১.
বর্তমান প্রজন্ম কেন সমাজকে ঘৃণা করে বা মনে করে যে সমাজ কিংবা কমিউনিটি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং তাদের বিকাশ ও প্রকাশের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে? নতুন প্রজন্মের এই দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে গড়ে উঠল, এবং তাদের এই অভিযোগ কতটা যৌক্তিক বা গ্রহণযোগ্য?
মূলত, নতুন প্রজন্মের সমাজ বা কমিউনিটির প্রতি অভিযোগের অন্যতম কারণ হলো পৃথিবীর উদীয়মান নতুন ব্যবস্থায় প্রচলিত গতানুগতিক সমাজব্যবস্থার ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজব্যবস্থা, যা মূলত শহরকেন্দ্রিক। এই শহরকেন্দ্রিক চেতনা ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা মানুষের জীবনধারায় একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এই শহরকেন্দ্রিকতা সমাজের মানুষকে ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে, যা সমাজের চিরায়ত কার্যক্রম বা ফাংশন ও ভূমিকাকে অস্বীকার করছে। শহরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায় পারস্পরিক সম্পর্কের তুলনায় একক ব্যক্তির অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাগুলোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবার শহরকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তি হচ্ছে স্বৈরাচার। এখানে ব্যক্তিই মুখ্য হয়ে ওঠে—তার চিন্তা, ভালো লাগা, খারাপ লাগা, রুচি-অরুচি ইত্যাদির প্রতি আলাদা গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ফলস্বরূপ, ব্যক্তির চারপাশের পরিবেশ কিংবা পারস্পরিক মানুষের তুলনায় তার নিজস্ব অনুভূতিই অগ্রাধিকার পায়। শহুরে সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিই সর্বেসর্বা, এবং এই সমাজ ব্যক্তি-চেতনায় এমন এক মনোভাব গড়ে তোলে যেখানে নিজের চারপাশের মানুষের অনুভূতি বা চিন্তাকে এড়িয়ে চলতে শিখতে হয়। প্রযুক্তি, সামাজিক মাধ্যম, নাটক, সিনেমা ইত্যাদির মাধ্যমে শহরকেন্দ্রিক সমাজের যে চিত্র বা সাংস্কৃতিক আদর্শায়ন বা আইডিয়ালাইজেশন আমরা দেখতে পাই, তা মূলত এই ব্যবস্থার প্রচার ও প্রসার ঘটায়। ফলে, শহুরে সমাজকেই পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে আদর্শ অর্থাৎ শহরে সমাজকে আইডিয়াল সোসাইটি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এটি প্রমাণ করতে চাওয়া হয় যে শহুরে সমাজই শ্রেষ্ঠ, যেখানে ব্যক্তি, তার চিন্তা এবং অনুভূতিই মুখ্য, আর বাকি সবকিছু গৌণ। টিভি, সিনেমা, নাটক এবং নতুন প্রযুক্তি নির্ভর বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের কালচারাইজেশনের মাধ্যমে ব্যক্তি কেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। এর ফলে, এই নতুন সমাজব্যবস্থাকে আদর্শ বা আইডিয়াল সমাজব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
২.
এই চিন্তা ও অনুভূতিগুলো আমাদের নিউ জেনারেশন দ্রুত এডাপ্ট করে নিচ্ছে। এর ফলে তারা সমাজের কাঠামো, তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, এবং সমাজের ইউনিফর্মিটিকে ডিনাই করতে চায়। তাদের ধারণা, সমাজ একটি শৃঙ্খল, যা তাদের ব্যক্তিসত্তাকে বাঁধতে চায়। এই শৃঙ্খল তাদের স্বাধীনতা হরণ করে এবং তাদের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ, নিউ জেনারেশন সমাজকে তাদের সহযোগী হিসেবে না দেখে বরং একটি বন্ধন হিসেবে দেখে। তাদের মনে হয়, সমাজ তাদের বন্দী রাখতে চায়, যেন তারা সমাজের একটি কারাগারে আবদ্ধ কয়েদি।
৩.
এই কারণেই নতুন প্রজন্মের সমাজের প্রতি তাদের অসন্তোষ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থার বিশ্বব্যাপী বিস্তার এবং সেই সাথে শহুরে সমাজের চিন্তা-ভাবনা, যা টিভি, সিনেমা, নাটক ও সামাজিক মাধ্যমসমূহে প্রচারিত ও জনপ্রিয়কৃত হচ্ছে, একটি বিশেষ শহরকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোকে আদর্শ বা আইডিয়ালাইজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। এই কাঠামো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার উপর জোর দেয়, যেখানে সমাজের ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা ও সামাজিক সম্পর্কগুলোকে উপেক্ষা করা হয়। ফলত, নতুন প্রজন্ম শহরকেন্দ্রিক এই সংস্কৃতি দ্রুত গ্রহণ করছে এবং গতানুগতিক পুরাতন সমাজ বা কমিউনিটিকে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী একটি নিয়ন্ত্রণমূলক শক্তি হিসেবে দেখছে। এটি নতুন প্রজন্মের সমাজবিরোধী মনোভাব এবং নেতিবাচক অভিযোগের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
৪.
মূল প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের সমাজব্যবস্থার প্রতি যে নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি তা আসলেই কতটা যৌক্তিক। এ দৃষ্টিভঙ্গি যে যথাযথ নয়, তার অন্যতম প্রমাণ সমাজ ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সমাজ মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি; সমাজ ছাড়া মানুষের পৃথক কোনো অবস্থান নেই। মানুষের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতাই সমাজের উপর নির্ভরশীল, কারণ সমাজই মানুষের অভাব পূরণ করে এবং তার অস্তিত্বকে কাঠামোবদ্ধ করে। তবে, এই কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে সমাজ কিছু মাত্রায় আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠে। এই আধিপত্য সমাজের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার একটি উপায়। কিন্তু সমাজ নিজে কোনো জীবন্ত সত্তা নয়; বরং এটি ব্যক্তি টু ব্যক্তির মিথস্ক্রিয়া দ্বারা পরিচালিত হয়। ব্যক্তি যখন অন্য ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, তখন সেই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাজের কাঠামো নির্মিত ও সংহত হয়।
এখানেই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ভূমিকা স্পষ্ট হয়। সামাজিকীকরণ কেবল ব্যক্তির বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে না; এটি তার চিন্তা, চেতনা ও অনুভূতিকে সংজ্ঞায়িত করতেও সহায়ক হয়। সামাজিকীকরণের অভাব মানে শুধু ব্যক্তি নয়, বরং পুরো সমাজ কাঠামোর বিলোপ।
৫.
ফলে, নতুন প্রজন্মের সমাজের প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি একপ্রকার বিভ্রান্তি। সমাজকে শৃঙ্খল মনে করা, বা তার আধিপত্যকে দমনমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করা, সমাজের প্রকৃত কাঠামো ও ভূমিকার প্রতি গভীর অজ্ঞতা থেকেই উদ্ভূত। এই ভুল ধারণা শুধুমাত্র সমাজ ও ব্যক্তির সম্পর্ককেই অবমূল্যায়ন করে না, বরং ব্যক্তির সম্ভাব্য বিকাশকেও সংকীর্ণ করে তোলে।
নতুন প্রজন্ম চায় যে তাদের চিন্তা-চেতনা ও অনুভূতিগুলো গুরুত্ব পাবে, তাদের পছন্দ-অপছন্দ বা ভালো লাগা-খারাপ লাগার ভিত্তিতে সমাজ পরিচালিত হবে। কিন্তু তাদের এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, আমাদের চিন্তা-চেতনা ও অনুভূতি পরিবর্তনশীল হলেও কিছু অনুভূতি চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয়। এই অনুভূতিগুলো পৃথিবীর ধ্বংস পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। যেমন, পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, নিকটাত্মীয়দের প্রতি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি , কিংবা মেট বা সংগীর প্রতি বিশেষ টান—এগুলো চিরায়ত এবং সমাজে এদের গুরুত্ব অপরিসীম।
৬.
সমাজ এই চিরায়ত অনুভূতিগুলোকে জারি রাখতে চায়, কারণ এগুলো সমাজের স্থিতিশীলতা এবং মানুষের স্বাভাবিক সহাবস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান সমাজব্যবস্থা, বিশেষত প্রযুক্তিনির্ভর ও শহরকেন্দ্রিক সমাজ, এসব চিরন্তন অনুভূতিতেও পরিবর্তন আনতে চায়। এখানেই সমস্যার উৎপত্তি।
নতুন সমাজব্যবস্থার এই পরিবর্তিত চিন্তা-ভাবনা নতুন প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে, তাদের পুরাতন সমাজব্যবস্থার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে। তারা মনে করছে যে পুরাতন সমাজব্যবস্থা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতিবন্ধক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই পুরাতন ব্যবস্থার মধ্যেই মানুষের গভীরতম সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধনের ভিত্তি নিহিত। নতুন প্রজন্মের উচিত এই বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং সমাজের স্থায়িত্ব ও মানবিকতার চিরন্তন অনুভূতিগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করা।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment