এটি দুনিয়ার জন্য ভালো কিছু নয়। এই ডানপন্থার ব্যাপকতা পৃথিবীর অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়বে— ইতিমধ্যেই আমরা জার্মানি, ফ্রান্স, কিংবা ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে ডানপন্থার উত্থান লক্ষ করছি। ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিলেও একই অবস্থা।

ডানপন্থার উর্বর ভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল আফ্রো-এশিয়ান দেশগুলো; কিন্তু বর্তমানে এই দেশগুলোতেই আমরা অপেক্ষাকৃত উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি লক্ষ্য করছি। তবে পশ্চিমের Liberal /উদারনৈতিক দেশগুলোতেই ইলেক্টেড উগ্র জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীরা এখন উর্বর ভূমির ফসল হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। সমস্ত রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বোদ্ধাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে, এই নতুন বিশ্বব্যবস্থা ও ধারণার উদ্ভব বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাবে নাকি পিছিয়ে দেবে, তা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বিশ্বে কি প্রভাব পড়তে পারে!

[এক]

বাংলাদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার প্রভাব পড়তে পারে কি না, তা ভিন্ন কথা; কিন্তু বিশ্বে এর ব্যাপক প্রভাব দেখা যাবে। আমেরিকান প্রভাব বিশ্বজুড়ে কমবে, যা নিয়ে ট্রাম্পের বিশেষ চিন্তা নেই। তিনি মূলত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগী থাকবেন এবং আমেরিকার অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেবেন। এজন্য নীতি বা পলসি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি অভ্যন্তরীণ গুরুত্ব দিবেন এবং এইটাতে খুবই আক্রমণাত্মক থাকবেন, যেমনটা তার প্রথম মেয়াদেও দেখা গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, woke culture নিয়ে বড় বিতর্ক দেখা দেবে। বাইডেন প্রশাসনে এই woke culture অনেক প্রভাব বিস্তার করেছিল, যা আমেরিকান বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনায় প্রবলভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। ট্রাম্প এদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। আমেরিকান সমাজ অনেক আধুনিক ও প্রগতিশীল হলেও, এই ultra-liberal-woke আন্দোলন এতটাই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়েছিল যে জনগণকেও তাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের জয়ে woke culture-এর বিরুদ্ধে একটি প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। ফলে আল্ট্রা ওক কালচার বা আল্ট্রা লিবারেল আরো বেশি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষ্যাপা হয়ে থাকবে।  এতে ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই ব্যস্ত থাকবেন, এবং আমেরিকান প্রশাসনের সাথেও কিছুটা বিরোধে পড়বেন, যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রভাব বিস্তারে বাধাগ্রস্ত করবে।

[দুই]

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ট্রাম্প আসার ফলে যুদ্ধ কমতে পারে। তিনি পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি এলে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার চেষ্টা করবেন। রাশিয়া নিজেও চায় না যে এই যুদ্ধ স্থায়ী হোক এবং ট্রাম্পের সাথে রাশিয়া তুলনামূলক বেশিই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাই ট্রাম্প যেভাবেই হোক পুতিনকে রাজি করিয়ে ইউক্রেন সংকটে সমাধান আনতে পারেন। এতে ইউক্রেনকে কিছুটা ছাড় দিতে হতে পারে এবং হয়তো ট্রাম্পের আমলেই ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আমরা দেখতে পাব অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট জেলনেস্কির মেয়াদ হয়তো শেষের পথে।  ইউরোপও যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে বাধ্য হবে। ইরাক থেকেও হয়তো পুরোপুরি সৈন্য সরিয়ে আনবেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করবেন, তবে সামরিক সরঞ্জামের আমদানি হয়তো আরো বাড়বে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পুরোপুরি থামবে না। ইসরাইল আরো আগ্রাসী হতে পারে, কিন্তু তাদেরও কিছু ছাড় দিতে হতে পারে,  এক্ষেত্রে হয়তো তাকে লেবানন থেকে নিয়ে আসতে হতে পারে কিবা গাজা হতেও । তবে হামাসের জন্য ট্রাম্প অবশ্যই কঠোর এবং ভয়ংকরই হবেন। সৌদি আরবের সাথে তার সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হবে, কেননা তার জামাতা জ্যারেড কুশনার সৌদি যুবরাজ MBS-এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। দুবাইয়ের MBZ-এর সাথেও তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে, ফলে আরব আমিরাতের সাথেও সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এর ফলে সুদান ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ আরও স্থায়ী হতে পারে। তুলনামূলক কম প্রভাবশালী দেশগুলো বাইডেন ও ওবামা প্রশাসনের আমলে যে ধরনের আমেরিকান  domination বা প্রভাবের অধীন ছিল, তা অনেকটাই কমে যাবে, এবং তারা স্বাধীনভাবে তাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োগ করতে পারবে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন, কারণ তিনিই একমাত্র আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, যিনি উত্তর কোরিয়ার কোনো উচ্চ পর্যায়ের নেতার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন। এক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়াকে হয়তো সামরিক সাহায্য কমিয়ে দিতে পারেন অথবা সামরিক সাহায্য দিলেও সে ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া কে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। 

[তিন]

যদি ট্রাম্প কোনো দেশের জন্য হুমকি হয়ে থাকেন, তবে সেটি হলো চীন। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে চীনের সাথে আমেরিকার একটি তীব্র বাণিজ্যিক যুদ্ধ শুরু হবে, এবং এতে চীন কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের দিকে আরো ঝুঁকতে পারে, কারণ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও তারা চীনের সাথে সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। ট্রাম্পের চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে সংঘাত হওয়া নিশ্চিত, এবং চীনও সেটি জানে। সুতরাং ট্রাম্প যদি কারো জন্য হুমকি হয়ে থাকেন, তবে সেটি চীন। তাইওয়ান ইস্যু আরও গুরুত্ব পাবে এবং ট্রাম্প প্রশাসন চীনকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে এটি কাজে লাগাবে। ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে পারে, এবং মোদি প্রশাসনও এই সম্পর্ক কাজে লাগাতে পারে চীনের বিরুদ্ধে। চীন-বিরোধী জোটগুলো আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হবে বলেই মনে হয়। 

[চার]

যে যাই বলুক, বাংলাদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় নির্বাচনের সরাসরি বড় প্রভাব না পড়লেও কিছুটা প্রভাব দেখা যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, ড. মুহাম্মদ ইউনুস বড় কোনো ঝামেলায় পড়বেন না বলেই মনে হয়। ভারতীয় লবি বা অনেক বাংলাদেশি মনে করেন যে ট্রাম্প ড. ইউনুসের বিরোধী, এবং মোদি প্রশাসন হয়তো ট্রাম্পকে কাজে লাগিয়ে ইউনুস-বিরোধী কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা কম, কারণ ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ইউনুসের বিরোধী হলেও, আমেরিকান প্রশাসন মূলত ইউনুসের পক্ষেই থাকবে। ফলে এই বিষয়ে ট্রাম্প খুব বেশি সক্রিয় হবেন না।

সর্বোচ্চ যা ঘটতে পারে, তা হলো আওয়ামী লীগ হয়তো নিষিদ্ধ হবে না এবং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা বাংলাদেশি রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ এনে দিতে পারে। তবে সবচেয়ে ট্র্যাজিক যে ঘটনাটা ঘটবে সেইটা হচ্ছে জুলাই আগস্টের গণহত্যার বিচার হয়তো থমকে যাবে এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর আরও বেশি করে সক্রিয় হয়ে যাবে।  অন্যদিকে, ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর উপর আক্রমণের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে—বিশেষত হিন্দু, বৌদ্ধ, বা খ্রিস্টানদের উপর হামলার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং এটা যারাই করুক না কেন ভারত এসব ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প কে দিয়ে আরও বাংলাদেশ-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করাতে পারে।

জনতুষ্টির (populism) রাজনীতি কি আদর্শিক রাজনীতি?

 জনতুষ্টির (populism) রাজনীতি কি আদর্শিক রাজনীতি?

উত্তর অবশ্যই না হবে এবং এটি একটি আদর্শবাদী রাজনৈতিক দলকে আশাহত করার জন্য যথেষ্ট। কারণ এই উত্তরাধুনিক কেওয়াটিক পৃথিবীতে কোনো দেশের জনগণই, আদর্শিক রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে চায় না, যারা আদর্শ দিয়া দেশ চালাবে বা দেশের ক্ষমতায় আসবে। এই আদর্শিক রাজনীতি বামপন্থী বা ধর্মী আদর্শ, যাই হেক না কেন, পৃথিবীর মানুশেরা এই আদর্শিকতার উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। 

পৃথিবীর দেশে দেশে আদর্শিক রাজনীতির প্রভাব ও চাহিদা কমে যাচ্ছে এবং এই চাহিদা আরও কমতে থাকবে। এখন পৃথিবীর রাজনীতি চালিত হবে জনতুষ্টি বা পপুলিজমের মাধ্যমে।

আর এই জনতুষ্টির (populism) রাজনীতি যে কত ভয়ানক বিপজ্জনক যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ভারত এর দিকে দেখলেই বুঝতে পারব।

বাংলার মানুষ কেন বিরাজনীতিকরন পছন্দ করে ?

 তরুণ রাজনীতিবিদ ও রাজনীতি সচেতন বুদ্ধিজীবীরা যে বিরাজনীতিকরণের প্রসেস চলছে বা কোসেস জারি আছে বলে অভিযোগ করেন, তাদের কাছে জানতে ইচ্ছা করে—মানুষ কেন বিরাজনীতিকরণকে সমর্থন করবে না? আধুনিক প্রজন্ম কেন বিরাজনীতিকরণকে আরও বেশি করে চাইবে না?

এই রাজনীতি তো দেশকে থার্ড ওয়ার্ল্ডের গর্তে আটকে রেখেছে। রাজনীতি আজ দেশের আমলাতন্ত্র, গণতন্ত্র, এমনকি উন্নয়নকেও রাজনীতিবিদদের স্বার্থের হাতিয়ার বানিয়েছে। বাংলাদেশের এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে রাজনীতি ঢুকে তা ধ্বংস করেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আইন-আদালত পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় রাজনীতি প্রবেশ করে দেশের সমস্ত সিস্টেমকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে কোন সরকারের আমলে দুর্নীতি ছিল না, প্রমাণ করে দেখাক সমস্ত দলের  রাজনীতিবিদরা। তারা কেউই দুর্নীতিহীন বাংলাদেশ উপহার দিতে পারেনি দেশের জনগণকে। 

মানুষ কখনোই রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে ভালো কিছু পায়নি, পাওয়ার আশাও রাখে না। অতীত অভিজ্ঞতায় রাজনীতিবিদদের নিয়ে মানুষের স্মৃতিচারণ সুখকর নয়। এ কারণেই মানুষ রাজনীতিকে ঘৃণা করে এবং যেকোনো বিরাজনীতিকরণের ধারণাকে নিজেদের মুক্তির পথ বলে মনে করে।

একটা জরিপে দেখা গেছে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালেই মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি সেবা পেয়েছে যেকোনো ধরনের হ্যাজল ছাড়াই। এবং এ কারণেই তারা ডঃ মুহাম্মদ ইউনুস পরিচালিত এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় দেখতে চায়।

সুতরাং, বিরাজনীতিকরণের যে আশঙ্কা রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা করেন, তার সমাধান তাদের নিজেদের হাতেই। তাদের রাজনীতিকে গণমানুষের রাজনীতি এবং তাদের বুদ্ধিজীবিতাকে জনগণের বুদ্ধিজীবিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নইলে, মানুষ বিরাজনীতিকরণকেই মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নেবে। আর তাদের এটাও মাথায় রাখতে হবে যে বিরাজনীতিকরনের সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে সেনা শাসন বা সামরিক শাসন। যা কখনোই কাম্য নয়।

রাষ্ট্র আমার স্রষ্টা নয়, আমি রাষ্ট্রের পূজক নই। রাষ্ট্র সেবা প্রদান করবে, আর আমি তা গ্রহণ করব। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আমার জন্য, আমার অস্তিত্ব রাষ্ট্রের জন্য নয়।

 রাষ্ট্র আমার স্রষ্টা নয়, আমি রাষ্ট্রের পূজক নই। রাষ্ট্র সেবা প্রদান করবে, আর আমি তা গ্রহণ করব। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আমার জন্য, আমার অস্তিত্ব রাষ্ট্রের জন্য নয়।



জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের মূল সমস্যা হলো, এই রাষ্ট্রে মুচি থেকে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত সবাইকে রাষ্ট্রের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগী হতে বাধ্য করে। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র মূলত এটেনশন সিকার। নাগরিকদের ভাবতে শেখায়, কারা রাষ্ট্রের বন্ধু, কারা রাষ্ট্রের শত্রু। এর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী  রাষ্ট্র বিভাজনের ধ্বংসাত্মক খেলায় মত্ত থাকে যেখানে সে নিজের নাগরিককেই শত্রু হিসেবে পরিগণিত করে। এভাবে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র সব সময় সক্রিয় (active) থাকতে চায়। নিজেদের একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে তুলে ধরে এবং আশপাশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে প্রচুর নেতিবাচক শক্তি (negative forces) এই "জীবন্ত সত্তা"কে ধ্বংস করতে কাজ করছে। এই শক্তিগুলোকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভাষায় "রাষ্ট্রবিরোধী" বা "দেশদ্রোহী" বলে চিহ্নিত করা হয়।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী ও সংস্থাগুলো(Agency) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত থাকে। তবুও যদি নাগরিকদের সারাক্ষণ রাষ্ট্রবিরোধিতা বা দেশদ্রোহিতার দায় নিতে হয়, তবে সে রাষ্ট্রকে সফল বলা যায় না। সফল রাষ্ট্র সেই, যেখানে নাগরিক নিশ্চিন্তে তাদের অধিকার ও সুবিধা ভোগ করে, আর নিরাপত্তার দায় রাষ্ট্র নিজেই পালন করে।

রাষ্ট্র কোনো জীবন্ত সত্তা (living entity) নয়। এটি নাগরিক সেবার জন্য তৈরি এক কৃত্রিম ব্যবস্থা( ম্যান মেড)। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকদের সেবা দেওয়া, তাদের কাছ থেকে সেবা দাবি করা নয়। তাই রাষ্ট্র নিয়ে অযথা আবেগ বা উচ্ছ্বাস দেখানো অনর্থক।

তাই আমাদের বুঝতে হবে,  একটি রাষ্ট্র জীবন্ত সত্তা নয়। এর কোনো প্রাণ নেই। এই রাষ্ট্র মূলত নাগরিকদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নাগরিকদের রাষ্ট্রকে সেবা করার জন্য নয়। রাষ্ট্র নিয়ে অযথা মাতামাতি বা আবেগপ্রবণ হওয়ার কিছু নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের জন্য সেবা নিশ্চিত করা, আর নাগরিকদের অধিকার সেটি গ্রহণ করা এবং শান্তিতে বসবাস করা।

রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই রাষ্ট্রকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা জনগণকে "রাষ্ট্রের প্রজা"তে পরিণত করে এবং রাষ্ট্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন এটি স্রষ্টার মতো সবাইকে আগলে রাখে। এভাবে রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে তাদের আধিপত্যবাদী রাজনীতিকে শক্তিশালী করে, আর জনগণ শোষণের শিকার হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজ অপরিহার্য হলেও রাষ্ট্র অপরিহার্য নয়। সমাজ স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে, এটি মানবজীবনের স্বাভাবিক উপাদান। কিন্তু রাষ্ট্র একটি কৃত্রিম সৃষ্টি। সুতরাং রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা সমাজের চেয়ে বেশি হতে পারে না। সমাজই মানুষের মৌলিক চাহিদা ও জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্র তার জন্য একটি মাধ্যম মাত্র।

এই উপলব্ধি আমাদের রাষ্ট্র এবং রাজনীতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। তাই আমাদের উচিত বাংলাদেশকে অতি-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত না করা। বরং এটিকে একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করা, যেখানে প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিক নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে তাদের প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে পারে।

বাংলাদেশ যেন নাগরিকদের "প্রজা" হিসেবে গণ্য করা থেকে বিরত থাকে এবং কখনোই নিজেকে "স্রষ্টা" বা সর্বময় কর্তৃপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন না করে।

তেমনিভাবে, রাজনীতিবিদদেরও উচিত রাষ্ট্রকে ক্ষমতার জটিল ও কূটকৌশলপূর্ণ খেলায় ব্যবহারের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানো। একমাত্র এই দৃষ্টিভঙ্গিই একটি সেবাধর্মী, কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে পারে।

আধুনিক মানুশেরা ধার্মিক না হইয়া ধর্ম পাগল হইলে কি হইবে ?

 


আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে আধুনিক মানুষের ধার্মিক না, তারা যতই নিজেদের ধার্মিক বলুক না কেন, তারা ধর্ম ও সামাজিক ঐতিহ্যের ব্যাপারে খুবই অনিহার মধ্যে আছে। তারা এগুলোকে ভালোবাসে, কিন্তু এগুলোকে তাদের জীবনে প্রবেশ করতে দেয় না অর্থাৎ, এগুলোর প্রতি একটা সংবেদনশীলতা আছে, কিন্তু এগুলোকে তারা তাদের জীবনের মূল অংশ হিসেবে গ্রহণ করে না।  এবং এইটার জন্যে যে পৃথিবীতে এক জটিল বিপদ ধেয়ে আসছে এইটার কারণ খুঁজে আমাদের বের করতে হবে, না হলে সামনে যে ধর্ম যুদ্ধ ও বিপদ আসছে, তা রুখা খুবই ব্যাপক আকারে মানুষকে ঝামেলার মধ্যে ফেলে দেবে এবং এই বিষয়টা বা এই বিপদ আমাদেরকে এখনই অ্যাড্রেস করতে হবে যতো দ্রুত সম্ভব, না হলে এক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মহামারি দেখা দেবে যা ধর্মের নামে হলেও তা কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও জাতিভিত্তিক ভাবেই যুদ্ধ লেগে যাবে গোটা পৃথিবী তে । 


এইযে  পৃথিবীর ইতিহাসে যদি কোনো জাতি বা দেশ প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে উন্নতি ও উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছাতে পেরে থাকে , সেটা হচ্ছে ইউরোপ। কিন্তু আমরা ২০১৫ সালের আগেও কল্পনা করতে পারিনি যে এই ইউরোপ একদিন ধর্মীয় ব্যাপকতা বেড়ে যাবে, ইউরোপের মানুষরা ধর্ম নিয়ে এত বেশি কনসার্ন হয়ে যাবে। কিন্তু তা ২০২০ সালের পর থেকে যেন স্বাভাবিকভাবেই ঘটছে। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেই এখন ধর্মীয় ব্যাপকতা আর ধর্মে নিয়ে পলিটিক্স ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধর্মের আলাপ আসছে। যুবক থেকে শুরু করে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ধর্মে নিয়ে ভাবছে এবং তা যেন ভাইরাসের মতো এই আল্ট্রা  ধর্ম বিদ্বেস  ছড়িয়ে পড়ছে। যারাই ধর্মের কথা বলছে, তাদেরকে যেন ত্রাতা হিসেবে দেখা হচ্ছে বাট তাদের কোন লক্ষ বা উদ্দেশ্য কে খতিয়ে দেখা হচ্ছে না । দেখেন, এখানে ধর্মের কথা বলা আর ধার্মিক হওয়া দুটি আলাদা ব্যাপার, এদের মধ্যে পার্থক্য আছে। এই  ফলেই ঝামেলা কোন ধর্মই যুদ্ধ চাই না শুধু প্রভাব রাখার জন্য । কিন্তু দেখেন ইউরপে কি হচ্ছে?  ইউরোপের তরুণরা এখন নিজেদের হিস্যা চাই, অংশ চায়, এই অংশ বা হিস্যা হবে  তাদের বাপ-দাদার ধর্মের ভিত্তিতে, সামাজিকতার ভিত্তিতে এবং এই জন্যেই  তারা যারাই  তাদের ধর্মের কথা বলছে বা বাপ-দাদার ধর্মের কথা বলছে বা ধর্মীয় সমাজের কথা বলছে, তাদেরকেই তারা ত্রাতা হিসেবে দেখছে। যেমন আমেরিকার কথাই ধরা যাক ! যে আমেরিকা ছিল লিবারেল ও আল্ট্রা লিবারেলদের ঘাঁটি, সেখানেই ট্রাম্পের মতো একজন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী পুরো আমেরিকার সোশ্যাল ও পলিটিক্যাল সিচুয়েশন পরিবর্তন করে দিয়েছে।  এই পাগলাটে ট্রাম্প লিবারেলদের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবকে একদম আমেরিকার মানুষের কাছে ভিলেন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঠিক একই ঘটনা ঘটছে অধিকাংশ ইউরোপের দেশে, এবং এইসব দেশের পলিটিক্যাল স্ফিয়ারে ধর্মভিত্তিক ও রাইট-উইংগার পলিটিক্যাল পার্টি ও তাদের পাগলাটে নেতারা খুব ভালোভাবেই জায়গা করে নিচ্ছে। আমরা এখন ইউরোপের মত দেশ গুলাতে ভিক্তর অর্বআন বা লা পেন , নাইজেল ফারাজের মত পাগলাটে নেতার আনাগোনা দেখছি যারা প্রতিনিয়ত ইউরোপ কে আরো অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ।  লেফট বা যারা লিবারেল পলিটিক্স করত, তারা এখন কিছুটা ব্যাকফুটে আসছে। আমরা যদি ফ্রান্সের মতো নাস্তিক বা লেফট  প্রভাবিত দেশেও এইরকম রাইট-উইংগারদের উত্থান দেখি, তাহলে আর অন্য সব ইউরোপীয় দেশগুলো কী অবস্থা হতে পারে, আপনি কল্পনা করতে পারেন! এইটা হচ্ছে আত্মঘাতী ইউরোপের জন্য, ঠিক আবার মনে করুন এই ঝড় আসতে পারে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর দিকে।


আধুনিক মানুষরা ধর্ম নিয়ে ভাবে, তারা চায় ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হোক, কিন্তু ধর্ম তাদের লাইফস্টাইলে প্রবেশ করুক, তা তারা চায় না। এখানে সমস্যা হলো, ধর্ম নিয়ে গোটা বিশ্বের এই বিপজ্জনক উত্তেজনা একটি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এবং এই ঝামেলা শুধু ইউরোপ বা আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, গোটা বিশ্বকেই এর প্রভাবে বিস্ফোরিত হতে হবে। আমরা জানি, গোটা পৃথিবী এখনও পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তারাই আমাদের সবকিছুকে প্রভাবিত করে। কিন্তু এই আধিপত্যের প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মের ধার ধারে না, পুরোটাই মূলত অর্থনৈতিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।। কিন্তু আমেরিকা ও ইউরোপে যে ধর্মভিত্তিক ও রাইট-উইংগারদের উত্থান হচ্ছে, তারা যদি ক্ষমতা পায়, তবে এই ডমিনেশনে ধর্ম আসবে স্বাভাবিকভাবেই  এবং এটাই এক ধরনের হুমকি পৃথিবীর জন্য। এখন পর্যন্ত পূর্ব ও লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকার মতো দেশগুলোর সমাজ রিলিজিয়াস ও উগ্র রিলিজিয়াস হলেও তাদের পলিটিক্যাল ও গভর্নমেন্টাল স্ফিয়ার এখন পর্যন্ত ইরিলিজিয়াস ও লিবারেলদের জয়জয় কার  এবং সামনের দিনগুলোতে এটা পরিবর্তন আসবে না, এমন কোনো ক্লু  আমরা দেখছি না। এমনকি এইসব দেশের নেতা, পলিটিক্যাল বা রিলিজিয়াস লিডার এমনকি তাদের নাগরিকরাই ধর্মের ব্যাপারে অনাগ্রহী। কিন্তু সবচেয়ে যে বিপজ্জনক হয়ে দেখা যাচ্ছে, তা হলো ,যদি ওয়েস্টার্ন দেশগুলোর পলিটিক্যাল বা সোশ্যাল পলিসিতে এই রাইট-উইংগার ও ধর্মীয় একটা জোয়ার পায়, তবে এই ওয়েস্টার্ন দেশগুলোর ডমিনেশনে একটা হুমকি আসবে এবং প্রাচ্যের দেশগুলো ওয়েস্টার্ন দেশগুলোর যে  ডোমিনেশন তা তারা মানবে না, এবং এ নিয়ে একটা ব্যাপক ক্রাইসিস হবে তা কিন্তু পৃথিবীর জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসবে না এইটাই স্বাভাবিক। 

আমাদেরকে এখনই এটা নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে এবং পৃথিবীর শান্তি কামী মানুষকে একটা ক্রাইসিস মোমেন্টের অভিজ্ঞতা নিতে হতে পারে এরও প্রস্তুতি আমাদের নিয়া রাখতে হইবে ।

মানুষ এত উদ্ধত হইয়া উঠল কেন?

 



১.

আধুনিক সময়ে মানুশ এত উদ্ধত ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠার পেছনে  নানাবিধ কারণ রয়েছে। এই উদ্ধত স্বৈরাচারিতা মানুশকে যেন এক খাপছাড়া ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর ফলে মানুশ সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মুখামুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত এবং মানুশের অস্থিরতা পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে কেওাটিক সিচুয়েশেন। অর্থাৎ, আধুনিক জীবনের যে দোলাচলপূর্ণ অবস্থা, তাতে মানুশ নিজেকে ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারছে না বা এই কেওাটিক পরিস্থিতির সাথে অ্যাডাপ্ট করতে পারছে না। 


উপরের বিষয়গুলো যদি যুক্তিসংগতভাবে বিশ্লেষণ করি এবং এর উত্তর দিতে চাই তাহলে বলতে হবে পরিবর্তন  অর্থাৎ দেখা যাবে যে মানুশের এই উদ্ধত স্বৈরাচারিতার অন্যতম কারণ হলো পরিবর্তন, বিশেষ করে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা এনে দিয়েছে, যার ফলে সে পৃথিবীর ওপর অসীম প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। মানুশের হাঁতে বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে ব্যাপক এবং এই ব্যাপকতা মানুশকে পৃথিবীতে দিয়েছে অসীম প্রভাব ও ক্ষমতা । এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তনে মানুশের হাতের ব্যাপক ক্ষমতায়নে তার উদ্ধত ও স্বৈরাচারিতার চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করছে। সে সমাজকে সমাজ মনে করে না, সমাজের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চায় না পারতপক্ষে, তার কাছে ব্যক্তি বড় হয়ে উঠেছে সমষ্টির চাইতে এই ধরনের নানা রকম নেতিবাচক  পরিস্থিতির জন্য মানুশ এই পরিবর্তন দায়ী। 

২.

বিংশ শতাব্দীর আগেও পৃথিবীতে মানুষের সামাজিক পরিবর্তন ও দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই ধীরগতির ছিল। একটি আবিষ্কার থেকে আরেকটি আবিষ্কারের পথে যেতে মানুষের হাজার হাজার বছর লেগে যেত। যেমন, আগুন আবিষ্কার করতে মানুষের মিলিয়ন মিলিয়ন বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, চাকা আবিষ্কার করতেও লেগেছে দীর্ঘ সময়। এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষ অস্ত্র, তীর-ধনুক, কৃষিকাজের জন্য লাঙল ও হালের মতো প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এই গুলায় মানুশ ব্যাবহার করতো আগে পাথর এবং তারপর পাথর থেকে লোহায় আস্তে লেগেছে আরো হাজার হাজার বছর। বাট এই গুলার পরিবর্তন খুব ধীরগতির হওয়ায় মানুষ সবসময় সংগ্রামমুখর জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল এবং পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। সেই সময় মানুষ একদিকে প্রকৃতিকে ভয় পেত, অন্যদিকে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাও ছিল। এর ফলে মানুষের বিনয় ও সংযম বজায় থাকত। এইটার জন্য মানুশের ছিল এক ভারসম্যপুর্ন অবস্থা পৃথিবীর সাথে। যেখানে না ছিল উদ্ধততা না স্বৈরাচারিতা। 

৩.

কিন্তু বিংশ শতাব্দী থেকে একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের পর এই পরিবর্তনের গতি এতটাই তীব্র হয়েছে যে, এর আর কোনো সীমা নেই। যা প্রতিনিয়ত বাড়তেই আছে।  প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হচ্ছে, যা মানুষের জীবনের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ প্রতিদিন নতুন ধারণা ও প্রযুক্তির মুখোমুখি হচ্ছে, কিন্তু সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় সে পাচ্ছে না। আবার সামাজিকতাতে আসছে নতুনত্ব, সামাজিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় এসেছে ভিন্নতা এইসব কিছুকে মানুশেরা ঠাওর করে ওঠতে পারছে না। ফলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যার ওপর মানুষের নিজেরও নিয়ন্ত্রণ নেই। সে প্রতিনিয়ত নতুন কিছুর সন্ধান করছে, এবং এটাতে সে সফল হচ্ছেও। কিন্তু তাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে সে বর্তমানকে ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না, অতীতকে ধারণ করতে পারছে না, ভবিষ্যৎকেও পরিষ্কারভাবে কল্পনা করতে পারছে না। এই হত-বিহবল পরিস্থিতিতে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে যার ফলেই সে ও তার জীবন হয়ে উঠেছে লাগামহীন,  বিশৃঙ্খল। 

এরই ফলে মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে। সমাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতা ও বিশৃংখলাকে ট্যাকল দিতে মানুশকে দ্রুত অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে যার ফলে  সিদ্ধান্ত নিতে নিতে মানুশ নিজেকে স্বৈরাচারের ভূমিকায় নিয়ে গেছে।  এই পরিস্থিতি তাকে বানায় দিচ্ছে ব্যাপক উদ্ধত।

The Rise of Domineering Human Nature

 


1.  

In modern times, there are various reasons behind humans becoming so arrogant and authoritarian. This arrogance and authoritarianism have plunged humans into a chaotic and disorderly situation. As a result, human society, states, politics, family, and personal lives are constantly facing a kind of instability, and human restlessness has brought chaotic situations to the world. In other words, in the fluctuating conditions of modern life, humans are unable to properly adapt themselves or adjust to this chaotic situation.

If we logically analyze the above points and try to answer them, we must say that change is the reason. It will be seen that one of the main reasons for this human arrogance and authoritarianism is change, especially technological change. The advancement of science has brought immense power into human hands, enabling them to exert unlimited influence over the world. The vast progress of science has given humans immense influence and power on Earth. The massive changes in science and technology are driving human arrogance and authoritarianism.

2.  Even before the 20th century, social changes and the use of technology in daily life were very slow. It took humans thousands of years to move from one invention to another. For example, it took millions of years for humans to discover fire, and a long time to invent the wheel. Gradually, humans developed technologies like weapons, bows and arrows, and agricultural tools such as plows. Initially, humans used stones, and then it took thousands of years to transition from stones to iron. However, since these changes were very slow, humans were always accustomed to a life of struggle and maintained a balanced relationship with the Earth. At that time, humans feared nature on one hand, but also had love for it. As a result, humility and restraint were maintained. This created a balanced relationship between humans and the Earth, where there was neither arrogance nor authoritarianism.

3.  But from the 20th century to the 21st century, the pace of change has become so rapid that it has no limits. It continues to grow every day. New technologies are being invented every day, accelerating the pace of human life. Humans are constantly exposed to new ideas and technologies, but they do not get enough time to adapt to society. As a result, a kind of chaotic situation has arisen in personal and social life, over which humans themselves have no control. They are constantly searching for something new, and they are succeeding in this. But in the process, they are losing themselves. As a result, they cannot properly understand the present, hold onto the past, or clearly imagine the future. In this bewildered state, they have lost themselves, and as a result, their lives have become unrestrained and chaotic.

As a result, human mental stability is under threat. Various forms of disorder and instability have emerged in society. To tackle this instability and chaos, humans are forced to make quick decisions, which has led them to take on an authoritarian role. This situation is making them increasingly arrogant.

নারীর নায্য হিস্যা নতুন বাংলাদেশে

 

We


envision a society where everyone, regardless of background, feels safe, valued, and empowered. However, in the emerging new  Bangladesh, many women are experiencing a growing sense of fear and uncertainty. Why is this happening? Is the nation truly aware of their struggles? Are we, as a society, genuinely concerned about their well-being, or are we turning a blind eye?

Nowdays we often hear news that can make a woman feel depressed and hesitant, making her question whether this new Bangladesh truly belongs to her or not. 

It is imperative that we address this issue and ensure it reaches not only the policymakers and stakeholders of the new Bangladesh but also those who hold significant ideological influence, including Islamist leaders. Today, many women hesitate before stepping outside, feeling increasingly excluded from social activities and left behind in the race for progress. This is not the vision of an inclusive Bangladesh we aspire to build.

We must confront this reality head-on, seek tangible solutions, and create a Bangladesh where no one—regardless of gender—feels abandoned, unheard, or left behind. The time for action is now.

সামাজিক অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরুপ যেকোনো ইভিল এর মধ্যে সবচেয়ে ডেঞ্জারাস বা ধ্বংসাত্মক হচ্ছে গ্রামীণ রাজনীতি অথবা সিম্পলি জাতীয় রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন।

 



[১]


সমাজের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন বিষয়কে আমরা সামাজিক শত্রু বা সামাজিক ইভিল হিসেবে চিনি, যেমন বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, অশিক্ষা, মারামারি, কাটাকাটি, দুর্নীতি ইত্যাদি। এগুলো সমাজের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে প্রশ্ন হলো, এগুলোর চেয়েও কি বেশি ধ্বংসাত্মক নয় অপরাজনীতি, অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন। আমরা জানি, রাজনীতি মূলত রাষ্ট্রের ব্যাপার— কে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে এবং কোন মতবাদ বা স্কুল ওফ রাজনৈতিক থট রাষ্ট্রক্ষমতা অধিগ্রহণ করবে, তা রাষ্ট্রীয় রাজনীতির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যখন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা রাজনীতিকে গ্রামপর্যায়ে টেনে আনে, তখনই ঘটে রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন, যা গ্রামের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। রাজনীতিকে গ্রামীণ পর্যায়ে টেনে আনার অর্থ মূলত জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন স্কুল অফ থট বা মতবাদকে গ্রামীণ সমাজে প্রবেশ করানো। এর প্রক্রিয়া হলো— যখন কোনো রাজনৈতিক মতবাদকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য বিতর্ক তৈরি করা হয়, অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার উপযুক্ত, তাদের পরিকল্পনা, নীতি, ইস্তেহার বা ম্যানিফেস্টো সবচেয়ে কার্যকর— এই বিষয়গুলো যখন গ্রামীণ সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তখনই তা রাজনীতির গ্রামীণ সামাজিকায়ন ঘটে।

[২]

জাতীয় রাজনীতির যেকোনো মতবাদ বা রাজনৈতিক চিন্তাধারা গ্রামীণ শান্তিকে বিঘ্নিত করতে পারে, গ্রামের স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে কলুষিত করতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামীণ পর্যায়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, মারামারির মূলে রয়েছে এই রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ। কারণ, আপনাকে মনে রাখতে হবে যে গ্রামীণ মানুষ শহরের মানুষের মতো এতটা সমালোচনামূলক (critical) চিন্তা করে না। তাদের চিন্তাধারা প্রায়শই বাইনারি হয়ে থাকে—কোনো কিছু হয় একেবারে সঠিক, নয়তো সম্পূর্ণ ভুল। মাঝামাঝি কোনো জটিল বা বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি তারা সহজে গ্রহণ করতে পারে না। এরই প্রতিফলন ঘটে রাজনৈতিক মতবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রেও। তারা যাকে ভালো মনে করে, সেটাকেই একমাত্র সত্য বলে গ্রহণ করে, আর বিপরীত মতাদর্শকে শত্রু বা শয়তানি কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখে। ফলে শহরের তুলনায় গ্রামীণ সমাজে মতের বৈচিত্র্য ও সহনশীলতা অনেক কম। এই কারণেই রাজনৈতিক যে কোনো বিতর্ক গ্রামীণ সমাজের বাইরেই থাকা শ্রেয়; সেখানে এ ধরনের আলোচনা বেশি মানানসই।

[৩]

আমাদের বুঝতে হবে, নগররাষ্ট্রের ধারণা মূলত শহরকেন্দ্রিক। আগেকার নগর রাষ্ট্রের যে ধারণা তা মূলত যেকোন রাষ্ট্রের রাজধানী ও বড় শহর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। রাজধানী বা গুরুত্বপূর্ণ নগরীগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু যখন গ্রামীণ সমাজে এই রাজনীতিকে অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়, তখন সেখানকার স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যায়, যা আমাদের ইতিহাসে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।

এ কারণেই আমি মনে করি, সামাজিক অস্তিত্বের জন্য যত ধরনের হুমকি বিদ্যমান, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক হলো রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন। সামান্য পরিমাণেও এটি গ্রামীণ শান্তিকে ভঙ্গুর করে দিতে পারে এবং সমাজে স্থায়ী অস্থিরতার বীজ বপন করতে পারে।

জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত অবমাননার ধারা ও শাস্তি বহাল রাখা যাবে না।

 জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত অবমাননার ধারা ও শাস্তি বহাল রাখার যে উদ্যোগ ইন্টারিম গভর্নমেন্ট নিতে চাচ্ছে, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

একটা রাষ্ট্র তখনই রাষ্ট্র হইয়া উঠবে, যখন আপনি রাষ্ট্রের কোনো বিষয়কেই সেক্রেড বা পবিত্রকরণ করবেন না। একটা আধুনিক, মানবতাবাদী রাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা, সংবিধান, জাতীয় নেতা  ও জাতীয় সংগীতসহ অন্যান্য জাতীয় বিষয়ের অবমাননার জন্য শাস্তি প্রদান করা জঘন্য রকমের ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের লক্ষণ এবং অমানবিক।

কিছুদিন আগেই পুরোহিত চীন্ময় সাহেবকে জাতীয় পতাকা অবমাননার মতো হাস্যকর ও ভিত্তিহীন মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। এটি শুধু অবমানবিকই নয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতার  অপব্যবহারও। যদি চীন্ময় সাহেব সত্যিই রাষ্ট্রবিরোধী কোনো অপরাধ করে থাকেন, তবে সঠিক ও প্রমাণসাপেক্ষ অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু জাতীয় পতাকা অবমাননার মতো তুচ্ছ ও ভিত্তিহীন অজুহাতে একজনকে গ্রেফতার করে জেলে বন্দী রাখা নিতান্তই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার প্রদর্শন এবং নাগরিক স্বাধীনতার সরাসরি লঙ্ঘন।

জাতীয়  সংগীত, পতাকা, চিহ্ন, নেতা বা প্রতীকের মতো বিষয় অবমাননার জন্য কোনো শাস্তি থাকা উচিত নয়, এবং এ ধরনের শাস্তি আরোপকারী কোনো আইনও প্রণয়ন করা যাবে না। এসব আইন শুধু ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিফলন, যা নাগরিকদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করে। একটি আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা করা, পবিত্রতার নামে রাষ্ট্রীয় প্রতীকগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে মানুষের কণ্ঠরোধ করা নয়।

আন্ত ব্যাক্তিক স্বৈরাচার : সামাজিক অস্তিত্বের সংকট

 


[১]

আন্তঃব্যক্তিক স্বৈরাচার সমাজের জন্য এক গুরুতর হুমকি,এটি এমন একটি প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ স্থান দেয় এবং অন্যদের প্রয়োজন ও অনুভূতিকে উপেক্ষা করে। এই প্রবণতা মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করে এবং তাদের নিজের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া-পাওয়াকে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শেখায়। এতে ব্যক্তি নিজেকে ঈশ্বরতুল্য মনে করা শুরু করে এবং বিশ্বাস করে যে তার ইচ্ছাই সর্বোচ্চ।

এই মানসিকতা একজন মানুষকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যায় যেখানে সে মনে করে, তার চাওয়া-পাওয়ার বাইরে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে যা চাইবে, তা তাকে অবশ্যই পেতে হবে। এ অবস্থায়, সমাজ বা সোসাইটি তার ইচ্ছাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে বা তার চারপাশের মানুষ ও সারাউন্ডিং  এই বিষয়ে কী ভাবছে, তা নিয়ে তার কোনো আগ্রহ থাকে না।

এভাবে নিজের স্বৈরাচারী মনোভাব ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সে তার চারপাশের মানুষের দুঃখ-কষ্টকে উপেক্ষা করতে শেখে। সমাজের অসুবিধা বা অস্বস্তি  এবং আনকম্ফর্টনেস কে তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। নিজের ইচ্ছাকে পূর্ণ করার প্রয়াসে, সে অন্যের ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করতে দ্বিধা করে না। এই প্রক্রিয়ায়, তার স্বৈরাচারী মানসিকতা সমাজের সামষ্টিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।

[২]

আধুনিক পৃথিবীর লার্নিং প্রসেস মানবজাতিকে ক্রমশ স্বৈরাচারী করে তুলছে। এই প্রক্রিয়া এমনভাবে মানুষের চিন্তা-ভাবনায় ঢুকে গেছে যে মানুষ এটিকে আদর্শ হিসেবে  আইডিয়ালাইজ করছে। এর প্রভাব সরাসরি সমাজে পড়ছে। সমাজ এক ধরনের কাঠামো বা প্লাটফর্ম, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে অনেকের মধ্যে একজন হয়ে থাকতে হয়। সমাজ কখনোই চায় না যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে সমাজের সংযোগ ছিন্ন করে ফেলুক। বরং সমাজ প্রত্যাশা করে, মানুষ একটি সাধারণ কমিউনিকেশন ল্যাঙ্গুয়েজ, কালচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ, নর্মস এবং কাস্টমসের মধ্য দিয়ে একে অপরকে সহায়তা করবে। সমাজ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করে ঠিকই, তবে ব্যক্তির স্বৈরাচারী হওয়ার প্রবণতা প্রতিহত করাও তার অন্যতম দায়িত্ব। আর ব্যক্তি যাতে নিজ স্বাধীন ভাবি কোন কাজ করতে না পারে ও তার ব্যক্তি প্রবণতায় স্বৈরাচারী না হতে পারে, এই কারণে সোসাইটি তার সমস্ত রকম চেষ্টা প্রচেষ্টা করে এবং ব্যক্তিকে স্বৈরাচারী হতে বাধা প্রদান করে। সমাজের  অন্যতম বাধা প্রদানকারী হাতিয়ার বা উইপেন হচ্ছে সামাজিক ক্রীয়া প্রতিক্রিয়া বা সোশ্যাল ইন্টারেকশন, এর মাধ্যমেই সমাজ ব্যক্তিকে স্বৈরাচারী হতে বাধা প্রদান করে। 

[৩]

আধুনিক সময়ে একটি বড় সমস্যার উদ্ভব হয়েছে—মানুষের মধ্যে আন্তঃব্যক্তিক ইন্টারেকশনের অভাব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সংযোগের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, মানুষ দিন দিন একাকীত্বকে বেছে নিচ্ছে। একে অপরের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ছাড়াই মানুষ নিজের ইচ্ছা, চেতনা, ভালোলাগা ও খারাপ লাগাকে অগ্রাধিকার দিতে শিখছে।

এর ফলে ব্যক্তি নিজেকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে সমাজকে এড়িয়ে চলছে। সে মনে করে, তার ইচ্ছাই যথেষ্ট; অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। এই মানসিকতা ব্যক্তি এবং সমাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে, যা সমাজের জন্য প্রকৃত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ আজ একাকী থাকা শিখে ফেলার কারণে অন্যের সহায়তা ছাড়াও সে নিজের চিন্তা-চেতনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালোলাগা ও খারাপ লাগার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এতে সে মনে করে, নিজের স্বকীয়তার চিহ্ন পৃথিবীতে রাখতে হলে অন্যের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। এই মানসিকতা তাকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

ফলে, সমাজের গুরুত্ব তার কাছে ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ব্যক্তি মনে করে, সমাজ কেবল একটি সেকেলে কাঠামো যা তার স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এইভাবে ব্যক্তি সমাজকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে এবং তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। 

[৪]

এই  আন্ত ব্যক্তিক স্বৈরাচারী মানসিকতার উত্থানের মূল ক্ষেত্র হচ্ছে একক পরিবার। একক পরিবারে বাবা-মা ও দুই ভাই-বোনের মধ্যে একটি ছোট্ট কাঠামো গড়ে ওঠে। এতে পারিবারিক পরিবেশে ব্যক্তির আদান-প্রদান ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে না। একক পরিবারের ব্যক্তিরা পর্যাপ্ত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও পরস্পরের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে, তারা তাদের ইচ্ছার সীমানা নির্ধারণে ব্যর্থ হয়। অন্যের চাহিদা বা অনুভূতিকে বুঝতে অপারগ হয়। সমাজ সবসময় একত্রিকরণের ওপর জোর দেয়। এটি চায় সবাই একে অপরের সুখ-দুঃখে সামিল হয়ে একসাথে পথচলা শিখুক। তবে একক পরিবারের এই বিচ্ছিন্ন কাঠামো ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করছে। এটি সমাজের ঐক্য ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এবং একক পরিবারের যেটা সবচেয়ে বড় বড় সেইটা হচ্ছে সোসাল ইন্ট্রাকশন বা সামাজিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার  যে মাত্রাটা, সেটা অনেক কমে যায়। 

সমাজ সবসময় একটি একভূত মানবগোষ্ঠীর ধারণায় বিশ্বাসী, যেখানে সবাই একে অপরের সুখ-দুঃখে শরিক হয়ে তা উপভোগ করে। এটি একত্রিকরণের নীতিকে সমর্থন করে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা সমাজের নীতি, কাস্টমস এবং মূল্যবোধের (norms and values) সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে আধুনিক একক পরিবারের প্রভাব এই ঐক্যবদ্ধ সমাজের ধারণাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

একক পরিবারগুলো সমাজের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে, প্রায়শই সমাজের কাস্টমস ও মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য করে। এই বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিকে তার নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ দিলেও, এর ফলে ব্যক্তি আরও বেশি স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারে।

আধুনিক সমাজে শিক্ষা থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে মানুষ ক্রমেই পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ায়, তারা একাকী বাস করার প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এতে তাদের নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি গুরুত্ব বাড়ছে এবং অন্যদের চাহিদা বা অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীলতা কমছে।

এই বিচ্ছিন্নতা ও স্বাধীনতার প্রতি অতিমাত্রিক আকর্ষণ আন্তঃব্যক্তিক স্বৈরাচারের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। এতে সমাজ তার ঐক্যবদ্ধ কাঠামো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে। ব্যক্তির ইচ্ছার সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান ও সমাজের নীতিকে উপেক্ষা করার এই প্রবণতা সমাজের সুসংহত কাঠামো ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

Is interpersonal autocracy a Threat to Society?



Interpersonal autocracy poses a significant threat to society. This phenomenon reveals the inner conflict within individuals, as they prioritize their desires, aspirations, and wants over everything else. They begin to see themselves as the ultimate authority, akin to a deity, believing that their wishes are paramount and must be fulfilled at any cost. They disregard societal perspectives and the opinions of their surroundings, choosing instead to focus solely on their personal ambitions.

In such a state, their autocratic mindset and plans enable them to ignore the pain and discomfort of their environment. They become indifferent to the unease of society and reject the needs of others in favor of their own desires. This tendency to impose their will often leads to the denial of others' rights and wishes.

Modern learning processes have exacerbated this issue by fostering autocratic tendencies among individuals and idealizing these traits. The societal impact of this shift is significant, as society inherently demands individuals to coexist harmoniously within a collective framework. Society compels individuals to adopt common communication languages, cultural practices, norms, and customs to maintain cohesion. While society values individual freedom, it also endeavors to prevent individuals from becoming autocratic, employing various measures to resist such tendencies.

The contemporary challenge lies in the reduced level of human interaction. Be it through social media or other communication platforms, people have increasingly learned to live in isolation, often without engaging in meaningful interactions. They start believing that they can prioritize their thoughts, preferences, and desires independently, without relying on others. Consequently, they begin to perceive themselves as independent entities capable of leaving a lasting footprint on the world. This detachment leads to the avoidance and disregard of society, a matter of genuine concern for the collective well-being.

Thus, one can infer that autocratic tendencies in individuals prompt them to think of society as unnecessary. They view society as outdated and perceive it as an obstacle to their freedom and self-expression.

The Nurturing Ground for Autocracy: Modern Nuclear Families

The primary breeding ground for interpersonal autocracy lies within modern nuclear families. In such families, consisting of parents and one or two children, the process of mutual exchange and socialization is often underdeveloped. This limited interaction prevents individuals from adequately experiencing or understanding the boundaries of their desires and aspirations. As these individuals rarely encounter the wishes and aspirations of others within their socialization process, they fail to comprehend the collective needs and sentiments of society.

Society, by nature, seeks to create a cohesive community where individuals share in each other’s joys and sorrows. It emphasizes integration and collective living. However, modern nuclear families tend to operate outside the traditional norms and customs of society, bypassing societal values. This often leaves individuals within such families more susceptible to developing autocratic tendencies.

Additionally, modern society's structural dynamics, including education and employment, further detach individuals from their families. This isolation fosters a growing inclination towards self-reliance and the pursuit of personal desires, intensifying the propensity for interpersonal autocracy.

In essence, the decline of familial and social interaction, coupled with the rise of individualistic lifestyles, has significantly contributed to the proliferation of interpersonal autocracy, posing an existential challenge to the collective fabric of society.

নয়া জেনারেশনের সমাজ সংকট, বিরূপ মনোভাব ও আন্ত:ব্যক্তিক স্বৈরাচার

 



১.

বর্তমান প্রজন্ম কেন সমাজকে ঘৃণা করে বা মনে করে যে সমাজ কিংবা কমিউনিটি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং তাদের বিকাশ ও প্রকাশের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে? নতুন প্রজন্মের এই দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে গড়ে উঠল, এবং তাদের এই অভিযোগ কতটা যৌক্তিক বা গ্রহণযোগ্য?


মূলত, নতুন প্রজন্মের সমাজ বা কমিউনিটির প্রতি অভিযোগের অন্যতম কারণ হলো পৃথিবীর উদীয়মান নতুন ব্যবস্থায় প্রচলিত গতানুগতিক সমাজব্যবস্থার ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজব্যবস্থা, যা মূলত শহরকেন্দ্রিক। এই শহরকেন্দ্রিক চেতনা ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা মানুষের জীবনধারায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এই শহরকেন্দ্রিকতা সমাজের মানুষকে ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে, যা সমাজের চিরায়ত কার্যক্রম বা ফাংশন ও ভূমিকাকে অস্বীকার করছে। শহরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় পারস্পরিক সম্পর্কের তুলনায় একক ব্যক্তির অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাগুলোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবার শহরকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তি হচ্ছে স্বৈরাচার। এখানে ব্যক্তিই মুখ্য হয়ে ওঠে—তার চিন্তা, ভালো লাগা, খারাপ লাগা, রুচি-অরুচি ইত্যাদির প্রতি আলাদা গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ফলস্বরূপ, ব্যক্তির চারপাশের পরিবেশ কিংবা পারস্পরিক মানুষের তুলনায় তার নিজস্ব অনুভূতিই অগ্রাধিকার পায়। শহুরে সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিই সর্বেসর্বা, এবং এই সমাজ ব্যক্তি-চেতনায় এমন এক মনোভাব গড়ে তোলে যেখানে নিজের চারপাশের মানুষের অনুভূতি বা চিন্তাকে এড়িয়ে চলতে শিখতে হয়।  প্রযুক্তি, সামাজিক মাধ্যম, নাটক, সিনেমা ইত্যাদির মাধ্যমে শহরকেন্দ্রিক সমাজের যে চিত্র বা সাংস্কৃতিক আদর্শায়ন বা আইডিয়ালাইজেশন  আমরা দেখতে পাই, তা মূলত এই ব্যবস্থার প্রচার ও প্রসার ঘটায়। ফলে, শহুরে সমাজকেই পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে আদর্শ অর্থাৎ শহরে সমাজকে আইডিয়াল সোসাইটি  হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এটি প্রমাণ করতে চাওয়া হয় যে শহুরে সমাজই শ্রেষ্ঠ, যেখানে ব্যক্তি, তার চিন্তা এবং অনুভূতিই মুখ্য, আর বাকি সবকিছু গৌণ। টিভি, সিনেমা, নাটক এবং নতুন প্রযুক্তি নির্ভর বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের কালচারাইজেশনের মাধ্যমে ব্যক্তি কেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। এর ফলে, এই নতুন সমাজব্যবস্থাকে আদর্শ বা আইডিয়াল সমাজব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।


২.

এই চিন্তা ও অনুভূতিগুলো আমাদের নিউ জেনারেশন দ্রুত এডাপ্ট করে নিচ্ছে। এর ফলে তারা সমাজের কাঠামো, তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, এবং সমাজের ইউনিফর্মিটিকে ডিনাই করতে চায়। তাদের ধারণা, সমাজ একটি শৃঙ্খল, যা তাদের ব্যক্তিসত্তাকে বাঁধতে চায়। এই শৃঙ্খল তাদের স্বাধীনতা হরণ করে এবং তাদের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ, নিউ জেনারেশন সমাজকে তাদের সহযোগী হিসেবে না দেখে বরং একটি বন্ধন হিসেবে দেখে। তাদের মনে হয়, সমাজ তাদের বন্দী রাখতে চায়, যেন তারা সমাজের একটি কারাগারে আবদ্ধ কয়েদি।


৩.

এই কারণেই নতুন প্রজন্মের সমাজের প্রতি তাদের অসন্তোষ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার বিশ্বব্যাপী বিস্তার এবং সেই সাথে শহুরে সমাজের চিন্তা-ভাবনা, যা টিভি, সিনেমা, নাটক ও সামাজিক মাধ্যমসমূহে প্রচারিত ও জনপ্রিয়কৃত হচ্ছে,  একটি বিশেষ শহরকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোকে আদর্শ বা আইডিয়ালাইজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। এই কাঠামো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার উপর জোর দেয়, যেখানে সমাজের ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে উপেক্ষা করা হয়। ফলত, নতুন প্রজন্ম শহরকেন্দ্রিক এই সংস্কৃতি দ্রুত গ্রহণ করছে এবং গতানুগতিক পুরাতন সমাজ বা কমিউনিটিকে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী একটি নিয়ন্ত্রণমূলক শক্তি হিসেবে দেখছে। এটি নতুন প্রজন্মের সমাজবিরোধী মনোভাব এবং নেতিবাচক অভিযোগের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে।


৪.

মূল প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের সমাজব্যবস্থার প্রতি যে নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি তা আসলেই কতটা যৌক্তিক। এ দৃষ্টিভঙ্গি যে যথাযথ নয়, তার অন্যতম প্রমাণ সমাজ ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সমাজ মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি; সমাজ ছাড়া মানুষের পৃথক কোনো অবস্থান নেই। মানুষের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতাই সমাজের উপর নির্ভরশীল, কারণ সমাজই মানুষের অভাব পূরণ করে এবং তার অস্তিত্বকে কাঠামোবদ্ধ করে। তবে, এই কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে সমাজ কিছু মাত্রায় আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠে। এই আধিপত্য সমাজের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার একটি উপায়। কিন্তু সমাজ নিজে কোনো জীবন্ত সত্তা নয়; বরং এটি ব্যক্তি টু ব্যক্তির মিথস্ক্রিয়া দ্বারা পরিচালিত হয়। ব্যক্তি যখন অন্য ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, তখন সেই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাজের কাঠামো নির্মিত ও সংহত হয়।

এখানেই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ভূমিকা স্পষ্ট হয়। সামাজিকীকরণ কেবল ব্যক্তির বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে না; এটি তার চিন্তা, চেতনা ও অনুভূতিকে সংজ্ঞায়িত করতেও সহায়ক হয়। সামাজিকীকরণের অভাব মানে শুধু ব্যক্তি নয়, বরং পুরো সমাজ কাঠামোর বিলোপ।


৫.

ফলে, নতুন প্রজন্মের সমাজের প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি একপ্রকার বিভ্রান্তি। সমাজকে শৃঙ্খল মনে করা, বা তার আধিপত্যকে দমনমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করা, সমাজের প্রকৃত কাঠামো ও ভূমিকার প্রতি গভীর অজ্ঞতা থেকেই উদ্ভূত। এই ভুল ধারণা শুধুমাত্র সমাজ ও ব্যক্তির সম্পর্ককেই অবমূল্যায়ন করে না, বরং ব্যক্তির সম্ভাব্য বিকাশকেও সংকীর্ণ করে তোলে।


নতুন প্রজন্ম চায় যে তাদের চিন্তা-চেতনা ও অনুভূতিগুলো গুরুত্ব পাবে, তাদের পছন্দ-অপছন্দ বা ভালো লাগা-খারাপ লাগার ভিত্তিতে সমাজ পরিচালিত হবে। কিন্তু তাদের এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমাদের চিন্তা-চেতনা ও অনুভূতি পরিবর্তনশীল হলেও কিছু অনুভূতি চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয়। এই অনুভূতিগুলো পৃথিবীর ধ্বংস পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। যেমন, পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, নিকটাত্মীয়দের প্রতি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি , কিংবা মেট বা সংগীর প্রতি বিশেষ টান—এগুলো চিরায়ত এবং সমাজে এদের গুরুত্ব অপরিসীম।


৬.

সমাজ এই চিরায়ত অনুভূতিগুলোকে জারি রাখতে চায়, কারণ এগুলো সমাজের স্থিতিশীলতা এবং মানুষের স্বাভাবিক সহাবস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান সমাজব্যবস্থা, বিশেষত প্রযুক্তিনির্ভর ও শহরকেন্দ্রিক সমাজ, এসব চিরন্তন অনুভূতিতেও পরিবর্তন আনতে চায়। এখানেই সমস্যার উৎপত্তি।

নতুন সমাজব্যবস্থার এই পরিবর্তিত চিন্তা-ভাবনা নতুন প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে, তাদের পুরাতন সমাজব্যবস্থার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে। তারা মনে করছে যে পুরাতন সমাজব্যবস্থা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতিবন্ধক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই পুরাতন ব্যবস্থার মধ্যেই মানুষের গভীরতম সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধনের ভিত্তি নিহিত। নতুন প্রজন্মের উচিত এই বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং সমাজের স্থায়িত্ব ও মানবিকতার চিরন্তন অনুভূতিগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করা।

সমাজ ও রাষ্ট্রের পার্থক্য!

 



সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য তাদের ইতিহাস, চেতনা, এবং উদ্দেশ্যের মধ্যে নিহিত। একটি সমাজের ইতিহাস সাধারণত ব্যক্তিগত বা সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সমাজ অতীতের খলনায়ক(সামাজিক ভিলেন) ও  নেতিবাচক ঘটনাগুলোকে দীর্ঘসময় ধরে মনে রাখে না। এর ফলে সমাজে একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় থাকে। সমাজ অতীতের মতপার্থক্য বা বিরোধ মুছে দিয়ে বর্তমানকে গুরুত্ব দিয়ে ভবিষ্যৎকে সুন্দর করার প্রচেষ্টা চালায়। এ কারণেই সমাজ সংহতিতে বেশি গুরুত্ব দেয়। 


অন্যদিকে, রাষ্ট্র অতীতের ইতিহাস ও চেতনার ওপর বেশি নির্ভরশীল। রাষ্ট্র অতীতের ঘটনাগুলোকে বর্তমান সময়েও আলোচনায় ধরে রাখতে চায়। রাষ্ট্র চেতনা বা অতীতের "সোনালী যুগ" পুনরুদ্ধারের ওপর কেন্দ্রীভূত। রাষ্ট্র বারবার তার জনগণকে অতীতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে চায়, যাতে জনগণ অতীতের আদর্শ ও চেতনার মধ্যে বেঁচে থাকে। রাষ্ট্র তার অতীত ও ঘটনাবলীর মাধ্যমে জোরপূর্বক একটি ইতিহাস ও চেতনা চাপিয়ে দিয়ে জনগণকে সেবাদাসে পরিণত করে। অতীতের খলনায়কদের ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করলেও নেতিবাচক ঘটনাগুলোর সমাধান করতে ব্যর্থ হয়। এ কারণেই রাষ্ট্রে সংহতি ও সম্প্রীতির বড়ই অভাব। 


এখানেই সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি মৌলিক পার্থক্য প্রতিভাত হয়। সমাজের অতীত ও ভবিষ্যৎ তুলনামূলকভাবে সীমিত বা সীমাবদ্ধ হলেও রাষ্ট্রের অতীত ব্যাপক এবং বিস্তৃত। রাষ্ট্র বর্তমানকে খুব কম গুরুত্ব দিয়ে অতীতকে ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়। 


এই কারণেই বলা যায়, রাষ্ট্র ও সমাজ কখনোই এক নয়। তাদের পথ ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাষ্ট্র অতীতমুখী, যেখানে সমাজ বর্তমান ও ভবিষ্যৎমুখী।

what comes after love?

 


what comes after love?  

-Loneliness 


ভালোবাসার পরে কী আসে? – একাকীত্ব।


যখন কোনো মানুষের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় এবং তা উভমুখী হয়, তখন মূলত দুইটি মানসিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে। একটি হলো একে অপরের প্রতি আকর্ষণ এবং মানসিক যত্ন, অন্যটি হলো একাকীত্ব।


এই একাকীত্ব ভালোবাসারই একটি অবিচ্ছেদ্য বাইপ্রোডাক্ট। আপনি যখন ভালোবাসায় সম্পূর্ণরূপে সিক্ত হন এবং আপনার সঙ্গীও আপনাকে ভালোবাসে, তখন বুঝতে হবে—আপনারা উভয়েই এক ধরনের গভীর একাকীত্ব অনুভব করছেন। মজার বিষয় হলো, এই একাকীত্ব এমন একটি অভিজ্ঞতা যা কেউ কাউকে শেয়ার করতে পারে না, এবং এটি প্রকাশ করাও অনেক সময় অসম্ভব। সমস্যার মূল এখানেই।


এই একাকীত্বের উৎপত্তি নিজের পরিচয় হারানোর ভয় থেকে যতটা না আসে, তার চেয়ে বেশি আসে নিজের মানসিক জটিলতায় অস্থির হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। এই একাকীত্বের সাথে থাকে অভিমান, ক্ষোভ এবং আরও নানা নেতিবাচক অনুভূতি, যা ভালোবাসার গভীরতাকে আরও ভারী করে তোলে।

ভালোবাসার সময় প্রায়ই দেখা যায়, একজন সঙ্গী অন্য সঙ্গীর উপর তার সমস্ত মানসিক প্রক্রিয়ার প্রতিফলন ঘটাতে চায় এবং তার উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এই নির্ভরশীলতার প্রচেষ্টা যখন বাধাগ্রস্ত হয়, তখনই একাকীত্বের অনুভূতি প্রকট হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতি বিশেষত বিবাহ বহির্ভূত প্রেমের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। কারণ, এই সম্পর্কগুলো সামাজিক কাঠামো বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার আওতায় থাকে না। এ কারণে, তরুণ-তরুণীদের প্রেমমুখী সম্পর্কগুলোতে প্রায়শই মানসিক দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা দেখা যায়। তারা নিজেদের সম্পর্ক ও চাহিদার মধ্যে এক ধরনের সংঘাত অনুভব করে।

অন্যদিকে, বিবাহিত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই মানসিক দ্বন্দ্ব তুলনামূলকভাবে কম। বিয়ের পরে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের জন্য আলাদা জগত তৈরি করে নেয় এবং একে অপরের মানসিক প্রক্রিয়ার সীমা সম্পর্কে সচেতন হয়। একাকীত্ব থাকলেও, তারা জানে এটি তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং এটি মোকাবিলার দায়ভার তাদের নিজেদের উপর। এ ধরনের বোঝাপড়া তাদের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়

অতএব, ভালোবাসা এবং একাকীত্ব একে অপরের পরিপূরক। তবে এটি মোকাবিলা করার দক্ষতা ও সচেতনতার ওপর নির্ভর করে এই অভিজ্ঞতা কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হবে।

জাতীয় রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন কেন নেতিবাচক ভাবে দেখতে হবে!

  



রাজনীতি এমন এক নেভার-এন্ডিং প্রক্রিয়া, যার কখনো পূর্ণ সমাধান হয় না। এটি দ্বন্দ্বের ভিত্তিতেই চলমান থাকে। এ কারণেই প্রতিটি দেশে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ ও মতানৈক্য দেখা যায়, যা কখনোই পুরোপুরি সমাধান যোগ্য করা যায় না। নিজেরাও সমাধান  করতে চাই না। 

গ্রাম হলো এমন একটি স্থান, যেখানে দ্বন্দ্বের নিরসন একান্ত প্রয়োজন। কারণ, গ্রাম তার নিজস্ব সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। এখানে যে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব, তা যতই ছোট হোক না কেন, পুরো গ্রামের সামগ্রিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এমন দ্বন্দ্ব দীর্ঘ সময় ধরে গ্রামীণ জীবন ও উন্নয়নকে ব্যাহত করে।

এই প্রেক্ষাপটে, গ্রামে রাজনীতির সামাজিকায়ন বন্ধ করা জরুরি। একটি গ্রাম সম্পূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক ও সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। সেখানে রাজনীতির অনুপ্রবেশ মানে সেই সামাজিক কাঠামোতে বিরোধ ও বিভাজন তৈরি করা। রাজনীতি মূলত বিরোধ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র—এখানে বিভিন্ন পক্ষ থাকে, যাদের মধ্যে ক্ষমতা অর্জনের লড়াই চলে। এই পক্ষগুলোর আপসও সাধারণ মানুষের জন্য প্রায়ই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

তাই গ্রামকে তার প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশে অক্ষুণ্ণ রাখা উচিত। রাজনীতির বিষাক্ত প্রভাব থেকে মুক্ত রেখে, গ্রামকে তার স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে বিকশিত হতে দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক স্বার্থপরায়ণতার কারণে গ্রামীণ পরিবেশকে কলুষিত করা একেবারেই অনুচিত।

রাজনীতি, সমাজ এবং গ্রাম: একটি সঠিক সীমারেখা



 রাজনীতি মূলত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরেই মানায়। প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চর্চার পরিসর কতটুকু? রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক চর্চার পরিসর রাষ্ট্রের রাজধানী পর্যন্তই, এর বাইরে বিভাগীয় শহর অথবা জেলা শহর পর্যন্ত। সুতরাং রাজনৈতিক দলসমূহের কার্যক্রম এবং রাজনীতির চর্চা রাষ্ট্রের রাজধানী শহর কিবা সর্বোচ্চ জেলা-উপজেলা শহর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। রাজনীতিকে গ্রাম পর্যায়ে টেনে নিয়ে আসা একটি গ্রামের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, রাজনৈতিক দলসমূহের উচিত তাদের কমিটি গ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারিত না করা বাংলাদেশের জন্যই উপকারী ।

রাজনৈতিক দল অনেকটা ভাইরাসের মতো সমাজে ঘৃণা, হিংসা, এবং সহিংসতার বিষবাষ্প ছড়ায়। এরা কখনোই সামাজিকীকরণের জন্য আদর্শ উদাহরণ হতে পারে না এবং সমাজের সংহতি বা সম্প্রীতি বজায় রাখতে কোনো সহায়তাও করে না। বাংলাদেশের সামাজিক পরিসরে ঘৃণা, সহিংসতা, এবং দ্বন্দ্বের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলসমূহের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়।

প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা এবং আদর্শিক মানদণ্ড রয়েছে, যা প্রায়ই অন্য দলগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ কখনোই শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। গত ৫৩ বছরের ইতিহাসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নজির প্রায় অনুপস্থিত। রাজনৈতিক দলসমূহের সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে দেখা যায় না।

তাই রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতি অনুরোধ, তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কমিটি যেন জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। গ্রাম পর্যায়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে গ্রামের মানুষের শান্তি নষ্ট করবেন না। গ্রামের মানুষকে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে শান্তিতে থাকতে দিন।

ইস্কুল বা বিদ্যালয় ধারনা কী?

 



ইস্কুল বা বিদ্যাগৃহ হলো একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যা সমাজের মোরাল গ্রাউন্ড প্রতিষ্ঠা করবে। একে আমরা সোশ্যালাইজেশন ইনস্টিটিউট বা সোস্যাল মোরাল ফ্যাক্টরি বলেও অভিহিত করতে পারি। 

এই মোরাল গ্রাউন্ডে জীবনের সমস্ত পজিটিভ আচরণের সমষ্টি অন্তর্ভুক্ত হবে, যেমন—শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসা, সিমপ্যাথি, এম্পাথি, পরিচ্ছন্নতা, সহানুভূতি, সহযোগিতা, সততা, ক্ষমাশীলতা, সময়নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য এবং নম্রতা।

অন্যদিকে, এই মোরাল গ্রাউন্ডে আরও ডিফাইন করা হবে নেগেটিভ বা ইমমোরাল আচরণও। সুতরাং, নেগেটিভ আচরণ বা ইমমোরালিটি কি হতে পারে? উদাহরণস্বরূপ—অহংকার, ভ্রষ্টাচার, জিদ, অলসতা, নির্লিপ্ততা, অমার্জিত আচরণ, দুঃসাহসিকতা, অশোভন, অন্যকে অবহেলা করা, দলবাজি, মিথ্যাচার, দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা, নিষ্ঠুরতা, অসহিষ্ণুতা, এবং অন্যদের উপহাস করা।

এখন, প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কীভাবে এই পজিটিভ ও নেগেটিভ মোরালিটি ডিফাইন করবো? 

এই নৈতিক আদর্শ (পজেটিভ ও নেগেটিভ মোরালিটি) সংজ্ঞা বা ডিফাইন হবে, সেই স্কুল বা সমাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে সমাজ যদি ধর্মকে গুরুত্ব দিতে চাই তবে মোরালিটি অবশ্যই ধর্ম থেকে আসবে এবং না আসলেও সমস্যা নাই। 


আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ডিফাইনকৃত মোরালিটি গুলোর বাস্তবায়ন হবে স্কুলে পড়া প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীকে সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নৈতিকতা প্র্যাকটিস করিয়ে। এবং, এই প্র্যাকটিস এমনভাবে করা হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী তার সারা জীবন এই নৈতিকতা নিয়ে সত্য ও সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনা করতে পারে।


ইস্কুল বা বিদ্যাঘরের ধারণা হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে আমার মূল্যবোধ ও ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া, এবং একই সাথে তাকে পৃথিবী ও সমাজের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। অর্থাৎ, তাকে তার পরিবেশ বা সমাজ-পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিকভাবে গড়ে তোলা। এটি আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কান্ডারী হিসেবে প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া, যারা তাদের পৃথিবী ও সমাজ সম্পর্কে মজবুত জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করবে।


এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে? উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিশুরা যাতে মৌলিক জ্ঞান ও ভালো মানসিকতা অর্জন করে, যেমন—সহানুভূতি, দায়িত্বশীলতা। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের চিন্তা-ভাবনা এবং একাডেমিক দক্ষতা বাড়ানো, যাতে তারা ভবিষ্যতে সমাজে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।


এই ধরনের জ্ঞান হবে মানবিক এবং সমাজ সংশ্লিষ্ট জ্ঞান, যা আসবে মূলত প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলো থেকে। এই জ্ঞানগুলো হবে এমন তথ্য যা বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য এবং সময়ের সাথে অপরিবর্তনশীল।

এছাড়া, এই জ্ঞান হবে ইউনিভার্সেল এবং সর্বজনীন, যা মানবাধিকার, সমাজ ও সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং মনস্তত্ত্ব সম্পর্কিত ধারণা প্রদান করবে। এই জ্ঞানগুলো ছাত্র-ছাত্রীদের বিশ্বজনীন সত্যতা, যুক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে তোলে, যাতে তারা সমাজে সক্রিয়, দায়িত্বশীল, এবং প্রগতিশীল সদস্য হিসেবে পরিণত হয়।

এর জন্যে প্রয়োজন প্রাইমারি ও হাই স্কুল লেভেলের শিক্ষায় ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের তুলনায় ভাষা ও মানবিকতা অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া। ভাষার মাধ্যমে মানুষ যেকোনো জ্ঞান বা ধারণাকে নিজের ভিতরে গ্রহণ এবং তার অস্তিত্ব প্রকাশ করতে পারে। প্রাইমারি ও হাই স্কুল স্তরে ভাষা ও মানবিকতার গুরুত্ব এতটাই ব্যাপক যে, এই দুইটির অবহেলা আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থী এবং আগামী প্রজন্মের সোশ্যালাইজেশনের ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা ও ডিসফাংশন সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের ডিসফাংশন থেকে এমন একটি প্রজন্মের উদ্ভব হতে পারে, যারা চিন্তা ও চেতনায় সংকুচিত এবং সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে অগ্রসর হতে বাধাগ্রস্ত হবে।

পুরাতন পলিটিক্যাল পার্টি ও তাদের অপরিবর্তিত রাজনীতি









১.

এনথ্রোপলজিতে একটি ধারণা আছে, যেখানে সমাজের পরিবর্তনকে প্যারাবলিক কার্ভ পরিবর্তন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হয়। এতে বোঝানো হয় যে, সমাজ বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে নতুন এক অবস্থায় পৌঁছায়, কিন্তু সেই অবস্থাটি মূলত পূর্বের অবস্থার প্রতিফলন হয়, যদিও তার কিছু ভিন্ন রূপ দেখা যায়। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় উন্নয়ন বা পরিবর্তন ঘটলেও, চূড়ান্ত পর্যায়ে সেই পরিবর্তন স্থায়ী প্রভাব ফেলে না এবং সমাজ প্রায় আগের মতোই স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে।


আমার মনে হয়, বাংলাদেশের বর্তমান সময়ে জন-আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনের আশা এভাবেই আশাভঙ্গ হতে পারে। ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পরিবর্তনের যে ধারা, এবং ২০২৪ পরবর্তী পরিবর্তনও হয়তো অনেকটা এই প্যারাবলিক প্রক্রিয়ার মতোই হবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের হয়তো কিছু পরিবর্তন হবে, তবে তা ব্যক্তি ও দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। দেশের নীতি, বুরোক্রেসি, আইন এবং শাসন ব্যবস্থায় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। দেশ, সমাজ এবং ব্যক্তি ও সামষ্টিক চিন্তা-চেতনা ও মনোভাব অপরিবর্তিত থাকবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ আসলে পুরনো বাংলাদেশেই পড়ে থাকবে। পুরনো বাংলাদেশেই আটকে থাকার পুরো দায় যাবে পলিটিক্যাল পার্টি সমূহের। এবং মজার বিষয় হচ্ছে এতে তাদের কোনরূপ হা-হুতাশ  দুঃচিন্তা নেই। 


২.

বর্তমান রাজনীতিতে ও আওয়ামী পরবর্তী দেশের পরিস্থিতে, ছাত্র জনতা কিংবা রাজনীতি সচেতন বুদ্ধিজীবীরা অভিযোগ করছেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রকৃতপক্ষে দেশের সংস্কারের পথে এগোচ্ছে না বা সংস্কারে তেমন আগ্রহী না । এক্ষেত্রে বিএনপি, জামাতসহ অন্যান্য পলিটিক্যাল পার্টিগুলো যেন নিজেদের আখের গোছাতে এবং ভোটের রাজনীতিতে মনোযোগী হয়েছে। আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক এবং রাজনৈতিক দল গুলোর জন্য এইটা অনুচিত হলেও এটাই তাদের কাজ, তবে ওয়াইডার পার্সপ্কেটিভে অনুচিত জেনেও তারা এই ধারা চালু রাখবে । দেখুন, দেশে যারা রাজনীতি সচেতন, তারা উন্নয়ন ও পলিসি মেকিংয়ে টপ-টু-বটম চেঞ্জ চাই; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কখনও তা চায় না, এবং চাইলেও সেটি টপ-টু-বটম বা হলিস্টিক পদ্ধতিতে নয়। 


এর অন্যতম কারণ, বর্তমানে বিদ্যমান প্রতিটি রাজনৈতিক দলই পুরনো ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনার উপর ভিত্তি করে তাদের দলের কার্যক্রম পরিচালনা করে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া কিবা কর্মী বাহিনীকে আরো পলিটিসাইজ  করার যে  প্রক্রিয়া,  এখনো সেই গতানুগতিক ধারার  অর্থাৎ এর কোন রূপ পরিবর্তন আসেনি। সুতরাং দেশের নতুন পলিসি প্ল্যানিং এ পরিবর্তন  মানেই তাদের রাজনৈতিক দলের ভিতরও সংস্কার করা, যা তারা একেবারেই চায় না। সংবিধান পরিবর্তন করতে গেলেই রাজনৈতিক দলগুলোর সূক্ষ্ম বিরোধিতা দেখা যায়, এবং দেশের অন্যান্য সংস্কারেও এদের বিরোধিতা আপনি দেখতে পাবেন। আবার প্রতিটি পলিটিক্যাল পার্টি তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ে পুরোপুরি অশিক্ষিত, কম সচেতন এবং দূরদর্শীহীন নেতাকর্মী দিয়ে পূর্ণ। আবার  বাংলাদেশের প্রত্যেকটি পলিটিক্যাল পার্টির মিছিল মিটিং কিংবা মহাসমাবেশ মূলত হয় পেইড কর্মী-সমর্থকদের মাধ্যমে।আর এইসব পেইড কর্মী সমর্থকেরা যে দলই ডাকুক না কেন প্রত্যেকটা দলের কর্মসূচিতে তাদের অবস্থান জানান দেই অর্থের জন্য।  এদের মূল কাজই হচ্ছে শক্তি নির্ভরতা ও শক্তি প্রদর্শন। উপরন্তু, পলিটিক্যাল পার্টির টপ লেভেল নেতারা কিংবা পলিসি মেকাররা সাম হাউ পরিবর্তন চান না; এবং তাদের মানসিকতাও অর্ডিনারি নেতাকর্মীদের মতোই ওল্ড, রিজিড ও কূপমন্ডুক হয়ে যায়। এ কারণেই আপনি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলসমূহের সংস্কার পরিপন্থী বিভিন্ন মন্তব্য ও অবস্থান দেখতে পাবেন। 


৩.

আমি মনে করি, যারা রাজনীতি সচেতন বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-জনতা এবং ছাত্র সমাজ আছেন, তারা একটি ভুল ধারণায় আছেন । তারা মনে করেছেন নতুন বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে পলিটিক্যাল পার্টি গুলা বাংলাদেশের সংস্কারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসবে।  বাংলাদেশ গত পনের বছর রিজিড শাসনের মধ্য দিয়ে গেছে এবং জনগণ এই অপশাসন ও কুশাসনের পরিবর্তন চাইছিল। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই অপশাসন ও রিজিড ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং এখন  মানুষ দেশে সংস্কার চায়। তবে, দেশের প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ উন্নয়ন ও সংস্কার চায় বটে, কিন্তু এইসব সংস্কার মূলক পলিসির প্রতি তাদের কোনো সচেতনতা নেই। কারণ, বাংলাদেশের যেকোনো পলিসি মেকিং হয় সাধারণ জনগণের সাথে সংযোগ ছাড়াই। এখন তারা মূলত ভোটার, তারা দেশের সংস্কার চায় বটে, কিন্তু সংস্কারের জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো ভয়েস উঠতে দেখা যায় না। তাদের কাছে কোনো সংস্কার চাওয়া হলে তারা মন্তব্য করতে আগ্রহী নন। এটি ৯০% বাংলাদেশী জনগণের অবস্থা।


অতএব, রাজনৈতিক দলসমূহ অসচেতন ও ইনএকটিভ জনগণের ফায়দা তুলে পুরনো রাজনীতিতেই ব্যস্ত থাকতে চায়। আমাদের কাছে যতই মনে হোক না কেন, রাজনৈতিক দলগুলো জনস্বার্থ বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, দিনশেষে আপনাকে বুঝতে হবে, এই অবস্থান তাদের জন্য পজিটিভ, যদিও দেশের জন্য তা নেগেটিভ হতে পারে। কারণ সুশীল ও নতুন রাজনীতি করবে এমন কোনো পলিটিক্যাল পার্টি এখন গণপর্যায়ে বিদ্যমান নেই। ফলে জনগণ বাধ্য হয়েই এই পুরনো রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং ক্ষমতায় আনতে বাধ্য। রাজনৈতিক দলগুলোও এটি জানে, এবং জনগণের অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় তাদেরই নির্বাচিত করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে পলিটিক্যাল পার্টি গুলো এবং তাদের নেতাকর্মীরা ভিন্নমতের বিরোধিতা সত্ত্বেও যা খুশি বলে যাচ্ছে। এটা আমাদের কাছে মনে হতে পারে যে তারা গণবিরোধী, সংস্কারবিরোধী কথা বলছে, কারণ তারা জানে জনগণ এই সংস্কার ও পলিসি মেকিং নিয়ে তেমন সচেতন নয়, এবং এই সুযোগটাই তারা নিচ্ছে।

বাংলার আনস্মার্ট রাজনীতি

বাংলাদেশের মতো দেশে ভোটের রাজনীতি হচ্ছে আনস্মার্ট এবং ক্ষ্যাত। সুতরাং ক্ষমতায় যাওয়ার যে রাজনীতি এইটাতে আনস্মার্ট, ক্ষ্যাত ও বোকা সোকা হলেও সমস্যা নাই। 

স্মার্ট রাজনীতির জন্যই বামদল গুলা, এবি পার্টি, পার্থের বিজিপি, জোনায়েদ সাকির দল, এবং আরো যত স্মার্ট রাজনৈতিক দল আছে এরা কখনোই ক্ষমতা আসবে না বাংলাদেশে।

একারণেই নূর-রাশেদদের বাংলাদেশ রাজনীতিতে সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। 

সুতরাং যারা ক্ষমতায় যাইতে চাই তাদের জন্য স্মার্ট রাজনীতি হচ্ছে একটা ট্র্যাপ।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা !









[১]

ইদানীং দেখা যায়, মানুষ প্রচুর কুকুর, বিড়াল ও বিভিন্ন ধরনের প্রাণীকে পোষ মানাতে ব্যস্ত। এটি গত ১০-১২ বছর আগেও খুব একটা দেখা যেত না, কিন্তু এখন এটি বেশ প্রচলিত। মানুষ পাখি, একোয়ারিয়ামের মাছ, বিড়াল কিংবা কুকুর এমনকি অনেকেই অদ্ভুত ধরনের প্রাণীও পোষে। পশ্চিমা বিশ্বে এটি আগে বেশি দেখা যেত, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই প্রাণী পোষার প্রবণতা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও ব্যাপক আকারে বেড়েছে। প্রাণী পোষা যে খারাপ কিছু তা নয়, যেমন বিড়াল চিরায়তভাবেই মানুষের পরিবেশে ছিল, এমনকি বিছানাতেও প্রবেশাধিকার ছিল। আর কুকুর সাধারণত মানুষ নিরাপত্তার জন্য পোষে, যদিও বাসার অভ্যন্তরে তার প্রবেশাধিকার ছিল না।

কুকুর-বিড়াল মানুষের সমাজে বাস করলেও এতদিন পর্যন্ত মানুষের নিকটজন বা আত্মার কেউ হয়ে উঠতে পারেনি। তবে বর্তমানে দেখা যায়, মানুষের মানসিকতায় এইসব প্রাণী অনেক বেশি অন্তরঙ্গ ও আবেগময় সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকেই এই প্রাণীদের তাদের পরিবারের সদস্য হিসেবেও মনে করে এবং এদের প্রতি পারসোনিফিকেশন ঘটে। মানুষ নিজেদের সাইকোলজিতে এই প্রাণীদের একটি আলাদা সত্তা হিসেবে গড়ে তোলে এবং তাদের আত্মার আপনজন বা পরিবারের সদস্যের মতোই গ্রহণ করে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে পোষ মানানো প্রাণীদের প্রতি মানুষের মানসিক একাত্মতা ও আন্তরিকতা কেন এতো বাড়লো? এর কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।


[২]

মানুষ স্বভাবতই ভাবপ্রবণ ও ভালোবাসাপ্রিয়, এবং প্রিয় মানুষের সাথে সময় কাটাতে তার আগ্রহ প্রবল। কিন্তু বর্তমানের শহরকেন্দ্রিক ব্যস্ত জীবন এবং বৈচিত্র্যময় চিন্তাভাবনা মানুষকে একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে, প্রিয়জন থাকা সত্ত্বেও প্রিয়জনের অভাব অনুভূত হয়। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রায়ই দেখা যায়, একই বাড়িতে বসবাস করলেও সদস্যদের মধ্যে মানসিক ও চিন্তার দূরত্ব তৈরি হয়। বিশেষত, প্রজন্মগত ফাঁক (জেনারেশন গ্যাপ) এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে, যা পারিবারিক আন্তরিকতা ও বোঝাপড়ায় ফাটল সৃষ্টি করে। এর ফলে, অনেকেই বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বে ভুগছে।

এই ধরনের মানসিক চাপে ভোগা মানুষ অনেক ক্ষেত্রে মনুষ্য সঙ্গের বিকল্প হিসেবে প্রাণীদের কাছে আশ্রয় খোঁজে। তাদের প্রতি একটি আলাদা মমতা ও নির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে প্রিয়জনের অভাব পূরণের জন্য। বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত যে, পোষা প্রাণীর সাথে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। পোষা প্রাণীর প্রতি গভীর মানসিক সংযোগের মাধ্যমে মানুষের আত্মপ্রসারণ (self-expansion) ঘটে এবং এটি তাকে মানসিকভাবে পরিপূর্ণতার অনুভূতি দেয়। আর এই অনুভূতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে কুকুর ও বিড়াল, তাই এই প্রাণীগুলোর প্রতি মানুষের আলাদা আগ্রহ।


[৩]

কুকুর-বিড়াল বা অন্যান্য প্রাণীকে পোষ মানানোর ক্ষেত্রে শুধু শহরের মানুষই এগিয়ে নেই, বরং গ্রামেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে শহরের মানুষের ক্ষেত্রে এই পোষা প্রাণীর প্রতি আগ্রহ মূলত একাকীত্বের অবসান ও আবেগপূর্ণ সঙ্গ প্রাপ্তির জন্য হলেও, গ্রামাঞ্চলে এটি আধুনিক ট্রেন্ড ফলো করা বা সামাজিকভাবে রিলেভ্যান্ট থাকার জন্য। অনেক তরুণ-তরুণীর মধ্যে বিড়াল-কুকুর পোষার প্রবণতা যেন একপ্রকার ফ্যাশনের মতো। এখন গ্রামের হাট-বাজারেও পাখির দোকান, অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ বিক্রির দোকান, বিড়াল-কুকুরের খাবারের দোকান দেখা যায়, যেটি পাঁচ বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল।

আগে গ্রামের মানুষ শখের বসে কবুতর পালতো, যা এখন কিছুটা কমেছে এবং তার জায়গায় কুকুর-বিড়াল বা মাছের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। তাই, শহরের মানুষ যেখানে একাকীত্বের অবসানের প্রয়োজনে পোষা প্রাণীর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, সেখানে গ্রামের মানুষ অনেকটাই ফ্যাশন সচেতনতা ও আধুনিকতার ধারণা থেকে এই প্রবণতা অনুসরণ করছে বলে মনে হয়।

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...