১.
ধর্মীয় ক্ষেত্রে এখনকার ক্যাচালটা এত বেশি কেন? আমার কাছে মনে হয় এই ক্যাচাল সোসাইটির দুইটা প্রভাবশালী গ্রুপের মধ্যকার মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং দ্বন্দ্বের প্রতিক্রিয়া। এই প্রভাবশালী দুইটা গ্রুপ সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের প্রভাব, মতবাদ ও প্রচার প্রচারণায় নিজেদেরকে একে অপরের থেকে ছাড়িয়ে যাবার যে মানসিক দ্বন্দ্ব বা প্রচেষ্টা, তা এই ক্যাচালে দৃশ্যমান।
বাংলাদেশের আবহমানকালীন ইতিহাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি সর্বব্যাপী প্রভাব সবসময়ই ছিল এবং এখনো রয়েছে। তারা রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে গেছে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই সমাজকে চালিয়ে নিয়ে গেছে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি কখনোই ধর্মকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি, বরং ধর্মীয় ভাবধারাকে সম্পন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতি উপেক্ষা করেছে। ফলে আলিম-ওলামা তো দূরের কথা, সাধারণ ধর্মভীরুদেরও তারা একটি বাঁকা চোখে দেখতো।
আমরা মধ্যবিত্তের এই শ্রেণীকে সেকুলার অংশ বলতে পারি। যারা বাঙালিয়ানাকে বা বাঙালি সংস্কৃতিকে সবসময় গুরুত্ব দিয়েছে, সেইখানে ধর্মের প্রবেশ কখনোই হতে দেয়নি। ফলে তখন ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার ক্যাচাল সোসাইটিতে ও সমাজে রাষ্ট্র আমরা খেয়াল করিনি।
তবে একবিংশ শতাব্দীর নতুন বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠনে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী সমাজের ক্ষমতার বিচ্যুতি ঘটেছে। প্রভাব কমেছে। আবার এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা অংশের মধ্যে ধর্ম পালনের একটি ব্যাপকতা লক্ষ্য করা যায়। মধ্যবিত্ত ঐ শ্রেণি এখন প্রচুর ধার্মিক হচ্ছে এবং এই অংশ নিজেদেরকে ধর্মতত্ত্ববিদ, ইসলামিক ভাবদার সম্পূর্ণ আলেম-ওলামা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।ফলে ধর্মপ্রচারক ইসলামপন্থী, বিশেষ করে উলামাদের গুরুত্ব এই সময় বেড়ে গেছে।
২.
ইসলামপন্থী ধর্ম প্রচারকরা এত হাইলাইটেড হচ্ছে কেন? কিবা তাদের নিয়ে তর্ক বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে কেন?
আমাদের সমাজের সোশ্যাল স্ট্রাকচারে আবহমানকাল থেকেই সাধারণ আলেম-ওলামার স্থান কখনোই মধ্যবিত্তের ওপরে উঠে নি। তারা গ্রামে-গঞ্জে প্রান্তিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। মধ্যবিত্ত বা এলিট শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব তারা কখনোই করেনি।
ফলে তাদের ভয়েস উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত সমাজে পৌঁছায়নি বা পৌঁছালেও সেটাকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ফলস্বরূপ, পাওয়ার স্ট্রাকচারে সমাজের যে অংশ প্রভাব রাখে, সেই অংশে আলেম-ওলামারা কখনোই ছিল না। সুতরাং তাদেরকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা।
এই একবিংশ শতাব্দীতে মধ্যবিত্ত/ উচ্চবিত্ত থেকে প্রচুর ধার্মিকতা এবং ধর্মের প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তাদের লাইফ স্টাইলে ধর্মীয় লেবাসে ও চিন্তায় নিজেদেরকে ধার্মিক হিসেবে প্রকাশ করতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে। ফলে মধ্যবিত্ত এই ধর্মভীরু শ্রেণী নিজেদেরকে বাঙালী মুসলমান বলতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে।
সুতরাং, মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে একটি ব্যাপক ধর্মীয় গণজাগরণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই মধ্যবিত্ত ধর্মীয় শ্রেণি বা ধার্মিক শ্রেণী আলেম-ওলামাদের ভালোবাসে। আবার এদের মধ্যে অনেকেই আলেম-ওলামা এবং ইসলামিক চিন্তক হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ফলস্বরূপ, তারা সোশ্যাল স্ট্রাকচারে নিজেদের স্থান করে ফেলতে পেরেছে। এর ফলে, পাওয়ার স্ট্রাকচারে ধর্মীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং সেকুলার শ্রেণীদের মধ্যে একটি তীব্র দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। আর আমরা তা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি।
ধার্মিক ও ইসলামপন্থী ধর্মপ্রচারক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এই অংশটি সমাজে ও রাষ্ট্রে পাওয়ার স্ট্রাকচারের অংশ হতে চায় এবং তাদের প্রভাব রাখতে চায়। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণী তাদের ঐভাবে সমাজে প্রভাবক হিসাবে জায়গা দিতে চায় না। এর ফলে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে। এই দ্বন্দ্বটি আমরা এখন ব্যাপক আকারে দেখতে পাচ্ছি শাইখ আহমাদুল্লাহ ভার্সাস ডঃ শামীমা লৎফা, ড: কামরুল হাসান মামুনদের মধ্যে মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশে।

No comments:
Post a Comment