[১]
আন্তঃব্যক্তিক স্বৈরাচার সমাজের জন্য এক গুরুতর হুমকি,এটি এমন একটি প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ স্থান দেয় এবং অন্যদের প্রয়োজন ও অনুভূতিকে উপেক্ষা করে। এই প্রবণতা মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করে এবং তাদের নিজের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া-পাওয়াকে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শেখায়। এতে ব্যক্তি নিজেকে ঈশ্বরতুল্য মনে করা শুরু করে এবং বিশ্বাস করে যে তার ইচ্ছাই সর্বোচ্চ।
এই মানসিকতা একজন মানুষকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যায় যেখানে সে মনে করে, তার চাওয়া-পাওয়ার বাইরে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে যা চাইবে, তা তাকে অবশ্যই পেতে হবে। এ অবস্থায়, সমাজ বা সোসাইটি তার ইচ্ছাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে বা তার চারপাশের মানুষ ও সারাউন্ডিং এই বিষয়ে কী ভাবছে, তা নিয়ে তার কোনো আগ্রহ থাকে না।
এভাবে নিজের স্বৈরাচারী মনোভাব ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সে তার চারপাশের মানুষের দুঃখ-কষ্টকে উপেক্ষা করতে শেখে। সমাজের অসুবিধা বা অস্বস্তি এবং আনকম্ফর্টনেস কে তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়। নিজের ইচ্ছাকে পূর্ণ করার প্রয়াসে, সে অন্যের ইচ্ছাকে অগ্রাহ্য করতে দ্বিধা করে না। এই প্রক্রিয়ায়, তার স্বৈরাচারী মানসিকতা সমাজের সামষ্টিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।
[২]
আধুনিক পৃথিবীর লার্নিং প্রসেস মানবজাতিকে ক্রমশ স্বৈরাচারী করে তুলছে। এই প্রক্রিয়া এমনভাবে মানুষের চিন্তা-ভাবনায় ঢুকে গেছে যে মানুষ এটিকে আদর্শ হিসেবে আইডিয়ালাইজ করছে। এর প্রভাব সরাসরি সমাজে পড়ছে। সমাজ এক ধরনের কাঠামো বা প্লাটফর্ম, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে অনেকের মধ্যে একজন হয়ে থাকতে হয়। সমাজ কখনোই চায় না যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে সমাজের সংযোগ ছিন্ন করে ফেলুক। বরং সমাজ প্রত্যাশা করে, মানুষ একটি সাধারণ কমিউনিকেশন ল্যাঙ্গুয়েজ, কালচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ, নর্মস এবং কাস্টমসের মধ্য দিয়ে একে অপরকে সহায়তা করবে। সমাজ ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করে ঠিকই, তবে ব্যক্তির স্বৈরাচারী হওয়ার প্রবণতা প্রতিহত করাও তার অন্যতম দায়িত্ব। আর ব্যক্তি যাতে নিজ স্বাধীন ভাবি কোন কাজ করতে না পারে ও তার ব্যক্তি প্রবণতায় স্বৈরাচারী না হতে পারে, এই কারণে সোসাইটি তার সমস্ত রকম চেষ্টা প্রচেষ্টা করে এবং ব্যক্তিকে স্বৈরাচারী হতে বাধা প্রদান করে। সমাজের অন্যতম বাধা প্রদানকারী হাতিয়ার বা উইপেন হচ্ছে সামাজিক ক্রীয়া প্রতিক্রিয়া বা সোশ্যাল ইন্টারেকশন, এর মাধ্যমেই সমাজ ব্যক্তিকে স্বৈরাচারী হতে বাধা প্রদান করে।
[৩]
আধুনিক সময়ে একটি বড় সমস্যার উদ্ভব হয়েছে—মানুষের মধ্যে আন্তঃব্যক্তিক ইন্টারেকশনের অভাব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সংযোগের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, মানুষ দিন দিন একাকীত্বকে বেছে নিচ্ছে। একে অপরের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ছাড়াই মানুষ নিজের ইচ্ছা, চেতনা, ভালোলাগা ও খারাপ লাগাকে অগ্রাধিকার দিতে শিখছে।
এর ফলে ব্যক্তি নিজেকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে সমাজকে এড়িয়ে চলছে। সে মনে করে, তার ইচ্ছাই যথেষ্ট; অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। এই মানসিকতা ব্যক্তি এবং সমাজের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে, যা সমাজের জন্য প্রকৃত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ আজ একাকী থাকা শিখে ফেলার কারণে অন্যের সহায়তা ছাড়াও সে নিজের চিন্তা-চেতনা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালোলাগা ও খারাপ লাগার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এতে সে মনে করে, নিজের স্বকীয়তার চিহ্ন পৃথিবীতে রাখতে হলে অন্যের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। এই মানসিকতা তাকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
ফলে, সমাজের গুরুত্ব তার কাছে ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ব্যক্তি মনে করে, সমাজ কেবল একটি সেকেলে কাঠামো যা তার স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এইভাবে ব্যক্তি সমাজকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে এবং তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
[৪]
এই আন্ত ব্যক্তিক স্বৈরাচারী মানসিকতার উত্থানের মূল ক্ষেত্র হচ্ছে একক পরিবার। একক পরিবারে বাবা-মা ও দুই ভাই-বোনের মধ্যে একটি ছোট্ট কাঠামো গড়ে ওঠে। এতে পারিবারিক পরিবেশে ব্যক্তির আদান-প্রদান ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটে না। একক পরিবারের ব্যক্তিরা পর্যাপ্ত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও পরস্পরের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে, তারা তাদের ইচ্ছার সীমানা নির্ধারণে ব্যর্থ হয়। অন্যের চাহিদা বা অনুভূতিকে বুঝতে অপারগ হয়। সমাজ সবসময় একত্রিকরণের ওপর জোর দেয়। এটি চায় সবাই একে অপরের সুখ-দুঃখে সামিল হয়ে একসাথে পথচলা শিখুক। তবে একক পরিবারের এই বিচ্ছিন্ন কাঠামো ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করছে। এটি সমাজের ঐক্য ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এবং একক পরিবারের যেটা সবচেয়ে বড় বড় সেইটা হচ্ছে সোসাল ইন্ট্রাকশন বা সামাজিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার যে মাত্রাটা, সেটা অনেক কমে যায়।
সমাজ সবসময় একটি একভূত মানবগোষ্ঠীর ধারণায় বিশ্বাসী, যেখানে সবাই একে অপরের সুখ-দুঃখে শরিক হয়ে তা উপভোগ করে। এটি একত্রিকরণের নীতিকে সমর্থন করে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা সমাজের নীতি, কাস্টমস এবং মূল্যবোধের (norms and values) সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তবে আধুনিক একক পরিবারের প্রভাব এই ঐক্যবদ্ধ সমাজের ধারণাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
একক পরিবারগুলো সমাজের প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে, প্রায়শই সমাজের কাস্টমস ও মূল্যবোধকে অগ্রাহ্য করে। এই বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিকে তার নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ দিলেও, এর ফলে ব্যক্তি আরও বেশি স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন হয়ে উঠতে পারে।
আধুনিক সমাজে শিক্ষা থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে মানুষ ক্রমেই পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ায়, তারা একাকী বাস করার প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এতে তাদের নিজের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি গুরুত্ব বাড়ছে এবং অন্যদের চাহিদা বা অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীলতা কমছে।
এই বিচ্ছিন্নতা ও স্বাধীনতার প্রতি অতিমাত্রিক আকর্ষণ আন্তঃব্যক্তিক স্বৈরাচারের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। এতে সমাজ তার ঐক্যবদ্ধ কাঠামো ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে। ব্যক্তির ইচ্ছার সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান ও সমাজের নীতিকে উপেক্ষা করার এই প্রবণতা সমাজের সুসংহত কাঠামো ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

No comments:
Post a Comment