আইডেন্টিটি পলিটিক্সে ভারতের বিজেপি সফল হলেও বাংলাদেশে জামাত কেন ফেইল করবে?

১. 

বিজেপির যে রাজনীতি তা প্রচন্ডরকম হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। এই পলিটিক্স সফল হওয়ার পেছনে যে বিষয়টা ব্যাপক প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে তা হচ্ছে হিন্দু ধর্মে শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে বা কোন শাসনব্যবস্থা বেস্ট সে বিষয়টা গাইড করেনি। হিন্দু ধর্মে শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট গাইডেন্স নাই, তবে কিছু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ এবং দর্শনশাস্ত্রে শাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্র (কৌটিল্য বা চাণক্যের রচনা) এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। মনুস্মৃতির মত এইসব গ্রন্থে শাসন, নৈতিকতা, সমাজ পরিচালনা এবং শাসকের কর্তব্য নিয়ে নানা নিয়মাবলি উল্লেখ করা হয়েছে। রাজাকে জনতার কল্যাণের জন্য কাজ করতে বলা হয়েছে এবং তার নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। হিন্দু এই ধর্মগ্রন্থগুলোর মাধ্যমে হিন্দু সমাজে শাসন ব্যবস্থার ধারণা গড়ে ওঠে, যেখানে রাজা ধর্ম, ন্যায় এবং জনকল্যাণে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে গণতন্ত্রের সাথে হিন্দু ধর্মের সরাসরি কোন ক্ল্যাশ হয়নি এইটা বিজেপির জন্য গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় হিন্দু সমাজের  প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসাবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে ও সরকার গঠনে খুবই সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। 


২.


 জামাত ইসলামী ও অন্যান্য যেসব ইসলামিক ধর্মভিত্তিক পার্টি রয়েছে, প্রত্যেকটা পলিটিক্যাল পার্টি দিনশেষে ফেইল করবে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে ইসলাম ও গণতন্ত্রের মূলগত কিছু পার্থক্য রয়েছে আবার  ইসলাম মূলত গণতন্ত্রকে ওন করে না, বাতিলের খাতায় ফেলে দেয় এইটা অধিকাংশ আলেম এর মতে।  গণতন্ত্র যেখানে জনগণকে বা  প্রত্যেকটা ব্যক্তির আলাদা মতামত কে গুরুত্ব দিলেও অধিকাংশের মত কে গ্রহণযোগ্য মত হিসেবে রেকগনাইজ করে। ইসলাম সেখানে অধিকাংশের মতের বিপরীতে  আল্লাহকে সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন হিসেবে মনে করে এবং শাসনকার্য পরিচালনার জন্য শুরা বা পরমার্শক পর্ষদ এর গুরুত্ব দেয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় প্রতিনিধি নির্বাচনে যেখানে জনগণের পছন্দের প্রার্থীকে সরাসরি  নির্বাচিত করা হয়, সেইখানে ইসলাম বিপরীত ওয়েতে কাজ করে যেমন শুরা (পরামর্শ পরিষদ)যারা হবে সমাজের প্রভাবশালী ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের একটা অংশ, এরা প্রথমে সমাজের সবচেয়ে সৎ, ন্যায়বান,মানবিক ও ধার্মিক কয়েকজন ব্যক্তিকে চুজ করে, তারপর  জনগণকে এদের মধ্যে থেকে সবচেয়ে কোয়ালিটি সম্পন্ন ব্যক্তির হাতে বায়াত নিতে বলে।  সুতরাং ইসলামে জনগণের প্রত্যক্ষ গুরুত্বটা নাই, পরোক্ষ একটা ভূমিকা  থাকে। 


৩.


গণতন্ত্রের সাথে ইসলামের যেটা ক্ল্যাশের জায়গা তাহল গণতন্ত্রে জনগণই সার্বভৌম ও স্বাধীন,  জনগণই শাসনকর্তা, আর ইসলামে আল্লাহ সর্বোচ্চ শাসক এবং শাসনকার্য তাঁর আইন (শরিয়া) অনুযায়ী পরিচালিত হয়। গণতন্ত্র ও ইসলামের শাসনব্যবস্থার মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে  যা মূলত ক্ষমতার উৎস, আইন প্রণয়ন, এবং শাসনকার্যের নীতিমালা সংক্রান্ত। নিচে এই দুই শাসনব্যবস্থার আরো কিছু মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরা যাইতে পারে এভাবে -


(ক)  ক্ষমতার উৎস:

গণতন্ত্র: গণতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ। তারাই শাসক নির্বাচন করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন প্রণয়ন করে। জনমতই আইন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি।


ইসলাম: ইসলামে ক্ষমতার উৎস হলো আল্লাহ। শাসক ও শাসিত সকলের উপর আল্লাহর আইন বা শরিয়া প্রয়োগ করা হয়। আল্লাহর আইন সর্বোচ্চ এবং কোনো মানবীয় মতামতের ঊর্ধ্বে।


(খ) আইন প্রণয়ন:

গণতন্ত্র: গণতন্ত্রে আইন প্রণয়ন করা হয় সংসদ বা পার্লামেন্টের মাধ্যমে। আইনের ভিত্তি হয় জনমত এবং সমাজের প্রয়োজন।


ইসলাম: ইসলামে আইন পরিবর্তনযোগ্য নয়, কারণ ইসলামিক আইন কোরআন এবং হাদিস থেকে প্রাপ্ত। মানবজাতি আল্লাহর বিধান মেনে চলে এবং এর বাইরে নতুন আইন প্রণয়নের অধিকার নেই।


(গ) শাসনকর্তার ভূমিকা:

গণতন্ত্র: গণতন্ত্রে শাসক জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকে। শাসককে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হয়।


ইসলাম: ইসলামে শাসক আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তাকে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা ও শাসকের কাজ হলো আল্লাহর বিধান পালন করা।


(ঘ) ব্যক্তিগত স্বাধীনতা:

গণতন্ত্র: গণতন্ত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উপর গুরুত্ব দেয়া হয়, যেখানে ব্যক্তি তার ইচ্ছা অনুযায়ী ধর্ম, মতপ্রকাশ, এবং জীবনের অন্যান্য দিকগুলোতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।


ইসলাম: ইসলামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ইসলামী বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ইসলাম ধর্ম ও নৈতিকতার উপর ভিত্তি করে মানুষের জীবন পরিচালিত হয়, এবং তা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ।


৪.


সুতরাং ইসলামিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলা নিজেরাই আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে বা তাদের নিজেদের পরিচয় এবং অবস্থান নিয়ে দ্বিধায় ভোগে। না তারা হতে পারে ইসলামিক না গণতান্ত্রিক।  ইসলামের আইনজ্ঞ ও অভিজ্ঞ আলেম সমাজ গণতন্ত্রকে সেইভাবে সাপোর্ট করে না পারতপক্ষে বাতিলই করে দেয়। আবার গণতন্ত্রের পুরোধা ব্যক্তিত্বরা ও সুশীল সমাজের মানুষেরা ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোকে ওইভাবে গ্রহণ করেনা। সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। তাইতো দেখা যায় জামাতে ইসলামের মত রাজনৈতিক দলগুলার সাপোর্টার গোষ্ঠী বেশি হলেও রাজনৈতিক মাঠে তারা কখনোই সফল হয়নি, হবেও না। হয়তো মাঠ গরম রাখতে পারে। তাদের কিন্তু দিনশেষে লাভের ধন বিফলেই যাই। 


৫.


ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বিজেপি হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শকে সহজেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পেরেছে, কারণ হিন্দু ধর্মে শাসনব্যবস্থার কোনও নির্দিষ্ট কাঠামো না থাকায় বিজেপির জন্য একটি ফাঁকা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তারা জনসমর্থন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি সুদৃঢ় করতে পেরেছে।


অন্যদিকে, বাংলাদেশে জামাতের মতো ইসলামিক দলগুলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে ইসলামিক শাসনব্যবস্থার মৌলিক দ্বন্দ্বের কারণে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ইসলাম গণতন্ত্রকে আল্লাহর শাসনের পরিপন্থী হিসেবে দেখে, যেখানে আল্লাহই সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন। এই কারণে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সরাসরি সমর্থন আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের চিন্তাধারা মূলত ইসলামিক শাসনব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠলেও, গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারেনি।বর্তমান বাস্তবতায় ধর্মভিত্তিক দলগুলোর পক্ষে সফল হওয়া কঠিন হবে বলে আমি মনে করি।

No comments:

Post a Comment

গণতন্ত্র কেন মতাদর্শকে হার মানায়

পৃথিবীতে আসলে political correctness বলে কোনো চূড়ান্ত বিষয় নেই। অর্থাৎ, ডেমোক্রেসিতে কোনো রাজনৈতিক ideology ই শতভাগ সঠিক নয়।  যদি কেউ দাব...