রাষ্ট্র আমার স্রষ্টা নয়, আমি রাষ্ট্রের পূজক নই। রাষ্ট্র সেবা প্রদান করবে, আর আমি তা গ্রহণ করব। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আমার জন্য, আমার অস্তিত্ব রাষ্ট্রের জন্য নয়।
জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের মূল সমস্যা হলো, এই রাষ্ট্রে মুচি থেকে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত সবাইকে রাষ্ট্রের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগী হতে বাধ্য করে। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র মূলত এটেনশন সিকার। নাগরিকদের ভাবতে শেখায়, কারা রাষ্ট্রের বন্ধু, কারা রাষ্ট্রের শত্রু। এর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র বিভাজনের ধ্বংসাত্মক খেলায় মত্ত থাকে যেখানে সে নিজের নাগরিককেই শত্রু হিসেবে পরিগণিত করে। এভাবে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র সব সময় সক্রিয় (active) থাকতে চায়। নিজেদের একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে তুলে ধরে এবং আশপাশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে প্রচুর নেতিবাচক শক্তি (negative forces) এই "জীবন্ত সত্তা"কে ধ্বংস করতে কাজ করছে। এই শক্তিগুলোকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের ভাষায় "রাষ্ট্রবিরোধী" বা "দেশদ্রোহী" বলে চিহ্নিত করা হয়।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী ও সংস্থাগুলো(Agency) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত থাকে। তবুও যদি নাগরিকদের সারাক্ষণ রাষ্ট্রবিরোধিতা বা দেশদ্রোহিতার দায় নিতে হয়, তবে সে রাষ্ট্রকে সফল বলা যায় না। সফল রাষ্ট্র সেই, যেখানে নাগরিক নিশ্চিন্তে তাদের অধিকার ও সুবিধা ভোগ করে, আর নিরাপত্তার দায় রাষ্ট্র নিজেই পালন করে।
রাষ্ট্র কোনো জীবন্ত সত্তা (living entity) নয়। এটি নাগরিক সেবার জন্য তৈরি এক কৃত্রিম ব্যবস্থা( ম্যান মেড)। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকদের সেবা দেওয়া, তাদের কাছ থেকে সেবা দাবি করা নয়। তাই রাষ্ট্র নিয়ে অযথা আবেগ বা উচ্ছ্বাস দেখানো অনর্থক।
তাই আমাদের বুঝতে হবে, একটি রাষ্ট্র জীবন্ত সত্তা নয়। এর কোনো প্রাণ নেই। এই রাষ্ট্র মূলত নাগরিকদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নাগরিকদের রাষ্ট্রকে সেবা করার জন্য নয়। রাষ্ট্র নিয়ে অযথা মাতামাতি বা আবেগপ্রবণ হওয়ার কিছু নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের জন্য সেবা নিশ্চিত করা, আর নাগরিকদের অধিকার সেটি গ্রহণ করা এবং শান্তিতে বসবাস করা।
রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই রাষ্ট্রকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তারা জনগণকে "রাষ্ট্রের প্রজা"তে পরিণত করে এবং রাষ্ট্রকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন এটি স্রষ্টার মতো সবাইকে আগলে রাখে। এভাবে রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে তাদের আধিপত্যবাদী রাজনীতিকে শক্তিশালী করে, আর জনগণ শোষণের শিকার হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজ অপরিহার্য হলেও রাষ্ট্র অপরিহার্য নয়। সমাজ স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে, এটি মানবজীবনের স্বাভাবিক উপাদান। কিন্তু রাষ্ট্র একটি কৃত্রিম সৃষ্টি। সুতরাং রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা সমাজের চেয়ে বেশি হতে পারে না। সমাজই মানুষের মৌলিক চাহিদা ও জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্র তার জন্য একটি মাধ্যম মাত্র।
এই উপলব্ধি আমাদের রাষ্ট্র এবং রাজনীতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। তাই আমাদের উচিত বাংলাদেশকে অতি-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত না করা। বরং এটিকে একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করা, যেখানে প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিক নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে তাদের প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে পারে।
বাংলাদেশ যেন নাগরিকদের "প্রজা" হিসেবে গণ্য করা থেকে বিরত থাকে এবং কখনোই নিজেকে "স্রষ্টা" বা সর্বময় কর্তৃপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন না করে।
তেমনিভাবে, রাজনীতিবিদদেরও উচিত রাষ্ট্রকে ক্ষমতার জটিল ও কূটকৌশলপূর্ণ খেলায় ব্যবহারের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানো। একমাত্র এই দৃষ্টিভঙ্গিই একটি সেবাধর্মী, কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে পারে।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment