[এক]
আমরা আমাদের চিন্তার সহজীকরণের বা সরলীকরণের মাধ্যমে সমাজকে বৈচিত্র্যহীনভাবে বিচার করি এবং দেখতে চাই। কিন্তু সমাজ বৈচিত্র্য ভালোবাসে, ভিন্নতাকে স্থান দেয়, ভিন্নতার মধ্য দিয়েই সমাজ চলতে থাকে। সমাজে ভিন্নতা না থাকলে, এই ভিন্নতার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া না থাকলে সমাজের অস্তিত্ব থাকত না। যে সমাজে বৈচিত্র্য নেই, সেই সমাজ আসলে নেই। বৈচিত্র্যহীন ও বৈষম্যহীন সমাজ ইউটোপিয়ান চিন্তা, যার কোনও বাস্তব ইতিহাস নেই। বৈচিত্র্যই সমাজের প্রাণ। এই বৈচিত্র্যই সমাজকে সমালোচনামূলক ও সংগ্রামময় করে তোলে। সমাজকে ক্রিটিকাল করে তোলে। এই ক্রিটিকাল সমাজের মধ্যেই এক শ্রেণি অন্য শ্রেণির সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজ এগিয়ে চলে। সমাজের চিরায়ত পরিবর্তনের মাধ্যমে এ বিষয়গুলো উপলব্ধি করা যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে কখনোই বৈষম্যহীন সমাজের দেখা পাওয়া যায়নি। সুতরাং যারা বলে, কোনো তন্ত্র বা কোনো এক ব্যক্তির ফিলোসফি দিয়ে সমাজকে বৈষম্যহীন সাম্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, তারা হয় একজন বড় মাপের ধোঁকাবাজ অথবা ইউটোপিয়ান চিন্তায় বিভোর।
[দুই]
শহরে সেকুলার আধুনিক চিন্তাবিদদের ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলার চিন্তা ততটা খারাপ মনে হয় না যদি না তা আল্ট্রা সেকুলার হয়ে ওঠে। আল্ট্রা সেকুলার বলতে বুঝি চরম গোঁড়া বা মৌলবাদী সেকুলার। এরা যেকোনো সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর মতোই ভিন্ন মতকে অস্বীকার করার মত ভয়ংকর প্রতিক্রিয়াশীল । এই আল্ট্রা সেকুলাররা সমাজকে তাদের চোখে দেখতে চায়, তাদের মত দেখতে চায়, সমাজ যেন তাদের মতো হয় না হলে সে সমাজ টিকবে না—এমনটাই তারা বিশ্বাস করে। তারা মনে করে, সমাজকে একমাত্র তারাই রক্ষা করতে পারে এবং তাদের চিন্তাই সবচেয়ে উদার। এর বাইরে কোনো উদার চিন্তা নেই, তাদের এই বাইনারি চিন্তা মারাত্মক। এই চিন্তার বাইরে তারা কোনো ভিন্ন মত বা পার্থক্যকে স্থান দিতে চায় না। সুতরাং, এই চিন্তা বা এই বাইনারি চিন্তা জঙ্গি মৌলবাদী চিন্তা ছাড়া আর কি হতে পারে?
[তিন]
আরো মজার বিষয় হচ্ছে এই যে, এই বাইনারি চিন্তা কিংবা আল্ট্রা সেকুলার চিন্তা আপনি শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে প্রবলভাবে দেখতে পাবেন। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং এই আল্ট্রা সেকুলার মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমাজ ও রাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ক্ষমতাবান এবং ক্ষমতা প্রয়োগেও এরা ব্যাপক আধিপত্যের অধিকারী । ফলে তারা তাদের আল্ট্রা সেকুলার এবং বাইনারি চিন্তাভাবনা সমাজের সর্বশ্রেণীর ওপর চাপিয়ে দেয়। তারা একটি কালচারাল হেজেমনি বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করে এবং নিজেদেরকে কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি বা সংস্কৃতির কারখানা হিসেবে দেখে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কারণে গ্রামীণ মানুষের সরল এবং ধার্মিক প্রবৃত্তি সবসময়ই তাদের দ্বারা অস্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশে যে সরল এবং ধার্মিক শ্রেণী রয়েছে, তারা উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, অথবা মধ্যবিত্ত যেই শ্রেণীরই হোক না কেন, তারা এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদীদের দ্বারা নিরন্তর বুলির শিকার হয়ে আসছে। দেখেন এই আল্ট্র সেকুলার চিন্তাভাবনা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বা শ্রেণী গত সাংস্কৃতিক চিন্তা। কিন্তু আপনি অপরপক্ষে যে ধর্মীয় বা কনজারভেটিভ যে গোষ্ঠীটা আছে এই গোষ্ঠী মূলত সর্বশ্রেণীর মধ্যেই বিদ্যমান, এবং এই ধর্মীয় কনজারভেটিভ সরল গোষ্ঠীরা মধ্যবিত্ত আলট্রা সেকুলার গোষ্ঠী দ্বারা চরমভাবে নিপীড়িত এবং বলির শিকার হয়ে আসছে আবহমান কাল থেকে।
[চার]
মধ্যবিত্ত আল্ট্রা সেকুলার গোষ্ঠীর দ্বারা যে ধার্মিক ও সরল গোষ্ঠীটি সবসময় বুলির শিকার হয়েছে, এখন সেই পরিস্থিতি বুমেরাং হতে চলেছে। কারণ, বর্তমানে এই ধার্মিক ও সরল গোষ্ঠী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীতে আত্মীকরণ ঘটিয়েছে, এবং এর ফলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কিছু অংশও তারা নিজেদের হাতে এনে ফেলেছে। এই আত্মীকরণের ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির কালচারাল হেজেমনিক আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর সাথে তাদের একটি বিরাট সাংস্কৃতিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব চলছে। দিন দিন এই কালচারাল গ্যাঞ্জাম আরও বাড়বে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে এই কালচারাল গ্যাঞ্জামের প্রবণতা আরও তীব্র হবে। মধ্যবিত্ত আল্ট্রা সেকুলার গোষ্ঠী ধার্মিক শ্রেণিকে প্রাচীনপন্থী বলতেও দ্বিধাবোধ করে না, কিন্তু এই ধার্মিক শ্রেণির উত্থান বাংলাদেশে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি আল্ট্রা সেকুলারদের কালচারাল আধিপত্যের জন্য হুমকি স্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বৈরশাসন পরবর্তী বাংলাদেশে এই দুই শ্রেণির বিরোধ আরও তীব্র হবে বলে আমি মনে করি।

No comments:
Post a Comment