পুরাতন পলিটিক্যাল পার্টি ও তাদের অপরিবর্তিত রাজনীতি









১.

এনথ্রোপলজিতে একটি ধারণা আছে, যেখানে সমাজের পরিবর্তনকে প্যারাবলিক কার্ভ পরিবর্তন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখানো হয়। এতে বোঝানো হয় যে, সমাজ বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে নতুন এক অবস্থায় পৌঁছায়, কিন্তু সেই অবস্থাটি মূলত পূর্বের অবস্থার প্রতিফলন হয়, যদিও তার কিছু ভিন্ন রূপ দেখা যায়। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় উন্নয়ন বা পরিবর্তন ঘটলেও, চূড়ান্ত পর্যায়ে সেই পরিবর্তন স্থায়ী প্রভাব ফেলে না এবং সমাজ প্রায় আগের মতোই স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে।


আমার মনে হয়, বাংলাদেশের বর্তমান সময়ে জন-আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তনের আশা এভাবেই আশাভঙ্গ হতে পারে। ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পরিবর্তনের যে ধারা, এবং ২০২৪ পরবর্তী পরিবর্তনও হয়তো অনেকটা এই প্যারাবলিক প্রক্রিয়ার মতোই হবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের হয়তো কিছু পরিবর্তন হবে, তবে তা ব্যক্তি ও দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। দেশের নীতি, বুরোক্রেসি, আইন এবং শাসন ব্যবস্থায় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। দেশ, সমাজ এবং ব্যক্তি ও সামষ্টিক চিন্তা-চেতনা ও মনোভাব অপরিবর্তিত থাকবে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ আসলে পুরনো বাংলাদেশেই পড়ে থাকবে। পুরনো বাংলাদেশেই আটকে থাকার পুরো দায় যাবে পলিটিক্যাল পার্টি সমূহের। এবং মজার বিষয় হচ্ছে এতে তাদের কোনরূপ হা-হুতাশ  দুঃচিন্তা নেই। 


২.

বর্তমান রাজনীতিতে ও আওয়ামী পরবর্তী দেশের পরিস্থিতে, ছাত্র জনতা কিংবা রাজনীতি সচেতন বুদ্ধিজীবীরা অভিযোগ করছেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রকৃতপক্ষে দেশের সংস্কারের পথে এগোচ্ছে না বা সংস্কারে তেমন আগ্রহী না । এক্ষেত্রে বিএনপি, জামাতসহ অন্যান্য পলিটিক্যাল পার্টিগুলো যেন নিজেদের আখের গোছাতে এবং ভোটের রাজনীতিতে মনোযোগী হয়েছে। আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক এবং রাজনৈতিক দল গুলোর জন্য এইটা অনুচিত হলেও এটাই তাদের কাজ, তবে ওয়াইডার পার্সপ্কেটিভে অনুচিত জেনেও তারা এই ধারা চালু রাখবে । দেখুন, দেশে যারা রাজনীতি সচেতন, তারা উন্নয়ন ও পলিসি মেকিংয়ে টপ-টু-বটম চেঞ্জ চাই; কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো কখনও তা চায় না, এবং চাইলেও সেটি টপ-টু-বটম বা হলিস্টিক পদ্ধতিতে নয়। 


এর অন্যতম কারণ, বর্তমানে বিদ্যমান প্রতিটি রাজনৈতিক দলই পুরনো ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনার উপর ভিত্তি করে তাদের দলের কার্যক্রম পরিচালনা করে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া কিবা কর্মী বাহিনীকে আরো পলিটিসাইজ  করার যে  প্রক্রিয়া,  এখনো সেই গতানুগতিক ধারার  অর্থাৎ এর কোন রূপ পরিবর্তন আসেনি। সুতরাং দেশের নতুন পলিসি প্ল্যানিং এ পরিবর্তন  মানেই তাদের রাজনৈতিক দলের ভিতরও সংস্কার করা, যা তারা একেবারেই চায় না। সংবিধান পরিবর্তন করতে গেলেই রাজনৈতিক দলগুলোর সূক্ষ্ম বিরোধিতা দেখা যায়, এবং দেশের অন্যান্য সংস্কারেও এদের বিরোধিতা আপনি দেখতে পাবেন। আবার প্রতিটি পলিটিক্যাল পার্টি তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ে পুরোপুরি অশিক্ষিত, কম সচেতন এবং দূরদর্শীহীন নেতাকর্মী দিয়ে পূর্ণ। আবার  বাংলাদেশের প্রত্যেকটি পলিটিক্যাল পার্টির মিছিল মিটিং কিংবা মহাসমাবেশ মূলত হয় পেইড কর্মী-সমর্থকদের মাধ্যমে।আর এইসব পেইড কর্মী সমর্থকেরা যে দলই ডাকুক না কেন প্রত্যেকটা দলের কর্মসূচিতে তাদের অবস্থান জানান দেই অর্থের জন্য।  এদের মূল কাজই হচ্ছে শক্তি নির্ভরতা ও শক্তি প্রদর্শন। উপরন্তু, পলিটিক্যাল পার্টির টপ লেভেল নেতারা কিংবা পলিসি মেকাররা সাম হাউ পরিবর্তন চান না; এবং তাদের মানসিকতাও অর্ডিনারি নেতাকর্মীদের মতোই ওল্ড, রিজিড ও কূপমন্ডুক হয়ে যায়। এ কারণেই আপনি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলসমূহের সংস্কার পরিপন্থী বিভিন্ন মন্তব্য ও অবস্থান দেখতে পাবেন। 


৩.

আমি মনে করি, যারা রাজনীতি সচেতন বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-জনতা এবং ছাত্র সমাজ আছেন, তারা একটি ভুল ধারণায় আছেন । তারা মনে করেছেন নতুন বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে পলিটিক্যাল পার্টি গুলা বাংলাদেশের সংস্কারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসবে।  বাংলাদেশ গত পনের বছর রিজিড শাসনের মধ্য দিয়ে গেছে এবং জনগণ এই অপশাসন ও কুশাসনের পরিবর্তন চাইছিল। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই অপশাসন ও রিজিড ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং এখন  মানুষ দেশে সংস্কার চায়। তবে, দেশের প্রান্তিক ও তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ উন্নয়ন ও সংস্কার চায় বটে, কিন্তু এইসব সংস্কার মূলক পলিসির প্রতি তাদের কোনো সচেতনতা নেই। কারণ, বাংলাদেশের যেকোনো পলিসি মেকিং হয় সাধারণ জনগণের সাথে সংযোগ ছাড়াই। এখন তারা মূলত ভোটার, তারা দেশের সংস্কার চায় বটে, কিন্তু সংস্কারের জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো ভয়েস উঠতে দেখা যায় না। তাদের কাছে কোনো সংস্কার চাওয়া হলে তারা মন্তব্য করতে আগ্রহী নন। এটি ৯০% বাংলাদেশী জনগণের অবস্থা।


অতএব, রাজনৈতিক দলসমূহ অসচেতন ও ইনএকটিভ জনগণের ফায়দা তুলে পুরনো রাজনীতিতেই ব্যস্ত থাকতে চায়। আমাদের কাছে যতই মনে হোক না কেন, রাজনৈতিক দলগুলো জনস্বার্থ বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, দিনশেষে আপনাকে বুঝতে হবে, এই অবস্থান তাদের জন্য পজিটিভ, যদিও দেশের জন্য তা নেগেটিভ হতে পারে। কারণ সুশীল ও নতুন রাজনীতি করবে এমন কোনো পলিটিক্যাল পার্টি এখন গণপর্যায়ে বিদ্যমান নেই। ফলে জনগণ বাধ্য হয়েই এই পুরনো রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং ক্ষমতায় আনতে বাধ্য। রাজনৈতিক দলগুলোও এটি জানে, এবং জনগণের অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় তাদেরই নির্বাচিত করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে পলিটিক্যাল পার্টি গুলো এবং তাদের নেতাকর্মীরা ভিন্নমতের বিরোধিতা সত্ত্বেও যা খুশি বলে যাচ্ছে। এটা আমাদের কাছে মনে হতে পারে যে তারা গণবিরোধী, সংস্কারবিরোধী কথা বলছে, কারণ তারা জানে জনগণ এই সংস্কার ও পলিসি মেকিং নিয়ে তেমন সচেতন নয়, এবং এই সুযোগটাই তারা নিচ্ছে।

No comments:

Post a Comment

গণতন্ত্র কেন মতাদর্শকে হার মানায়

পৃথিবীতে আসলে political correctness বলে কোনো চূড়ান্ত বিষয় নেই। অর্থাৎ, ডেমোক্রেসিতে কোনো রাজনৈতিক ideology ই শতভাগ সঠিক নয়।  যদি কেউ দাব...