[এক]
আধুনিক সময়ে মানুষ ব্যক্তি স্বাধীনতায় খুবই গোঁড়া ভাবে বিশ্বাস করে। এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকে ধর্ম দ্রোহিতার মতোই দেখে। পশ্চিমা লিবারাল দেশগুলোতে এটার চর্চা হয় প্রত্যেকের প্রত্যক্ষ সম্মতিতে। এ কারণে আপনি দেখবেন পশ্চিমা দেশে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে আবার নেই বললেই চলে। সেই সব দেশগুলোতে সমাজ ও পরিবারের অস্তিত্ব আছে কিন্তু কার্যকর ভূমিকা নেই। কারণ 'ব্যক্তি' ওই সব দেশের সমস্ত গুরুত্বের কেন্দ্রীয় অবস্থানে । এইটাকে উদারনৈতিক দার্শনিকতাই ইন্ডিভিজুয়ালিজম বা ব্যক্তি স্বতন্ত্রীকতা বলে। কেননা এই লেবারাল দেশগুলোতে ব্যক্তির স্বাধীন মত চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে ব্যক্তি এখানে স্বৈরাতান্ত্রিক মনোভাবে বড় হয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিজে শেখে এবং এই মনোভাব সেই ছোট থেকেই নিয়ে বড় হয়। দেখেন আমাদের দেশগুলোতে এই ব্যক্তি স্বাধীনতা ঝামেলা তৈরি করলেও, পশ্চিমা দেশগুলোতে রুল অফ ল ও ব্যাক্তি স্বাধীনতার যে চর্চা, এইটা মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক মূল্যবোধে পরিণত হয়। ফলে এইসব রাষ্ট্র ও সমাজ এবং পারিবারিক পরিবেশে ব্যক্তি স্বাধীনতা নেগেটিভ বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনা। দেখেন আরো মজার বিষয় হচ্ছে এই ইন্ডিভিজুআলিজম বা ব্যক্তি স্বাধীনতা বা ব্যাক্তি স্বতন্ত্রীকতা এইটা মূলত আসলে কোন সর্বজনীন বা ইউনিভার্সেল মূল্যবোধ না। মূলত শহরকেন্দ্রিক একটা মূল্যবোধ এবং যা শহরের মানুষের মন মানসিকতাকেই রিফলেক্ট করে। গ্রামে এই মূল্যবোধের চর্চা সেইভাবে দেখা যায় না ও গ্রামে এই মূল্যবোধকে মেইন্টেন করতে গেলে আপনি দেখবেন এইটার জন্য গ্রামে একটা অস্থিরতা তৈরি হয় এবং গ্রামে একটা একটা হ্যাজারডাস সিচুয়েশন তৈরি করে। কারণ এই যে ব্যক্তি স্বতন্ত্রীকতার যে দর্শন, এই দর্শন মূলত পশ্চিমাদের থেকে এসেছে এবং পশ্চিমারা শহরকেন্দ্রিক অথবা শহুরে মেন্টালিটি লালন করে।
এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোতে আপনি দেখবেন ধর্মের বন্ধন বা সামাজিক প্রথা ও ঐতিহ্যের পুনর পুনর ভাঙ্গন। সামাজিক প্রথা ও ঐতিহ্যের বন্ধনের অবস্থা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এই সময়ে এবং এইটা বাড়বে বলে আমার মনে হয় না। পশ্চিমা সোসাইটি গুলোতে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এবং এইসব সোসাইটির যারা ধর্ম মেইনটেইন করে কিংবা প্রথা, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয় তারাও মূলত এই বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং বাধ্য থাকে।
[দুই]
আফ্রো-এশিয়ান ভ্যালুজে ব্যক্তির চেয়ে পরিবার ও সমাজের গুরুত্বটা অধিক। ফলে পরিবার ও সমাজের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব আমরা লক্ষ্য করি এখানে ব্যক্তির বিপরীতে। এখানে ব্যক্তি ডমিনেট হয় পরিবার ও সমাজ দ্বারা। পশ্চিমা দেশের মতে এইখানে ব্যক্তি রিপ্রেস হয় পরিবার ও সমাজ দ্বারা। সেটা করা হয় ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সংরক্ষণের নামে। বাট এই একবিংশ শতাব্দীতে আইসা তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্য প্রবাহের যে একটা ব্যাপক আগ্রাসী মনোভাব, যেইটার মূল থিমটা আমরা গ্লোবালাইগেশন বা বিশ্বায়ন নামে পরিচিত করাতে পারি, এর প্রভাবে এই সব দেশের সমাজ এখন পশ্চিমা সংস্কৃতি ও কৃষ্টি কালচারের সাথে একটা এসেমিলেট ঘটছে। ফলে কালচারাল একটা অসিলেসন দেখা যাচ্ছে এসব রক্ষণশীল সোসাইটিতে। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে কিছু গ্রহণ করছে এবং নিজেদের যে ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি রয়েছে ঐখান থেকে তাদের কিছু সংস্কৃতি তারা লালন করছে না, ফলে ওই সংস্কৃতিগুলা হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু কনজারভেটিভ এশিয়ান ভ্যালুজ রক্ষাকারী যারা তারা এইটাকে পশ্চিমা পলিটিক্যাল ও সামাজিক ধ্যান-ধারণার অনুপ্রবেশ হিসাবেই দেখছে। কিন্তু মোটা দাগে আমরা বলতে পারি লিবারেলিজম উদারনৈতিক ও আরো যত পশ্চিমা ধারণা ও দর্শন এইগুলার একটা পরোক্ষ প্রভাব ও অনুপ্রবেশ এই এশিয়ান রক্ষণশীল সমাজগুলোতে তরুণ যুবক শ্রেণির চিন্তা ও মনোজগতের সাথে মিশে একপ্রকার মিক্সড কালচার তৈরি করছে। এইযে মিক্সড কালচার, এই মিক্সড কালচারের সবচেয়ে প্রভাবশালী যে ধারণা সেইটা হচ্ছে ব্যাক্তি স্বাধীনতা। এই ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে এই আফ্রো-এশিয়ান ভ্যালুজের সাথে এই মিক্সড কালচারের একটা ফাটাফাটি দ্বন্দ্ব চলে। এই দ্বন্দ্ব টাই মূলত প্রভাবশালী ব্যক্তি স্বাধীনতাই বিশ্বাসী অংশটার ডমিনেটেড বা জয়জয় কর এই সোসাইটি গুলোতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । কারণ আফ্রো-এশিয়ান কান্ট্রি গুলার শাসক শ্রেণী, শিক্ষিত ও ভার্সিটি যাওয়া যে শ্রেণীটা রয়েছে, এ শ্রেণীটা মূলত পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একটা শ্রেণি এবং এরাই ওই রক্ষণশীল আফ্রো-এশিয়ান সমাজ ও দেশ গুলোকে পরিচালনা করছে। ফলে এই শাসক ও শিক্ষিত প্রগতিশীল শ্রেণি এই মিক্সড কালচারের নামে মূলত পশ্চিমা ব্যক্তি স্বতন্ত্রীকতা ও স্বাধীনতার অনেক সংস্কৃতি ও ভ্যালুজকেই আফ্রো-এশিয়ান ভ্যালুজের সাথে মুখোমুখি দ্বন্দ্বে দাঁড় করায় দিয়েছে।
[তিন]
ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জয়জয়কার ও প্রভাব সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে এখন প্রতিনিয়ত অস্তিত্বহীনতার প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। আরো ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে এই ব্যক্তি স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করে তারা মূলত সামাজিক মূল্যবোধকে দোষ দেওয়ার আগে ধর্মীয় মূল্যবোধকে ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রথম ও চূড়ান্ত প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখছে। ফলে এই এই যে দুই সংস্কৃতির একটা দ্বন্দ্ব, এই দ্বন্দ্বটা মূলত আফ্রো-এশিয়ান ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং পশ্চিমা মানবতাবাদী হিউম্যানিজন দর্শনের দ্বন্দ্ব।
দ্বন্দ্বটা এতদূর গড়াইছে যে ধর্মকে অস্বীকার করার মত প্রবণতাও তৈরি হয়েছে এবং যারা ব্যক্তি স্বতন্ত্রী চিন্তাবিদ ও ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এরাও ধর্মের প্রতি একটা বিরূপ মনোভাব নিয়ে বড় হচ্ছে। তবে বুঝতে হবে, এই যে যতটা না ধর্মকে অস্বীকার করার প্রচেষ্টা বা মিথ্যা প্রমাণ করার মানসিকতা তার চাইতে বেশি ব্যক্তির স্বৈরতান্ত্রিক ইচ্চা/আকাঙ্ক্ষা বহিঃপ্রকাশের প্রবনতাটাই বেশি।
এটার ফলে যেটা ঘটছে, তৃতীয় বিশ্ব বা বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল-রক্ষণশীল সামাজিক আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের মনো সামাজিক ও মনো কাঠামোগত ভিত্তিতে অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে ওইসব সোসাইটি গুলোতে একটা দ্বান্দ্বিক অবস্থান বিরাজ করছে। এই সোশ্যাল কনফ্লিক্ট বা সামাজিক দ্বন্দ্বটা মূলত সামাজিক মূল্যবোধের পক্ষের লোক ও ব্যক্তি স্বতন্ত্রী বা ব্যক্তি স্বাধীনতার উপভোগ করতে চাওয়া মিক্সড কালচারকে প্রতিনিধিত্বকারী পক্ষের মধ্যে বিরাজ করছে। আমরা এই দ্বন্দ্ব টাতে অস্তিত্বের প্রশ্ন নিয়ে আসতে পারি। এই যে সমাজের সামষ্টিক মূল্যবোধের প্রাসঙ্গিকতা ও ব্যক্তির স্বাধীন সত্তাকে আরো স্বাধীন করার যে ব্যক্তি প্রচেষ্টা, এই দুই পক্ষের একটা অস্তিত্বের সংকট। আবার আমরা এই পক্ষগুলোকে বলতে পারি ব্যক্তির সাথে সমাজের সংগ্রাম। যেইখানে ব্যক্তি সমাজকে ডিঙিয়ে যেতে চাই। সমাজের ডিসিপ্লিন, কন্ট্রোল ও ডমিনেটে কে অস্বীকার করে নিজস্ব একটা গন্ডি তৈরি করতে চাই। আর এই একবিংশ শতাব্দীতে ব্যক্তির সমাজকে অস্বীকার করে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বা অস্তিত্বের চরম শিখরের পৌঁছে যাবার যে লড়াই, এই লড়াইয়ে ব্যক্তি অভাবনীয়ভাবে সমাজকে ডমিনেটে করবে বলে আমার মনে হয়।

No comments:
Post a Comment