এই উত্তর আধুনিক ও লিবারেল যুগে এসে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা ইতিবাচক কার্যকর হবে না। কারণ কিছু নিষিদ্ধ করা মানে মানুষের মধ্যে সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো, এবং মানুষ তখন সেই বিষয় নিয়ে নিজস্ব তথ্য ও গল্প তৈরি করে। তথ্যের ফ্যাক্টরি এখন মানুষের হাতে সে নিজেই তথ্যের উৎপাদক , অর্থাৎ যে কেউ নিজেই তথ্য তৈরি ও বিতরণ করতে পারে, সেটা মিথ্যা, গুজব, নিকৃষ্ট বা অবৈধ হলেও। আওয়ামী লীগের মতো দল এসব ক্ষেত্রে আরও দক্ষ। এই যুগে এসে জনবান্ধব স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট নীতিতে বিশ্বাসী দলগুলোর বিরুদ্ধে এই পদ্ধতি কার্যকর হবে না, আমার মতে। কারণ এই দলগুলোর একটা হিউজ পরিমাণ জন-সাপোর্ট রয়েছে অর্থাৎ জনগণ এদেরকে সাপোর্ট করে এবং এই জনগণ জেনে বুঝেই সাপোর্ট করে, এই জনগণ জানে তাদের ভালবাসার দল ফ্যাসিস্ট, স্বৈরাচারী ও জুলুমবাজ।
কারণ মানুষ যেকোনো নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি পার্ভার্টেডলি আকর্ষণ অনুভব করে। আপনি চাইলেও মানুষের এই মনস্তত্ত্বকে বাইপাস করতে পারবেন না। মানুষ অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, এবং নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবে—হয় আজ, না হলে কাল। এটি মানুষের স্বভাব, এবং ইতিহাসও তাই বলে। বাংলার ইতিহাসে স্বাধীনতার আগে ও পরে আওয়ামী লীগের ইতিহাস জানলে, তাদের নেতা-কর্মীদের মাঠে সবসময় শক্তি প্রদর্শনে এগিয়ে থাকার বিষয়টি লক্ষ্য করবেন। সুতরাং, আওয়ামী লীগের মতো দল নিষিদ্ধ হলে তারা আরও সক্রিয় হবে না এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। তাই আওয়ামী লীগের মতো দলকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে, তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে পরাজিত করতে হবে।
[দুই]
রাজনীতিতে নিষিদ্ধ বলে কিছু নেই। রাজনীতিই মূলত উত্তর আধুনিক যুগের আবিষ্কার, তাই এই উদারনৈতিক রাজনীতির যুগে আপনি কোনো দলকে নিষিদ্ধ করে মানুষের চোখের আড়ালে রাখতে পারবেন না। এর প্রমাণ শিবির ও জামাত। তারা অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু ফিরে এসেছে, এবং তাদের ফিরে আসা ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। মানুষ এটিকে ইতিবাচকভাবেই নিয়েছে। কারণ এই যুগে মানুষ নীতি-নৈতিকতা নিয়ে বাছবিচার করে না। বরং মানুষ তার মনের সন্তুষ্টির পেছনে ছুটে, এবং এই সাইকোলজিক্যাল সন্তুষ্টির জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। আওয়ামী ছাত্রলীগের মতো দলের আনুগত্যশীল সমর্থকরা এই সাইকোলজিক্যাল সন্তুষ্টি পায় আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, এবং এই বাস্তবতাকে আপনি ট্যাকল করবেন কীভাবে?
বর্তমানে ইউরোপে দেখা যাচ্ছে, নিউ নাজি ও ফার রাইট ভাবধারার অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা নতুন নতুন রাজনৈতিক দল খুলে সেই হিটলারিও আদর্শকে নতুনভাবে ইউরোপে প্রচলন ঘটাচ্ছে। তারা হিটলারের ভাবাদর্শের নতুন প্রজন্ম হিসেবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পলিটিক্যালি রিকনশাইল করছে এবং রাজনীতিতে সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। অথচ তারা ৪০-৫০ বছর ধরে নিষিদ্ধ ছিল। সুতরাং আওয়ামী লীগ যে ফিরে আসবে না এইটা আপনি নিশ্চয়তা দিতে পারেন না? দেখেন আওয়ামী লীগ ফিরে আসুক এইটা এত কনসার্ন বা ভয়ংকর বিষয় না, ভয়ংকর বিষয় হলো ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ আবারো ফিরে আসা।
[তিন]
নিষিদ্ধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আমাদের ন্যায়বিচারের রাজনীতিতে আসতে হবে। যে দল বা গ্রুপ অন্যায় করেছে, যারা ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা চালু করেছিল, তাদের বিচার করতে হবে। যারা অন্যায়ের জন্য দায়ী, তাদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। তাই কোনো স্বৈরতান্ত্রিক ফ্যাসিস্টিক ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গের বিচার না কইরাই দলকে নিষিদ্ধ করা বোকামি হবে। ওই দলের যেসব সদস্য অন্যায়ের সাথে জড়িত, তাদেরকে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দিতে হবে, কিন্তু পুরো দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত হবে না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, আপনি শেখ মুজিবকে আলাদা করতে পারবেন না। আওয়ামী লীগ মুজিবের নামেই রাজনীতি করবে, এবং মানুষ তাদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করবেই। শেখ মুজিবের অবদান ও গুরুত্ব আপনি কখনোই বাংলাদেশ থেকে মুছে দিতে পারবেন না। সুতরাং, একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা অসম্ভব। এবং রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার যে রাজনীতি সেইটা আসলে কোন নীতি না, এইটা হল জনগণকে সাময়িক একটা সুখ দেওয়া।

No comments:
Post a Comment