জুলাই-আগস্টের পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক, মতাদর্শিক ক্যাচালের কারণ হিসেবে বলা যায়, এটি বাংলাদেশকে বৈচিত্র্যহীন ও রৈখিক সমাজ গড়ে তোলার কিছু গোষ্ঠী সমূহের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়ার প্রচেষ্টা। তারা প্রত্যেকে ভিন্নতার গুরুত্বকে উপেক্ষা করে একমাত্রিক আদর্শ চাপিয়ে দিতে চায়। তবে সমাজের প্রকৃত শক্তি তার বৈচিত্র্যে নিহিত, এবং এই মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব শিক্ষিত সমাজের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে। এই রাজনৈতিক ক্যাচাল কি পজিটিভ নাকি নেগেটিভ? এক দিক থেকে এটি নেতিবাচক মনে হতে পারে, কারণ এটি সমাজে বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। তবে, এটি ইতিবাচক দিকও থাকতে পারে, কারণ এর মাধ্যমে সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং ভিন্নতা আরও প্রকাশ্যে আসছে, যা শেষ পর্যন্ত সমালোচনার মাধ্যমে সমাজের উন্নতির পথ খুলে দিতে পারে।
এখন এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আমাদের চিন্তার সরলীকরণের মাধ্যমে সমাজকে বৈচিত্র্যহীন, রৈখিক সমাজ গড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সমাজ প্রকৃতপক্ষে বৈচিত্র্য ভালোবাসে এবং ভিন্নতাকে স্থান দেয়। সমাজ ভিন্নতার মধ্য দিয়েই চলমান থাকে। যদি সমাজে ভিন্নতা ও তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া না থাকতো, তবে সেটি আর সমাজই থাকত না। ভিন্নতা না থাকলে, সেই সমাজের কোনো আসল অস্তিত্বই নেই। বৈচিত্র্যহীন সমাজ একটি ইউটোপিয়ান চিন্তা, যার কোনো বাস্তব ইতিহাস নেই। আসলে, বৈচিত্র্যই সমাজের প্রাণশক্তি। এই বৈচিত্র্যহীনতার মধ্যে সবকিছু যেমন বৈষম্য, অসমতা, শোষণ, শাসন, ভালো-মন্দ—সবই মিলে সমাজ গঠিত হয়। এই বৈচিত্র্যই সমাজকে আরও জটিল করে তোলে এবং সমাজের গভীরে থাকা বিভিন্ন স্তরের সমস্যাগুলোকে উন্মোচিত করে। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো সময়েই আপনি বৈষম্যহীন সমাজ দেখতে পাবেন না, কখনোই না। এই বৈচিত্র কোনো নেতিবাচক প্রক্রিয়া নয়; বরং এর মাধ্যমেই সমাজের সমালোচনা এবং বিকাশ সম্ভব হয়। সমাজের ভেতরে থাকা এই বিপরীতমুখী শক্তির বিনিময়ই তাকে সমৃদ্ধ করে এবং আরো গভীরভাবে ক্রিটিকাল ও সংকটময় করে তোলে। এখন কেউ যদি দাবি করে যে, কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ, তত্ত্ব বা ব্যক্তির দর্শন দ্বারা সমাজকে পুরোপুরি বৈষম্যহীন ও সাম্যের আদর্শে নিয়ে আসা সম্ভব, তবে তা নিছকই ছলনা। ইতিহাসের আলোকে এ ধরনের চিন্তা বা দর্শনকে বড় প্রতারণা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বৈচিত্র্য ও সংঘাতময়তার উপস্থিতি ছাড়া সমাজ কেবল একটি নিষ্ক্রিয়, অস্তিত্বহীন সত্তায় পরিণত হবে।

No comments:
Post a Comment