মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়: আধুনিক সমাজের বিবর্তন ও উন্নয়নের পথ

 








(ক) 

আধুনিক যুগে কোনো নির্ভেজাল বা পিওর দর্শন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রতিটি দর্শন অন্য দর্শনের সঙ্গে মোকাবিলা ও মেলবন্ধনের মাধ্যমে নতুন আইডিয়ার জন্ম দেয়। এটি অনেকটা ডায়ালেক্টিক্সের মতো, যেখানে থিসিস ও এন্টি-থিসিসের সংঘাতের মাধ্যমে নতুন একটি থিসিসের উদ্ভব ঘটে। বর্তমান সমাজে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব বা ফাটাফাটি এই প্রক্রিয়ারই অংশ, যা নতুন ধারার জন্ম দেয়। এই দ্বন্দ্বকে এড়ানো নয়, বরং তা সমাজে চলতে থাকা উচিত, কারণ এর মাধ্যমেই নতুন একটি দর্শনের প্রতিষ্ঠা হয়।


(খ) 

গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, লিবারালিজম, এমনকি ইসলামী সমাজতন্ত্রের মতো মতাদর্শগুলো আধুনিক সমাজে একসঙ্গে মেলবন্ধিত হচ্ছে। সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি গণতন্ত্র, লিবারালিজম ও অন্যান্য মতাদর্শের উপস্থিতি, একইভাবে কনজারভেটিজমের মধ্যেও দেখা যায়। বর্তমান পৃথিবী কোনো একক দর্শনকে পুরোপুরি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করে না, বরং প্রতিটি দর্শনের মূল পয়েন্টগুলো থেকে সেরা অংশগুলো আত্মস্থ করে। আপনি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র বা ইসলাম দিয়ে সমাজ পরিচালনা করতে চাইলে, সেটিকে পিওরভাবে গ্রহণ করা কঠিন হবে; কারণ সমাজ একাধিক মতবাদের সংমিশ্রণকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়। তাই, কোনো একক দর্শন দ্বারা সমাজকে পরিবর্তন করা বা পরিচালনা করা আধুনিক সমাজে কার্যকর হবে না।


(গ) 

যাঁরা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করেন, তারা অনেক সময় এই দর্শন সম্পর্কে অজ্ঞ হলেও, অজান্তেই বিভিন্ন দর্শনের ভালো দিকগুলো গ্রহণ করেন। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থনৈতিক উন্নয়নই প্রাধান্য পায়, এবং এই কাজে পেশাদার ব্যুরোক্র্যাটরা মূল ভূমিকা পালন করেন। দর্শনের জায়গায় অর্থনৈতিক অর্জনকেই উন্নতির মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে, দর্শন ও চিন্তাধারার প্রতি অমনোযোগী হয়ে তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় সফলতার অন্য মাপকাঠি স্থাপন করেন। তবে তাদের মধ্যে "আমরাই সব জানি" এই প্রবণতা থেকে মতাদর্শিক বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়, যা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করতে পারে।


(ঘ)

আধুনিক সমাজে দর্শনগুলোর মধ্যে অ্যাসিমিলেশন ও সংমিশ্রণ একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া। একেকটি দর্শন পরস্পরকে প্রভাবিত করছে, যার ফলে পিওর দর্শন খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিচালনায় যারা নেতৃত্ব দেন, তারা অনেক সময় দর্শনের মৌলিকতা বুঝতে না পারলেও, তাদের কার্যক্রমে দর্শনের বিভিন্ন ভালো দিক অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে দেখা যায় যে, সমাজে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব বা ফাটাফাটির অবসান ঘটানো সম্ভব নয়, বরং এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এই দ্বন্দ্বের মাধ্যমেই নতুন ধারণা ও সমাজের বিবর্তন ঘটে। আমাদের উচিত, এই দ্বন্দ্বকে সম্মান জানিয়ে, বিভিন্ন মতাদর্শের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করা, যাতে সমাজের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন সম্ভব হয়।

সুতরাং, বর্তমান দার্শনিক পরিবেশে আমাদের একটি মুক্ত ও সমন্বিত চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন, যা সমাজের উন্নয়ন ও সংস্কৃতিকে সামনের দিকে নিয়ে যাবে। সমকালীন সংকটকে অতিক্রম করার জন্য শুধুমাত্র একক দর্শনের পথে হাঁটার বদলে, বিভিন্ন দর্শনের সমন্বয়ে একটি বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনই আমাদের লক্ষ্য হতে পারে।

No comments:

Post a Comment

গণতন্ত্র কেন মতাদর্শকে হার মানায়

পৃথিবীতে আসলে political correctness বলে কোনো চূড়ান্ত বিষয় নেই। অর্থাৎ, ডেমোক্রেসিতে কোনো রাজনৈতিক ideology ই শতভাগ সঠিক নয়।  যদি কেউ দাব...