১.
আমি মানুষের মৃত্যুর ভয় নাই বা এখন আর দেখা যায় না এই নিয়ে নিয়ে একটা লিখা লিখেছিলাম কিছু দিন আগে, বলেছিলাম আগেও মানুষ যেখানে মৃত্যুকে নিয়ে প্রচুর অস্বস্তিতে থাকত এবং আশঙ্কাজনক ও ভয়ের সাথে মৃত্যুকে স্মরণ করত। এখন মানুষের মধ্যে মৃত্যুর প্রতি একধরনের অস্পষ্ট শূন্যতা কাজ করে, তবে আগের মতো গভীর শঙ্কা বা আতঙ্ক তারা আর অনুভব করে না। যেন মৃত্যুকে এড়িয়ে যেতে চায়, অথবা এমনভাবে গ্রহণ করে, যেন এটি কেবল জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি—একটি অনিবার্য অথচ অবহেলিত সত্য। মৃত্যু মানুষের কাছে হচ্ছে, হয়তো সবাই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাচ্ছে কিবা দুইদিন পরেই আবার ফেরত আসবে। মৃত্যু যেন স্বজনের বিদেশ গমন এর মত। কোন না কোন সময় হয়তো ফেরত আসবে, মৃত্যুকে আমরা এমন ভাবেই দেখছি। তাইতো মৃত্যু স্বাভাবিক, মৃত্যুর পর আবারো ফিরে আসা যায়, মৃত্যু আমার হবে না অন্য কারো হবে, আমি মরবো না এই ধারনা আমাদের মনে চলে আসছে। এই যে মৃত্যু নিয়ে মানুষের উদাসীনতা, অবহেলা ও অবচেতন মনে মৃত্যুকে সচেতন ভাবেও চিন্তা না করা, এটা কেন হল?
আমার এই লেখার মূল প্রশ্ন হচ্ছে আমরা মৃত্যুকে কেন এভাবে ভাবতে শিখলাম? আমরা মৃত্যুর ভাবনায় কেন স্বাভাবিকতা নিয়ে আসলাম? মৃত্যুকে আমরা কেন ভয় পাই না?
মৃত্যু কি এতই সোজা? মৃত্যু কি এতই সস্তা? মৃত্যু কি দুই দিনেরই প্রস্থান?
প্রশ্ন স্পষ্ট হলেও, এর কোন চূড়ান্ত উত্তর আমরা খুঁজে পাই না।
২.
মানুষের মৃত্যুর প্রতি উদাসীনতা এবং এ বিষয়ে ভীতি হারানোর পেছনে কয়েকটি কারণ বিদ্যমান, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত আধুনিক যুদ্ধ ও প্রযুক্তির উন্নতি এবং ব্যাপক তথ্য প্রবাহ। অষ্টাদশ শতাব্দীর আগে যুদ্ধের প্রভাব ছিল সীমাবদ্ধ, এবং মৃত্যুর অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের কাছে বিরল ছিল। সৈন্যদের সম্মুখ যুদ্ধ, যেখানে তীর-ধনুক বা বল্লম ব্যবহার হতো, সমাজের বাইরের অংশকে সরাসরি প্রভাবিত করত না। মৃত্যুর খবর ধীরে ছড়াত, ফলে মৃত্যু ছিল এক গভীর, দুর্লভ এবং বেদনাদায়ক ঘটনা। জীবনের প্রতি মানুষের মূল্যবোধ ছিল গভীর, কারণ মৃত্যু তখন এতটা পরিচিত বা সহজ হয়ে ওঠেনি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর পর, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মানুষ যেমন নিজের জীবনকে সহজ করতে বিভিন্ন যন্ত্র ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন করেছে, তেমন যুদ্ধে ব্যবহৃত মারাত্মক মারণাস্ত্র তৈরি করেছে। এর ফলে যুদ্ধগুলো আরও বিধ্বংসী এবং মানুষের মৃত্যু আরও ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। যেমন, ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আফগানিস্তানে, ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় লাখ লাখ আফগান নাগরিক মারা গেছে, যা দেখায় যে যুদ্ধ কিভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
আধুনিক যুদ্ধে বন্দুক, রাইফেল, কামান, ট্যাংক, মিসাইল, এবং পারমাণবিক বোমার মতো ভয়ংকর অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, যা এক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ১০ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃত্যু ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে পৌঁছেছিল, যা পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় ৩%। এই মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের সামনে মৃত্যুর গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যুদ্ধ এখন আর সীমিত নেই, বরং এর বিধ্বংসী প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, মৃত্যু যেন হয়ে উঠেছে এক নিষ্ঠুর স্বাভাবিকতা। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া এই গণহত্যার খবরগুলি প্রতিদিন আমাদের কানে পৌঁছায়, এবং এভাবে মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আস্তে আস্তে এই অমানবিকতার প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছি, যেন মৃত্যুর এই ভয়াবহতা আমাদের জন্য আর নতুন কিছু নয়।
ফলে যুদ্ধের খবরে মৃত্যুর খবরও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত শুনছে, এবং মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে এসব মৃত্যু আমাদের কাছে প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের মতো মৃত্যু আর অস্বাভাবিক বলে মনে হয় না, কারণ প্রতিদিনই আমরা নতুন নতুন মৃত্যুর খবর পাচ্ছি।
৩.
গত দেড় শতাব্দী ধরে পৃথিবী অনেকগুলো যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, সিরিয়া যুদ্ধ এবং ইয়েমেন গৃহযুদ্ধ এবং
ফিলিস্তিন যুদ্ধ। এই যুদ্ধগুলোতে মিলিয়ে প্রাণ হারিয়েছে কোটি কোটি মানুষ। বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পরবর্তী শতাব্দীতে সংঘাতের ধারাবাহিকতায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আধুনিক যুদ্ধে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক ও বিধ্বংসী অস্ত্র, যেমন রাইফেল, ট্যাংক এবং পারমাণবিক বোমা, যুদ্ধের সময় নিহতের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া যুদ্ধের খবর এবং মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে, ফলে এই মৃত্যুর খবর আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, মৃত্যু আমাদের মনে আর কোনো ভয় সৃষ্টি করে না।
যদিও আমরা যুদ্ধের খবর দেখার সময় শিহরণ অনুভব করি, কিন্তু এর ভয়াবহতা ও মানবিকতা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে গেছি। ফলস্বরূপ, ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রিয়জনের মৃত্যুও আমাদের কাছে আর অস্বাভাবিক বা উদ্বেগজনক মনে হয় না, বরং এটি একটি পরিচিত বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাওয়ার একটি চরম উদাহরণ, যেখানে মৃত্যুকে আমরা যেন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিয়েছি।
৪.
আমরা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে মৃত্যুর খবর এমনভাবে পাচ্ছি যেখানে প্রতিনিয়ত শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিটি মৃত্যুর খবর আমাদের কানে এসে পৌঁছাচ্ছে, এবং এর ফলে আমাদের মানবিকতা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। যুদ্ধের এই অমানবিকতার তথ্যগুলো আমাদের কাছে যেন এক প্রকার অগ্রাহ্য করার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এই অমানবিক তথ্যগুলা সচেতনভাবে এসব ঘটনা ভুলে থাকতে চাই, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই প্রচেষ্টাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
মৃত্যুর খবরগুলো আমাদের মধ্যে এমন এক ধরনের বিকৃতি তৈরি করছে যে, আমি আর কোনো মৃত্যুকে শোকের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে চাই না। বরং, আমি এই অমানবিক তথ্য যে আমাকে বিতৃষ্ণ করে তুলছে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির চেষ্টা করছি, যেন মৃত্যু আর আমাকে দুঃখিত না করে। এর ফলে, মৃত্যুর খবরগুলো আমার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এবং আমি নিজের বিতৃষ্ণ অভিজ্ঞতা ও দুঃখকে গুরুত্ব দিতে আগ্রহী নই।
এই প্রেক্ষাপটে, ব্যক্তিগত জীবনে এবং সমাজে আমাদের প্রিয়জনদের, এমনকি কাছের মানুষদের মৃত্যুও স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। মৃত্যুর এই মিছিল আমরা প্রতিনিয়ত দেখি, ঠিক যেমন যুদ্ধের মৃতদেহের অবস্থা আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। ফলে, প্রতিটি মৃত্যিই যেন এক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠছে, যার মধ্যে আর শোকের অনুভূতি নেই। আমরা শোক করতে ভুলে গেছি এবং মৃত্যুকে গুরুত্ব দিতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। মৃত্যুকে এখন সস্তা দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হচ্ছে। এই নিঃসংকচতা, উদাসীনতা এবং অবহেলা একসাথে আমাদের মনে মৃত্যুকে একটি সাধারণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেন এটি আমাদের জীবনের অংশ।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রিয়জনের মৃত্যুও আমাদের কাছে আর অস্বাভাবিক বা উদ্বেগজনক মনে হয় না, বরং এটি একটি পরিচিত বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাওয়ার একটি চরম উদাহরণ, যেখানে মৃত্যুকে আমরা যেন একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিয়েছি।
এই ধারাবাহিক মৃত্যুর খবর ও তথ্যের প্রাচুর্য আমাদের মনকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, আমরা নিজের আশেপাশের মানুষের মৃত্যু বা এমনকি প্রিয়জনের মৃত্যুতেও আগের মতো শোকগ্রস্ত হই না। মৃত্যুকে আমরা যেন একধরনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নিয়েছি, যা আমাদের অনুভূতিকে ক্রমশই নিঃসঙ্গ ও অসাড় করে তুলছে। এই উদাসীনতা আমাদের মানবিক সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাওয়ার একটি চরম উদাহরণ। এর ফলেই আমাদের মনে মৃত্যুর ভয় আর কাজ করে না।
No comments:
Post a Comment