রাজনৈতিক দলগুলার ছাত্র উইং এর স্কুল বিভাগ ও রাজনৈতিক মূল্যবোধের বিপর্যয় নিয়ে আমার কিছু কথা ও মতামত।

 

















রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ছাত্র উইং-এর মাধ্যমে ১৬-১৭ বছরের কম বয়সী কিশোরদের দলে রিক্রুট করার যে কৌশল, তা আমার কাছে অত্যন্ত নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলে মনে হয়। দেখুন, ১৬-১৭ বছরের কিশোরদের একটি স্বতন্ত্র চিন্তা ও বোধ তৈরি হয়। তারা নিজেদের এবং তাদের চারপাশ নিয়ে সচেতনভাবে চিন্তা করতে শেখে। এই বয়সটা হচ্ছে আত্মপরিচয়ের বিকাশের সময়, যখন তারা সমাজতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবতে শেখে। যদিও এই বয়সে তারা অনেক কিছু বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং চিন্তার পরিপক্বতা এখনো গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা নীতিমালার সঠিক বিশ্লেষণ এ বয়সে সম্ভব নয়। আমাদের বুঝতে হবে, এই বয়সটি রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য উপযুক্ত নয়।

সুতরাং, স্কুলে পড়া কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে রিক্রুট করা একটি চরম অনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য কাজ। যদি এই রিক্রুটমেন্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমারেখার মধ্যে গিয়ে করা হয়, তবে তা নৈতিকতার এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে। এটি রাজনৈতিক নীতি ও শুদ্ধাচারের স্পষ্ট বিরোধী। আপনি যদি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তরুণদের রাজনৈতিক শিক্ষা ও মতাদর্শের দীক্ষা দিতে চান, তা একেবারে যৌক্তিক। যদি তারা স্বেচ্ছায় রাজনীতিতে যুক্ত হতে চায়, তবে রাজনৈতিক সমাবেশ, আলোচনা বা মত বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ত করতে পারেন। এতে সমাজ বা রাষ্ট্রের কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু স্কুলের নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চাপিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ভুল। বিশেষ করে, এই বয়সে শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা মানে তাদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ধ্বংস করা। রাজনৈতিক প্রভাবিত হলে, তারা আর কোনোদিনই নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক তত্ত্ব ও মতাদর্শের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে না।

আপনি হয়তো বলবেন যে, এই বয়সে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া, যেমন নামাজ-রোজার দাওয়াত বা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রচার করা জরুরি। এটি অবশ্যই ঠিক হতে পারে, যদি আপনি নিজেকে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তবে, আপনাকে বুঝতে হবে যে, ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতা বিকাশের জন্য অনেক অরাজনৈতিক ইসলামিক ও সামাজিক সংগঠন ইতিমধ্যে কাজ করছে।

সুতরাং, ধর্মীয় আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্য হলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে স্কুলে আপনার সংগঠনের আওতায় এই ধরনের দাওয়াতি কার্যক্রম চালানো মোটেই সমীচীন নয়। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের পরোক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা প্রতীয়মান হবে। যদি আপনার মতো ধর্মীয় রাজনৈতিক দল একবার স্কুলে প্রবেশের সুযোগ পায়, তবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোরও সেখানে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে। এর ফলে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে স্কুলের মতো নিরপেক্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।

সুতরাং, রাজনৈতিক নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে, রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের উচিত হবে স্কুল কার্যক্রম বন্ধ করা। যতই সেটি দাওয়াতি বা নৈতিক শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে হোক না কেন, এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর প্র্যাকটিস হিসেবে গণ্য হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আমি অনুরোধ করব, প্লিজ, স্কুলের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকুন। কিশোরদের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দিন। তারা নিজেরাই যথাসময়ে বিচার করবে, কোন রাজনৈতিক দল তাদের জন্য উপযুক্ত। তারপর, তারা সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে আপনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...