[এক]
(প্রাসঙ্গিকতার ধারণা ও প্রজন্মের ফাঁক)
সমাজের প্রাসঙ্গিকতা কীভাবে একজন ব্যক্তির অস্তিত্বের মূল চেতনা হয়ে উঠতে পারে এবং কীভাবে তা জাগ্রত হবে, তা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি। বর্তমান সমাজে প্রজন্মের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে। এর এক প্রান্তে আছেন মুরব্বিরা, যারা গতানুগতিক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনকে সহজভাবে গ্রহণ করতে চান না। অন্যদিকে, নতুন প্রজন্মের চিন্তা, চেতনা, এবং চাহিদাকে তারা সঠিকভাবে স্বীকৃতি দিতে পারছেন না বা তাদের বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে, নতুন প্রজন্ম তাদের মধ্যে একটি প্যারালাল সিস্টেম গড়ে তুলেছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব।
সোশ্যাল মিডিয়া—যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব—এবং টিভি নাটক ও সিরিয়াল নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নতুন ভাষা ও চিন্তার প্রক্রিয়া তৈরি করেছে, যা পুরনো প্রজন্মের থেকে ভিন্ন। এই নতুন সাংস্কৃতিক প্রকাশকে আমরা মিম বা অন্য কোন নামে ডাকতে পারি।
[দুই]
(সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ)
একজন ব্যক্তির সামাজিক প্রাসঙ্গিকতার ধারণাকে বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়। এখানে চারটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হলো:
(ক) ইমেল দুর্খেইমের সামাজিক সংহতি(social solidarity theory) তত্ত্ব:
ইমেল দুর্খেইম তার সোশ্যাল সলিডারিটি তত্ত্বে দুই প্রকারের সংহতির কথা উল্লেখ করেছেন—মেকানিক্যাল সলিডারিটি এবং অর্গানিক সলিডারিটি। মেকানিক্যাল সলিডারিটি সমাজের ঐতিহ্য, প্রথা এবং চিরাচরিত মূল্যবোধকে ধরে রাখতে গুরুত্ব দেয়, যেখানে একজন ব্যক্তি এসব মান্য করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, অর্গানিক সলিডারিটিতে ব্যক্তি তার বৈচিত্র্যময় ও বিশেষ দক্ষতার মাধ্যমে সমাজে ভূমিকা রাখে এবং সমাজ তাকে স্বীকৃতি দেয়। দুর্খেইম সমাজকে একটি জীবন্ত অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি একেকটি অংশ হিসেবে কাজ করে। সামাজিক ভূমিকা ও সংহতি বজায় রাখার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সমাজে নিজের প্রাসঙ্গিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
(খ) ম্যাক্স ওয়েবারের সামাজিক কর্ম (social action theory)তত্ত্ব:
ম্যাক্স ওয়েবারের সোশ্যাল অ্যাকশন তত্ত্বে ব্যক্তির প্রাসঙ্গিকতা নির্ভর করে তার সামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপর। একজন ব্যক্তি তখনই সমাজে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যখন তার কর্মকাণ্ড সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিদের দ্বারা গ্রহণযোগ্য হয়। এই কর্মকাণ্ড হতে পারে আবেগিক, নৈতিক বা পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে। সমাজের জন্য কাজ করলে এবং মানুষ তার কাজকে মেনে নিলে সেই ব্যক্তি সমাজে প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করে।
(গ) জর্জ সিমেলের দ্য স্ট্রেঞ্জার(stranger theory) তত্ত্ব:
জর্জ সিমেলের তত্ত্বে ব্যক্তি সমাজের অংশ হলেও তার ব্যক্তিত্বের কারণে আলাদা হয়ে ওঠে। সিমেল এটাকে "দ্য স্ট্রেঞ্জার" বলে অভিহিত করেন, যেখানে ব্যক্তি সমাজে থেকেও ভিন্নতার মাধ্যমে নিজেকে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। তিনি যখন সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের ব্যক্তিত্বকে সংযুক্ত করতে পারেন, তখনই তার সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা তৈরি হয়।
(ঘ) এরিক এরিকসনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস (identity crisis theory)তত্ত্ব:
এরিক এরিকসনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যায়। ব্যক্তি যখন এই সংকটগুলো মোকাবিলা করে এবং সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমিকা রাখে, তখন সে সমাজে নিজের আলাদা আইডেন্টিটি তৈরি করে। এর মাধ্যমে সে সামাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
[তিন]
( ভবিষ্যৎ আলোচনার প্রেক্ষাপট)
সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা কোনো একক ব্যক্তির নির্ধারিত বিষয় নয়; এটি সমাজের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবদান এবং তার প্রতি সমাজের স্বীকৃতির সমন্বয়। প্রজন্মের ফাঁক, প্রযুক্তির প্রভাব এবং নতুন ভাষা ও সংস্কৃতির উদ্ভব—সবকিছু মিলে সমাজের কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে, যা আমাদের নতুন প্রজন্মের চিন্তা ও চেতনায় প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে, সামাজিক সংহতি এবং প্রাসঙ্গিকতার মূল ধারণা আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ ব্যক্তি তখনই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, যখন সে তার কর্মের মাধ্যমে সমাজের উন্নতিতে ভূমিকা রাখে।
অতএব, আমাদের উচিত প্রজন্মের এই ফাঁককে বোঝা এবং দুই প্রান্তের মধ্যে সেতু তৈরি করা, যাতে সমাজের সকল সদস্য পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংহতির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে। ব্যক্তির প্রাসঙ্গিকতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সে সমাজের কল্যাণে তার ভূমিকা স্বীকৃত ও সম্মানিত হয়। দুই প্রজন্মের এই পার্থক্য কে কিভাবে রিকনশীল করা যায় তা নিয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে এবং এই এই ভাবনা অবশ্যই দুই প্রজন্মের সম্মতির ভিত্তিতেই হতে হবে না হলে এই পার্থক্য আরো বেড়ে যাবে। এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আলোচনা ও একে অপরকে বোঝার মানসিকতা।

No comments:
Post a Comment