সামাজিক বিচ্ছিন্নতা !









[১]

ইদানীং দেখা যায়, মানুষ প্রচুর কুকুর, বিড়াল ও বিভিন্ন ধরনের প্রাণীকে পোষ মানাতে ব্যস্ত। এটি গত ১০-১২ বছর আগেও খুব একটা দেখা যেত না, কিন্তু এখন এটি বেশ প্রচলিত। মানুষ পাখি, একোয়ারিয়ামের মাছ, বিড়াল কিংবা কুকুর এমনকি অনেকেই অদ্ভুত ধরনের প্রাণীও পোষে। পশ্চিমা বিশ্বে এটি আগে বেশি দেখা যেত, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই প্রাণী পোষার প্রবণতা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতেও ব্যাপক আকারে বেড়েছে। প্রাণী পোষা যে খারাপ কিছু তা নয়, যেমন বিড়াল চিরায়তভাবেই মানুষের পরিবেশে ছিল, এমনকি বিছানাতেও প্রবেশাধিকার ছিল। আর কুকুর সাধারণত মানুষ নিরাপত্তার জন্য পোষে, যদিও বাসার অভ্যন্তরে তার প্রবেশাধিকার ছিল না।

কুকুর-বিড়াল মানুষের সমাজে বাস করলেও এতদিন পর্যন্ত মানুষের নিকটজন বা আত্মার কেউ হয়ে উঠতে পারেনি। তবে বর্তমানে দেখা যায়, মানুষের মানসিকতায় এইসব প্রাণী অনেক বেশি অন্তরঙ্গ ও আবেগময় সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকেই এই প্রাণীদের তাদের পরিবারের সদস্য হিসেবেও মনে করে এবং এদের প্রতি পারসোনিফিকেশন ঘটে। মানুষ নিজেদের সাইকোলজিতে এই প্রাণীদের একটি আলাদা সত্তা হিসেবে গড়ে তোলে এবং তাদের আত্মার আপনজন বা পরিবারের সদস্যের মতোই গ্রহণ করে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে পোষ মানানো প্রাণীদের প্রতি মানুষের মানসিক একাত্মতা ও আন্তরিকতা কেন এতো বাড়লো? এর কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।


[২]

মানুষ স্বভাবতই ভাবপ্রবণ ও ভালোবাসাপ্রিয়, এবং প্রিয় মানুষের সাথে সময় কাটাতে তার আগ্রহ প্রবল। কিন্তু বর্তমানের শহরকেন্দ্রিক ব্যস্ত জীবন এবং বৈচিত্র্যময় চিন্তাভাবনা মানুষকে একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে, প্রিয়জন থাকা সত্ত্বেও প্রিয়জনের অভাব অনুভূত হয়। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রায়ই দেখা যায়, একই বাড়িতে বসবাস করলেও সদস্যদের মধ্যে মানসিক ও চিন্তার দূরত্ব তৈরি হয়। বিশেষত, প্রজন্মগত ফাঁক (জেনারেশন গ্যাপ) এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে, যা পারিবারিক আন্তরিকতা ও বোঝাপড়ায় ফাটল সৃষ্টি করে। এর ফলে, অনেকেই বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বে ভুগছে।

এই ধরনের মানসিক চাপে ভোগা মানুষ অনেক ক্ষেত্রে মনুষ্য সঙ্গের বিকল্প হিসেবে প্রাণীদের কাছে আশ্রয় খোঁজে। তাদের প্রতি একটি আলাদা মমতা ও নির্ভরশীলতা গড়ে ওঠে প্রিয়জনের অভাব পূরণের জন্য। বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত যে, পোষা প্রাণীর সাথে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক। পোষা প্রাণীর প্রতি গভীর মানসিক সংযোগের মাধ্যমে মানুষের আত্মপ্রসারণ (self-expansion) ঘটে এবং এটি তাকে মানসিকভাবে পরিপূর্ণতার অনুভূতি দেয়। আর এই অনুভূতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে কুকুর ও বিড়াল, তাই এই প্রাণীগুলোর প্রতি মানুষের আলাদা আগ্রহ।


[৩]

কুকুর-বিড়াল বা অন্যান্য প্রাণীকে পোষ মানানোর ক্ষেত্রে শুধু শহরের মানুষই এগিয়ে নেই, বরং গ্রামেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তবে শহরের মানুষের ক্ষেত্রে এই পোষা প্রাণীর প্রতি আগ্রহ মূলত একাকীত্বের অবসান ও আবেগপূর্ণ সঙ্গ প্রাপ্তির জন্য হলেও, গ্রামাঞ্চলে এটি আধুনিক ট্রেন্ড ফলো করা বা সামাজিকভাবে রিলেভ্যান্ট থাকার জন্য। অনেক তরুণ-তরুণীর মধ্যে বিড়াল-কুকুর পোষার প্রবণতা যেন একপ্রকার ফ্যাশনের মতো। এখন গ্রামের হাট-বাজারেও পাখির দোকান, অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ বিক্রির দোকান, বিড়াল-কুকুরের খাবারের দোকান দেখা যায়, যেটি পাঁচ বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল।

আগে গ্রামের মানুষ শখের বসে কবুতর পালতো, যা এখন কিছুটা কমেছে এবং তার জায়গায় কুকুর-বিড়াল বা মাছের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। তাই, শহরের মানুষ যেখানে একাকীত্বের অবসানের প্রয়োজনে পোষা প্রাণীর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, সেখানে গ্রামের মানুষ অনেকটাই ফ্যাশন সচেতনতা ও আধুনিকতার ধারণা থেকে এই প্রবণতা অনুসরণ করছে বলে মনে হয়।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...