জামাত ও প্রজ্ঞাহীনতার রাজনীতি

ইসলামিক রাজনৈতিক দলের মূল কাজ রাজনীতি করা, দাওয়াতি কার্যক্রম নয়। ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রাজনীতির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, দাওয়াতের মতো ব্যাপক কাজের জন্য এর বাইরেও অনেক সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব কাজ করছে। জামাত ইসলামের মূল সমস্যা হলো, তারা তাদের প্রকৃত ভূমিকা এবং কার্যপরিধি সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেনি। তারা তাদের নেতাকর্মীদের সঠিকভাবে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে—তাদের কাজ আসলে কী এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কীভাবে অর্জন করতে হবে, সেটাও তাদের অজানা রয়ে গেছে।

রাজনীতি অত্যন্ত কঠিন ও জটিল বিষয়। এটি সহজভাবে, নিছক আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিশ্লেষণক্ষমতা, ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ছাড়া সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। "ভাই ভাই" সম্পর্ক, সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া, কিংবা সবাই আমার আপনজন—এমন মন-মানসিকতা নিয়ে রাজনীতি করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং গভীর চিন্তা। আমার মতে, জামাত ইসলামীর একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলেও, তারা সেই লক্ষ্য কর্মীদের কাছে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। শিবির ও জামাত নিয়ে সমাজে যে বিশাল প্রত্যাশা বা হাইপ তৈরি হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত তাদেরই ক্ষতির কারণ হবে, কারণ এই দলগুলো মেধা বা প্রজ্ঞার চেয়ে সাধারণ, সহজ-সরল মানুষদের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামাত ইসলামীর অবস্থান স্পষ্ট নয়। দলের বেশিরভাগ কর্মী গ্রামীণ পটভূমি থেকে আসা সাধারণ মানুষ, যারা রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় দুর্বল। ফলে তাদের কর্মী বাহিনী শহরের এমনকি গ্রামের মানুষেরও ওপর প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হচ্ছে, এবং ইসলামের মূল শিক্ষা বা নীতি বোঝার ক্ষমতাও তাদের নেই। এই অদক্ষ কর্মী বাহিনীর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সফলতা অর্জন সম্ভব নয়; বরং এটি বিতর্ক ও সমস্যার জন্ম দেবে।

আধুনিক যুগে একটি ছোট ভুলও বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।  তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে একজন কর্মীর অসচেতনতা পুরো দলকে বড় ধরনের বিপর্যয়ে ফেলতে পারে। এ বিষয়টি রাজনৈতিক দল হিসেবে উপলব্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

আপনি যদি ইসলামিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত হতে চান, তবে ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে। এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি শুধুই রাজনৈতিক দল হতে চান, তবে তুরস্কের একে পার্টি বা তিউনিসিয়ার এনাহদা পার্টির মতো কাজ করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে ইসলামিক আম্ব্রেলার বাইরে এসে কাজ করতে হবে। যতদিন আপনার দলের নামের সাথে 'ইসলামিক' শব্দটি থাকবে, আপনাকে ইসলামিক নীতির বাইরে গিয়ে কিছু করা থেকে বিরত থাকতে হবে, নতুবা সমালোচনার মুখোমুখি হতে হবে।_

একটি উদাহরণ দিই— আপনি যদি হিন্দুদের উৎসবে সম্প্রীতি জানাতে পূজা মণ্ডপে যান, এটি ঠিক নয়। ঈদগাহে কোনো পুরোহিত এসে ঈদের নামাজের সময় সম্প্রীতি জানালে আপনার কেমন লাগবে? পূজা তাদের জন্য উপাসনা, যেমন আমার আপনার জন্য ঈদের নামাজ ইবাদত। তাদের উপাসনা করতে দিন, তাদের স্বাধীনতা দিন। সম্প্রীতি দেখাতে পূজা মণ্ডপে যেতে হবে না; বরং গরিব হিন্দুদের ঘরে যান, তাদের কষ্টের কথা শুনুন, তাদের পাশে দাঁড়ান। সেটাই প্রকৃত সম্প্রীতি।

আপনার মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করুন—রাজনীতি অথবা দাওয়াত। আপনি যা করবেন, তা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করুন, নতুবা বিভ্রান্তির শিকার হবেন।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...