[ এক ]
আপনি সমাজে নিজের অস্তিত্বকে কিভাবে জানান দেবেন? সমাজে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বা রেলেভেন্সি প্রকাশ করবেন কিভাবে? এর জন্য আমাদের সমাজের প্রয়োজন, বা ব্যক্তির প্রয়োজনে আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে। যদি আপনি শুধু নিজের কাজই করে যান, শুধু বই পড়েন এবং জ্ঞান অর্জন করেন, তাহলে এসব আপনাকে সমাজে প্রাসঙ্গিক করে তুলবে না। আপনি নিজেকে সমাজের একজন ভাবতে পারবেন না, এবং সমাজকে আপনার ভাবতে পারবেন না। সুতরাং, সমাজের একজন ভাবার জন্য, আপনাকে বুঝতে হবে যে আপনি সমাজের অংশ। এজন্য প্রয়োজন হলো, সমাজের যেকোনো প্রয়োজনে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই আপনি সমাজের অংশ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিতে পারবেন।
সমাজে অস্তিত্বকে বোঝার জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: সমাজের প্রত্যেকে আপনাকে তাদের মনে করবে, এবং আপনিও সমাজকে নিজের মতোই মনে করবেন। সমাজের কোনো প্রয়োজনে আমি এগিয়ে যাব, অর্থাৎ সমাজের অংশ হিসাবে আপনার উপস্থিতি জানান দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এখন এই প্রয়োজনটা কিভাবে বুঝব? এটি খুবই সাধারণ: যেকোনো ব্যক্তির বিপদে আপনাকে সাহায্য করতে হবে, সমাজের প্রয়োজনের প্রতি আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে। বিপদে আপনাকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, এবং সমাজের কেউ আপনাকে বিপদে ডাকলে, সেই অনুভূতি তাদের মধ্যে জাগাতে হবে। যে হ্যাঁ, তাদের বিপদে আপনাকে ডাকলে আপনি তাদের হয়ে মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকবেন; এটাই পাশে থাকা বা কোন বিপর্যয়কে আপনার বিপর্যয় হিসেবে ধরে নেওয়া।
[ দুই ]
আমি ওপরের কথাগুলো এজন্যই বললাম, গতকাল থেকে আমি এমন তিনটা কাজ করেছি যে তিনটে কাজ করার ফলে আমার মনে হয়েছে আমি এই সমাজেরই অংশ। আমি যে এই সমাজের অংশ, এই অনুভূতি আমার মধ্যে এসেছে ওই তিনটা কাজ করার মাধ্যমে ।
আমি যেটা বলছিলাম, আমি গত দিন থেকে মোটামুটি তিনটি সহায়তা সমাজকে দিতে পেরেছি, তখন থেকেই আমার মনে হয়েছে আমি সমাজের অংশ হিসেবে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করছি। এবং এই তিনটা সহায়তা আমার কাছে মনে হয়েছে খুবই সিগনিক্যান্টলি আমার মধ্যে সামাজিক চেতনা জাগাতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গতকাল, হাইওয়েতে হোন্ডা চালানোর সময় আমার সামনেই একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ওই হুন্ডাইতে তিনজন ছিলেন, একজন বৃদ্ধও। বৃদ্ধ গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হয়। রাস্তায় আমার হোন্ডা থামিয়ে ওই ব্যক্তিকে পাশের ডাক্তারখানায় আমি সহ আরো আমার ২-৩ জন সাথী মিলে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে গেলাম এবং ডাক্তারের চিকিৎসার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমার দুইজন সাথী সেখানে উপস্থিত থেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলাম।
দেখেন, তখন আমার মনে হচ্ছিল যে হ্যাঁ, আমি সমাজের অংশ হিসেবে নিজের এই সময় বা উপস্থিতি সমাজকে দিচ্ছি, সমাজ আমার এই উপস্থিতি ডিজার্ভ করে। ওই মুহূর্তে সেটা ভালো লাগার চেয়ে আমার ভেতরে যে অনুভূতি বেশি জাগ্রত হচ্ছিল তা হচ্ছে আমার সামাজিক অস্তিত্ব। আমার সামাজিক অস্তিত্বের অনুভূতি আমি অন্তরে ফিল করতে পারছিলাম । মনে হচ্ছিল, আমি সমাজের জন্যই। যেমন আজ রক্ত দেওয়ার সময়ও আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে, আমার রক্ত প্রদান সমাজের জন্যই আমার পক্ষ থেকে সমাজকে নিজের মনে করা ও আমার সামাজিক অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজন ।
এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আমাকে সমাজের অন্যতম অংশীদার হিসেবে নিজের চিন্তায় নিয়ে আসতে পেরেছে। নিজেকে সমাজেরই অনুভব করেছি, এই চিন্তাটা আমার আগে কখনোই আসেনি। এই চিন্তা গুলো এসেছে আমার এই কাজগুলা করার পর থেকেই।
সুতরাং, সমাজের বিপদে এগিয়ে যাওয়া এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া অবশ্যই আপনার সামাজিক অস্তিত্বের জন্য আপনাকে করতে হবে। দেখেন, সমাজ আপনার জন্যই এবং এই সমাজ আপনি তৈরি করেছেন; আপনি যখন আপনারা হয়ে উঠেছেন, তখনই সমাজ। সুতরাং আপনার প্রতিক্রিয়া সমাজের চলমানতা নির্দেশ করে। আপনার সামাজিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাবে আপনার উপকার যখন সমাজ গ্রহণ করবে। যখন আপনি নিজেকে সমাজের জন্য যেকোনো কাজ করতে প্রস্তুত থাকবেন।
[ তিন ]
আমি একটা বিষয় খেয়াল করেছি, আমাদের উঠতি জেনারেশন ফিজিক্যাল এনগেজের চেয়েও সোশ্যাল মিডিয়ার এঙ্গেজকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। হয়তো এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাইবার এঙ্গেজে গুরুত্ব রাখলেও, আমার কাছে মনে হয় সোশ্যাল এঙ্গেজের গুরুত্বটা অনেক বেশি।
এই জেনারেশন ব্যাপকভাবে সামাজিক হয়ে উঠতে পারেনি। তাদের মূল অভাব হচ্ছে পার্টিসিপেশন বা সামাজিক অংশগ্রহণ । এই পার্টিসিপেশনের অভাবটা সমাজ ব্যবস্থায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেখেন, সমাজ এই অভাব অনুভব করছে এবং আমরা সামষ্টিগতভাবে অনুভব করছি যে আমাদের নিউ জেনারেশনকে আমরা নিজেদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। নিউ জেনারেশন এখনো সমাজের হয়ে উঠতে পারেনি।
এই জেনারেশন এখনো আমিতেই আবদ্ধ রয়েছে। তাদের এই আমিত্ব ততদিন থাকবে যতদিন না তারা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারবে। আমাদের মুরুব্বীদেরও কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তারা নিউ জেনারেশনের কর্মকাণ্ডকে, তাদের আধুনিক চিন্তাভাবনা ও চেতনাকে তেমনভাবে স্বীকৃতি দিতে চাচ্ছেন না; ফলে নতুন জেনারেশন মুরুব্বীদের স্বীকৃতি ছাড়াই যেকোনো কাজ করে ফেলছে এবং মুরুব্বীদের তারা ধার ধারছেন না।
এই মুরুব্বীরাই সমাজকে চালাচ্ছেন। মূলত সমাজের মূল্যবোধ, প্রথা, অনুভূতি, চাহিদা—সমস্ত কিছুই এ মুরুব্বিরা নির্ধারণ করছেন। কিন্তু নিউ জেনারেশন মূলত এইসব থেকে অনেক দূরে। নতুন জেনারেশন দেখছে তাদের চিন্তা অনুভূতি চাহিদা মুরুব্বীরা সেইভাবে ফিলাপ করতে পারছে না। ফলে তারা নিজেদেরকে সমাজের অংশ মনে করছে না।
আশঙ্কার বিষয় হলো, আমাদের নিউ জেনারেশন একটি প্যারালাল ব্যবস্থা নিজেদের তরুণদের মধ্যেই গঠন করে ফেলেছে। এটি আমাদের মুরুব্বীদের গতানুগতিক সমাজের মতো নয়। এই প্যারালাল সোশ্যাল সিস্টেমে তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ, প্রথা, চিন্তা, অনুভূতি, চেতনা এবং মনুষ্যত্বের ধারণা আমাদের মুরুব্বিদের থেকে ভিন্ন। এবং এই প্যারারাল সোশ্যাল সিস্টেমটা গঠন হয় মূলত সাইবার বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এই প্যারালাল ব্যবস্থা মূলত সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি, সিনেমা, নাটক এবং সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে; এবং হাল আমলে টিক টক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া এতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।
দেখেন, এই প্যারালাল এবং আমাদের গতানুগতিক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে যে সংঘর্ষ, সেটা এখনো তেমন ব্যাপক হয়ে ওঠেনি; তবে আমার কাছে মনে হয়, সময়ের সাথে সাথে এটি আরও বৃদ্ধি পাবে।
[ চার ]
দেখেন, এখন সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে আপনি দেখবেন, ফেইসবুক বা ইউটিউবে বিভিন্ন আলেম-ওলামা ও হুজুরদের নিয়ে আমাদের নিউ জেনারেশন মিম বানাতে দ্বিধাবোধ করে না। এই মিম এখন একটা ইউনিভার্সাল ভাষা প্রকাশ মাধ্যম । যদিও বিষয়টা খুবই মজার, কিন্তু এর ভাষা প্রকাশ খুবই তীব্র। ফোনে একটি ছোট্ট বিষয়কে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ব্যাপক অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। আসলে, মিম, ব্যঙ্গাত্মক বা কৌতুক করা হুজুরদের নিয়ে—এটা কিন্তু ১০-১৫ বছর আগেও চিন্তা করা যেত না, এমনকি পাঁচ থেকে সাত বছর আগে ও না। দেখেন আমাদের সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে শুধু যে হুজুরদের নিয়ে মিম বানানো হয় তা কিন্তু না। যেই কোন ঐতিহাসিক সম্মানিত ব্যক্তি, বিখ্যাত ব্যক্তি, সমাজের প্রভাবশালী যে কোন ব্যক্তি এবং বর্তমানে জীবিত খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়েও এই মিম বানানো হয়। মিম হওয়ার হাত থেকে আসলে কেউ রক্ষা পায় না।
সুতরাং, এই সমাজের প্রত্যেক প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরকে নিয়ে মিম কৌতুক ও ব্যঙ্গ করে হাসি-ঠাট্টা করা—এটা এখন কেন হচ্ছে, আমার কাছে মনে হয় এর অন্যতম কারণ হলো, মূলত এই দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা ব্যাপক গ্যাপ তৈরি হওয়ার কারণে এবং এই দুই জেনারেশন আমাদের মুরুব্বী জেনারেশন এবং নিউ জেনারেশন যাদেরকে জেনজিও বলা হয়। আমাদের নিউ জেনারেশনের প্যারালাল সোশ্যাল সিস্টেম, যেইখানে তাদের নিজস্ব ভাষা প্রকাশ এবং নিজেদের চিন্তা ভাবনার সম্মিলন ঘটেছে, ওইখানে আমরা গতানুগতিক সমাজ ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলোর অনুপস্থিতি দেখতে পাই।
আমাদের মুরুব্বী জেনারেশন যেমন গতানুগতিক সমাজের ইনফ্লুয়েন্সে একটা প্রভাব রাখে, ঠিক তেমনই আমাদের নিউ জেনারেশন মুরুব্বীদের সমাজ ব্যবস্থাকে অগ্রাহ্য করে নেট দুনিয়ায় তাদের নিজস্ব একটা উপস্থিতি বা আধিপত্য তৈরি করেছে। এবং প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার যেকোনো অনিয়ম, যেকোনো অব্যবস্থাপনা বা অসঙ্গতিকে তারা তাদের মাধ্যমে প্রকাশ করছে।
এই বিষয়ে আরো ব্যাপকভাবে বলা যাবে এবং আমাদের এ নিয়ে এখনো ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনা করা উচিত। কারণ, আমাদের নিউ জেনারেশন এবং মুরুব্বী জেনারেশনের মধ্যে যে পার্থক্য, এই পার্থক্যটা যদি এখনই কমিয়ে আনতে না পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে অথবা ১০ থেকে ১৫ বছর পরেই এই দুই জেনারেশনের মধ্যে একটা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের প্রকাশ আমরা দেখতে পাবো। এই গ্যাপ কমাতে উভয় প্রজন্মের মধ্যে সংলাপ ও বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সামাজিক সমন্বয় এবং মূল্যবোধের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

No comments:
Post a Comment