মৃত্যু চেতনার মৃত্যু-০১



মানুষ মৃত্যুকে এখন খুবই স্বাভাবিক মনে করে। মানুষ মরতে চায় না এবং কারো মৃত্যুতে আর মানুষের মধ্যে ভয়, ভীতি কিংবা আশঙ্কাও জাগে না। ছোটবেলায় দেখতাম, এলাকায় কেউ মারা গেলে গোটা গ্রামে যেন এক প্রতিবেশী বিদায়ের শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়ত। শোকাহত হতো গোটা গ্রামের মানুষ। গ্রামের মানুষের মধ্যে হারানোর বেদনা, দুঃখ ও শোক স্পষ্টভাবে বোঝা যেত। প্রত্যেকটি বাড়িতে এক কিংবা দুই দিন এই শোকের আবহ বিরাজ করত। দেখা যেত, মৃত পরিবারের জন্য প্রতিটি বাড়ি থেকে রান্না করা খাবার ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হতো। সেই দিনগুলো, সেই সহানুভূতি ও আন্তরিকতার অনুভূতি আমরা মনে হয় হারিয়ে ফেলেছি।

গ্রামে এখন কেউ মারা গেলে  প্রত্যেকেই তার আপন আপন কাজে ব্যস্ত থাকতে শুরু করেছে, পাশের বাসার যে কেউ মারা গেছে বা গ্রামের  কেউ একজন মারা গেছে এইটা নিয়ে  কেউ আর ভাবে না। ইভেন পাশের বাড়িতে  হাসাহাসি ও বিভিন্ন দৈনন্দিন কর্মকান্ড স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে । মৃত পরিবারের শোককে কেউ আর নিজের শোক বলে মনে করে না। আগে যখন গ্রামের একটি বাড়িতে মৃত্যু ঘটতো, তখন শেষ প্রান্তের অন্য বাড়িও সেই মৃত্যুর শোক অনুধাবন করতো অথবা গোটা গ্রামে এক গুমোট অবস্থা বিরাজ করত। কিন্তু এখন, সেই দুঃখের অনুভূতি আর মানুষের মনে জাগে না।

আচ্ছা, এরকম কেন হয়? আমরা কি আমাদের ভেতরের পারস্পরিক সহানুভূতি, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা হারিয়ে ফেলেছি? আমাদের মধ্যে কি আগের মতো প্রতিবেশী সুলভ আন্তরিকতা নেই? নাকি মানুষের মধ্যে মৃত্যু ভয় কমে গেছে? যে কারণে আগে গ্রামের সবাইকে মৃত্যুর ভয়ে শোকগ্রস্ত করে তুলত?

সাধারণত, আমার গ্রামের কেউ মারা গেলে জানাজায় অংশগ্রহণের একটা মানসিকতা আমার মধ্যে আছে। জানাযায় গিয়ে কবরস্থানে আমি পারতপক্ষে একাকী থাকার চেষ্টা।  জানাজায় অংশগ্রহণের সময়, আমি বিভিন্ন মানুষের এক্সপ্রেশন ও তাদের কবরস্থানের কর্মকাণ্ড দেখার চেষ্টা করি। আমি লক্ষ্য করেছি, জানাজায় মানুষ এখন মৃত ব্যক্তির ভালো-মন্দ কাজের কথা বলে না, মৃত্যুর গল্প আলোচনা করে না, মৃত্যু আসবে এই বিষয় নিয়েও আলাপ হয় না। দশ বছর আগেও কবরস্থানে মৃত্যু নিয়ে আলোচনা হত; কবরের বিষয়, মৃত্যুর পর কি হবে—এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হতো। এবং এই আলোচনা করতে করতে আমি প্রত্যেকের মুখে মৃত্যুর ভয় স্পষ্ট রূপে দেখতে পাইতাম। কিন্তু এখন অধিকাংশ মানুষ কবরস্থানের দেয়াল, কবরস্থানে কতটুকু মাটি আছে, কত টাকা দান করল, কবরস্থানের উন্নয়ন এবং তদারকি নিয়ে আলোচনা করে। এমনকি, মানুষ এখন রাজনীতি ও রাজনৈতিক আলাপ নিয়েও কবরস্থানে কথা বলে। আহা! মৃত্যুর ভয়, তোমাকে মানুষ করেছে জয়। 

মানুষ মৃত্যুকে স্মরণ করতে চাই না, অথবা ভুলে থাকার চেষ্টা করছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে মৃত্যুকে দূরে ঠেলে দেওয়ার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মানুষ এই জগতে সারা জীবনই সুখে শান্তিতে স্বাচ্ছন্দে থাকতে চাচ্ছে। । আমার জানতে ইচ্ছা করে, মানুষ কেন মৃত্যুকে ভয় পায় না? আমাদের এই আধুনিক সময়ে, যেখানে ভৌত ও অর্থের উপরে সবকিছু নির্মিত, মৃত্যু এখন আসলেই অবহেলা ও উদাসীনতার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...