দায়িত্বহীন রাষ্ট্র আর সাইবার মব জাতি !


একটা রাষ্ট্র কতটা অগোছালো, অনিয়ন্ত্রিত এবং দুর্নীতিপরায়ণ হলে মানুষের জীবনের মূল্যকে এতটা হেয় করতে পারে? দেখুন, সেখানে শুধু শত শত মানুষই মারা যায়নি, সেখানে প্রাণ হারিয়েছে শত শত শিশু। একটি প্রাপ্তবয়স্কের মৃত্যু এবং একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই এক নয়।

মাইলস্টোনের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের জাতিকে কতটা নাড়া দেবে, তা আমাদের প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঘটনার দায়ভার কার? কোন কর্তৃপক্ষ এই দায় নেবে? বিমান বাহিনী? সশস্ত্র বাহিনী? বাংলাদেশ সরকার? শিক্ষা মন্ত্রণালয়? নাকি মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ?

আবার প্রশ্ন আসে, দায় স্বীকার করলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে? এই হারিয়ে যাওয়া অমূল্য প্রাণগুলোর ক্ষতিপূরণ কি আদৌ সম্ভব? আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী, যেখানে প্রতিটি ভুলের পরিণাম হয় বিপর্যয়কর?

তবে সবকিছু রাষ্ট্র, সমাজ বা সমাজপতিদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হবে না। আমাদের নিজেদেরও দায়িত্ব আছে। দেশে কোনো বড় ঘটনা ঘটলেই যেন গোটা জাতি ফেসবুকে ঝড় তোলে। এক ধরনের সাইবার মব তৈরি হয়, যেখানে প্রত্যেকে নিজের মত, অনুমান, এমনকি ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু এতে কি আদৌ কোনো ভালো ফল আসে?

জরুরি পরিস্থিতিতে এমন আচরণ বরং আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। তাই আমাদের উচিত ধৈর্য ধরা, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা। সত্য উদঘাটন হোক, এটি নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব, যেন মিথ্যা খবর আর প্রোপাগান্ডার সয়লাব না হয়।

মাইলস্টোনের ঘটনার পরও আমরা দেখলাম, ফেসবুকে ছড়ানো অধিকাংশ প্রোপাগান্ডা, মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তিকর বিশ্লেষণ মূলত শিক্ষিত শ্রেণীর হাতেই তৈরি হচ্ছে। যারা নিজেদের বুদ্ধিমান মনে করে, তারাই কোনো দুর্ঘটনাকে আরও ভয়াবহ আকারে তোলার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।

জাতি হিসেবে আমাদের একটি আত্মসমালোচনার দরকার। বুঝতে হবে, কখন, কোথায়, কীভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। তথ্য পেলেই সেটি যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া কোনো দায়িত্ব নয়। আমাদের প্রত্যেকেরই একটি ন্যূনতম সামাজিক দায়িত্ব আছে, সেই দায়িত্ব পালন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

শিক্ষিত অসভ্য ?


পৃথিবীতে আপনি দুই ধরনের অসভ্য মানুষ দেখতে পাবেন, যারা বর্বর চিন্তায়, চেতনায় ও আচরণে। 
প্রথম প্রকার হলো অশিক্ষিত অসভ্য। এরা গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, যাদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি, অথবা শহরের প্রান্তিক মানুষ। তাদের অসভ্যতা মূলত অজ্ঞানতা থেকে আসে। এই মানুষদেরকে বোঝানো যায়। আপনি যদি তাদের শিক্ষা দেন, তারা শিখতে চায়; তাদের মূর্খতা ও বর্বরতাকে সভ্যতার দিকে আনা সম্ভব। এই অশিক্ষিত অসভ্যদের অসভ্যতার বর্বরতাকে আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন।
দ্বিতীয় প্রকার হলো-
শিক্ষিত অসভ্য, এরা সমাজের সেই শ্রেণী, যারা নিজেদের অসীম জ্ঞানী মনে করে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, পত্রপত্রিকা, এমনকি রাষ্ট্রের policymaking-এ এদের সরব উপস্থিতি। এরা সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের ভারসাম্যকে নিজেদের চোখে সঠিক বলে মনে করে এবং বিশ্বাস করে they are the only sophisticated animals in the world। তারা মনে করে, তারাই একমাত্র সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকারের যেকোনো policy, প্রথা ও values তৈরি করার অধিকার রাখে।
এই শ্রেণীর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, তাদের ভুল তারা কখনোই স্বীকার করতে চাইনা । তারা ভাবতেই পারে না যে তাদের চিন্তার ভ্রান্তি  থাকতে পারে এবং তাদের এই ভ্রান্ত চিন্তা সমাজ ও রাষ্ট্রের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। হাজারবার বোঝালেও কোনো লাভ নেই। তারা কোনো সমালোচনা শুনবে না, কারও কাছ থেকে শিখবে না, কারণ তারা মনে করে তারা এই সুপেরিয়র সবার থেকে।
এই শিক্ষিত অসভ্যতার বর্বরতা এতটাই গভীর ও বিধ্বংসী যে তা কল্পনারও অতীত। আল্লাহ আমাদের উভয় ধরনের অসভ্যতার হাত থেকে রক্ষা করুন।

চাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি!

মরা যে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখে এসেছি, সেখানে রাজনীতি মানেই একে অপরকে খোঁচা দেওয়া, বক্রভাষায় কথা বলা, উস্কানি দেওয়া, আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলা এবং গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধানো, এগুলোই যেন রাজনীতি। এক দল আরেক দলকে গুঁতা না দিলে যেন তাদের রাজনীতি হয় না।

এই পুরনো ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিসরকে নষ্ট করে ফেলেছে, এ কথা আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি। এইসব রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে কোনো সৌজন্যবোধ, শালীনতা, ন্যূনতম শিষ্টাচার নেই। কোনো সততা বা উদারতা নেই। তাদের ভাষায় আপনি শালীনতার লেশমাত্রও দেখবেন না। মনে হবে যেন বস্তির অশিক্ষিত, অসভ্য মানুষ রাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, দলের শীর্ষ নেতাদের ভাষাও জঘন্য এবং অযোগ্যতার পরিচায়ক।

আপনি তাদের কাছ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নীতি বা জনগণের মঙ্গল নিয়ে কোনো আলোচনা শুনবেন না। এমনকি যদি সংসদ ভবনে সংসদ সদস্যদের আলোচনা শোনেন, আপনার বমি পাবে, এ যেন অশিক্ষিত, মূর্খ, অসভ্যদের মতো গায়ে পড়ে ঝগড়াঝাঁটি করা। এটাই আমাদের রাজনৈতিক দলের মুখের ভাষা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া।

আর একটি বড় সমস্যা হলো, যেসব বুদ্ধিজীবী এই রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন করেন, তাদের দর্শন দিয়ে, জ্ঞান দিয়ে, নীতি-নির্ধারণে সহযোগিতা করেন, তারাও সেই একই জঘন্য ভাষায়, অশ্লীলতায় লিপ্ত হন। তারা পুরনো রাজনৈতিক হিরোদের গুণগান করেন, কী কী অর্জন করেছেন, কত মহান ছিলেন, এই সব বস্তাপচা কথাবার্তা দিয়ে তারা সুবিধাবাদী হয়ে ওঠেন, ক্ষমতার ভাগীদার হতে চান। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোকেও শিখতে দেন না, তারা বন্য জন্তু জানোয়ারদের মতো ক্ষমতা দখল করতে ও প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এর বাইরে আপনি তাদের কাছ থেকে আর কিছুই দেখতে পাবেন না।

তাই আমার NCP-সহ সব নতুন দলের প্রতি অনুরোধনতুন দল হিসেবে আপনারা গায়ে পড়ে ঝগড়া করবেন না, উস্কানিমূলক কথা বলে রাজনৈতিক পরিসরকে উত্তপ্ত করবেন না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশুদ্ধ করুন এবং নতুন বাংলাদেশের নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখুন। বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে NCP একটি নতুন দল। নতুন দল হিসেবে আমরা আশা করি তারা আমাদের জন্য নতুন কিছু উপহার বয়ে আনবে।

কুসংস্কার ও তার রকমভেদ!










1.
আমরা কুসংস্কারের সাথে অতি পরিচিত। এই কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, মিথ, মিথলজি ,সবকিছুই আমাদের সোসাইটি ও রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই কুসংস্কারের ভেদাভেদ বা বৈচিত্র্য আমরা অনেকেই জানি না। আমাদের অবশ্যই জানতে হবে, এই কুসংস্কারগুলো ঠিক কী ধরনের এবং কোন শ্রেণীর মানুষ এইসব বিশ্বাসে আবদ্ধ। একমাত্র তখনই আমরা বুঝতে পারবো, কোন শ্রেণীর মানুষ কতটা গভীরভাবে কুসংস্কারে নিমজ্জিত এবং কার বিপক্ষে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে লড়াই করতে হবে।
আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে তিনটি প্রধান শ্রেণীর মানুষ রয়েছে, যারা ভয়াবহভাবে কুসংস্কারচ্ছন্ন। এই তিন শ্রেণীর প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা বিষয়, মিথ, ফলস এবং ইউটোপিয়ান চিন্তায় অটল বিশ্বাস রয়েছে। প্রত্যেক শ্রেণীরই কুসংস্কারে নিমজ্জিত হওয়ার নিজস্ব গ্রাউন্ড আছে, রয়েছে আলাদা রিজন ও বিশ্বাস, যা তাদের কুসংস্কারে আটকে রেখেছে। এদের প্রত্যেকের কুসংস্কার সোসাইটি ও রাষ্ট্রকে ভিন্নভাবে ডিমেরিট করে, এবং তাদের প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরেই বিদ্যমান।

2.
প্রথম শ্রেণীর মানুষরা হলো সেইসব ব্যক্তি, যাদের আমরা রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রান্তিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করি, সাবঅল্টার্ন প্রান্তিক মানুষ। এরা অনেক সময় ধর্মীয় কারণে মিথ, মিথলজি এবং নানা ধরনের কুসংস্কারে বিশ্বাসী হয়, অথবা ধর্মের এক ধরনের মিথ্যা মোড়ক ও বিকৃত ব্যাখ্যার ফাঁদে আটকা পড়ে নিজেদের আচ্ছন্ন করে তোলে। ফলে তাদের চারপাশে গড়ে ওঠে এক ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক ভ্রান্তির বলয়, যেখানে ভুল কনসেপ্ট, অপব্যাখ্যা এবং অন্ধবিশ্বাস একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায়। এই শ্রেণীর মানুষরা কখনও ধর্ম ও সামাজিক মূল্যবোধের সঠিক এবং সফিস্টিকেটেড ব্যাখ্যা পায় না, অথবা সেই ব্যাখ্যা বোঝার মতো সুযোগ-সুবিধাও তাদের জীবনে থাকে না। অধিকাংশই অশিক্ষিত; শিক্ষার আলো তাদের দিগন্তে পৌঁছায় না, আর সেই অন্ধকারেই তারা কুসংস্কারের শেকড়ে আবদ্ধ হয়ে থাকে। এই কুসংস্কারের পেছনে রয়েছে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা, সামাজিক প্রথার অপপ্রয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্থায়ী ঘাটতি।
মজার বিষয় হলো, আমাদের সোসাইটি ও রাষ্ট্রে একটি সহজাত ধারণা প্রায়ই প্রচলিত, যে এইসব সাবঅল্টার্ন প্রান্তিক মানুষরাই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, অশিক্ষিত ও অসভ্য। আর তাদের এই কুসংস্কারের উৎস নাকি ধর্ম। কিন্তু এই ধারণা একেবারেই ভ্রান্ত। আসলে ধর্ম নয়; বরং ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা, সামাজিক প্রথার বিকৃত রূপ এবং শিক্ষার বঞ্চনাই তাদেরকে কুসংস্কারের গহ্বরে ঠেলে দেয়। ফলে তারা এক ধরনের অন্ধ বিগট্রি-তে আক্রান্ত হয়, যা প্রায়শই অজ্ঞানতা ও বঞ্চনার ফসল।
তবু বাস্তবতা হলো , এই শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে এক ধরনের অন্তর্নিহিত শান্তিপ্রিয়তা বিরাজ করে। যদি তাদের কুসংস্কারকে সঠিক ওয়েতে ডিফাইন করা যায় এবং তাদের সামনে ধর্ম ও সামাজিক প্রথার প্রকৃত ব্যাখ্যা, মূল্যবোধের গভীরতা ও শিক্ষার সর্বব্যাপী গুরুত্ব উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তারা দ্রুতই এই কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে সক্ষম। তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করার উপায় সমাজে বিদ্যমান, এবং ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি, এই শ্রেণীর মানুষরা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ভ্রান্তির জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে সমাজের মূলধারায় নিজেদেরকে দক্ষতার সাথে অ্যাডাপ্ট করেছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রান্তিক মানুষের এই কুসংস্কার, ধর্মীয় বিগট্রি ও সামাজিক বিকৃতি রাষ্ট্রীয় জীবনে বড় ধরনের নেগেটিভ প্রভাব ফেলে না; বরং তা সীমিত এবং স্থানীয় পর্যায়েই আবদ্ধ থাকে।

3.

দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষরা হলো মধ্যবিত্ত। এদের কুসংস্কার মূলত অর্থনৈতিক ভিত্তিক এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চিন্তার সংকীর্ণতা থেকে জন্ম নেয়। এই কুসংস্কার ও মিথের একটি সীমানা তারা নিজেরাই গড়ে তোলে, যেন এক অদৃশ্য বৃত্তের ভেতরে নিজেদের আবদ্ধ রাখে। রাষ্ট্রও এই কুসংস্কার ও মিথকে সচেতনভাবে আরো বেশি প্রমোট করতে চায়, যাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সেই বৃত্তেই বন্দী থাকে।
মধ্যবিত্তের কুসংস্কারের মূল উৎস হলো, পরিবর্তনের প্রতি এক গভীর আতঙ্ক। তারা সর্বদা একটি স্ট্যাটাস কুয়ো বজায় রাখতে চায় এবং আশা করে সমাজ ও রাষ্ট্র তাদেরকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে, তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রনায়কেরা তাদের এই চাওয়াকে কখনোই প্রকৃত গুরুত্ব দেয় না। বরং রাষ্ট্র তাদের সামনে একটি ফাঁপা বয়ান তৈরি করে, যা তারা অন্ধভাবে বিশ্বাস করে। মধ্যবিত্তরা প্রায়ই মনে করে, বুড়োক্র্যাট ও রাষ্ট্রনায়কেরাই তাদের সমস্ত স্বপ্নের হেফাজতদার, এবং তারা ধর্মের মতোই এই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ধারণায় বিশ্বাস স্থাপন করে।
মজার বিষয় হলো, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রাষ্ট্রের প্রতি এই বিশ্বাস কখনও কখনও ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়েও বেশি দৃঢ় মনে হয়, যদিও প্রকৃতপক্ষে তা খুবই ভঙ্গুর এবং ক্ষণস্থায়ী।
4.

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী হলো শিক্ষিত, সুশীল ও সমাজের উচ্চশ্রেণীর মানুষ, যারা নিজেদেরকে সমাজের চোখ, মস্তিষ্ক এবং মাথা বলে মনে করে। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সমাজের সমস্ত কিছুই তাদের চিন্তা-চেতনা, মত ও পথের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে হবে। তাদের ধারণা, সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের চেতনা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। যদি সমাজের কোনো কিছু তাদের চিন্তার বাইরে গিয়ে যায়, তারা ধরে নেয় যে সমাজ ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে। তাদের মূল ভ্রান্তিটা এখানেই, তারা বিশ্বাস করে, অন্য কেউ সমাজের ভালো-মন্দ নিয়ে চিন্তা করার যোগ্য নয়।
এই মানসিকতা থেকে তারা রাষ্ট্র ও সমাজে এমন সব নিয়মকানুন তৈরি করতে চায়, যা একেবারেই abstract, বিমূর্ত, যার কোনো বাস্তব, ফিজিক্যাল অস্তিত্ব নেই। তারা রাষ্ট্রপিতা, রাষ্ট্রীয় নায়ক, দেশনায়ক, জননায়ক, রাষ্ট্রের হিরো, সংবিধান, রাষ্ট্রীয় সংগীত, রাষ্ট্রীয় প্রতীক ইত্যাদিকে এক ধরনের পবিত্রতার আসনে বসিয়ে দেয়। প্রত্যেক নাগরিককে এগুলো মেইনটেইন করতে ও মানতে বাধ্য করা হয়। এইসবকেই তারা এতটাই sacred করে তোলে যে এগুলোতে কেউ যদি বিশ্বাস না রাখে, তাকে যেন ধর্মদ্রোহীর মতো বিবেচনা করা হয়, তার প্রতি blasphemous আচরণ করা হয়। ফলে সেই অবিশ্বাসীকে রাষ্ট্রীয় চিন্তা-চেতনার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মূলত, এটি এক ধরনের sacredness, যা রাষ্ট্রের নামে এক অদৃশ্য ধর্মীয় কাঠামো তৈরি করে।
আমাদের সুশীল শ্রেণি, সমাজের উচ্চতলার একাডেমিসিয়ান, ফিলোসফার, পলিটিশিয়ান ও বুড়োক্র্যাটরা সমাজের নিচের তলা থেকে এইসব কুসংস্কার, ক্যারেক্টার, মিথ এবং রাষ্ট্রীয় মিথিক্যাল ক্যারেক্টার তৈরি করে, যেগুলো সবাইকে মানতে বাধ্য করা হয়। তারা নিজেরাও এগুলো মানে, কখনও সুবিধার কারণে, কখনও স্বার্থসিদ্ধির জন্য। তারা নিত্যনতুন ইতিহাস নির্মাণ করে, সেগুলোকে পবিত্র করে তোলে এবং সমাজে এক ধরনের sacred vibe তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় সংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, অন্ধ রাষ্ট্রীয় চেতনা ও অন্ধ রাষ্ট্রবাদ। আর এরই ফলশ্রুতিতে গড়ে ওঠে দুর্নীতি, অপশাসন, শাসন-নির্যাতন এবং রাষ্ট্রীয় লাঠিয়াল বাহিনী। এগুলোও এক ধরনের কুসংস্কার, শুধু এর আকার আরও বৃহৎ এবং প্রভাব আরও বিপজ্জনক।

5.
আমাদের সবাইকে এই তিন শ্রেণীর মানুষের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি বাধা আসবে তৃতীয় শ্রেণীর কাছ থেকে। কারণ প্রথম শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে আপনি আপনার যৌক্তিক চিন্তা ও যুক্তিবাদ দিয়ে লড়তে পারবেন। তাদেরকে বোঝানো সম্ভব যে তাদের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস সমাজের জন্য কতটা নেগেটিভ প্রভাব সৃষ্টি করছে। তারা একসময় বুঝতে শেখে এবং নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে পারে।
কিন্তু মধ্যবিত্ত এবং বিশেষত তৃতীয় শ্রেণীর সেই সুশিক্ষিত, সুশীল, তথাকথিত সমাজের মাথারা ,যারা রাষ্ট্রীয় চিন্তা-চেতনাকে এক ধরনের ধর্মীয় মোড়কে আচ্ছাদিত করেছে, তাদেরকে আপনি কখনোই যুক্তি বা চিন্তার আলোয় পরিবর্তন করতে পারবেন না। এরা এতটাই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন যে তারা আপনার প্রতিটি যুক্তিকে শত্রুতার চোখে দেখবে। তারা প্রতিনিয়ত ঘৃণার উৎপাদন করবে এবং আপনাকে ও আপনার চিন্তা-চেতনাকে দমন করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এদের প্রতিরোধের ধরন হবে নির্মম; প্রয়োজনে তারা জুলুম-নির্যাতনের আশ্রয় নিতেও দ্বিধা করবে না। এরা মানবিকতার ন্যূনতম বোধকেও উপেক্ষা করবে, কারণ তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় কুসংস্কারই চূড়ান্ত সত্য।

তৃতীয় শ্রেণীর মানুষেরাই মূলত আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় বাধা, তারা অগ্রগামীতার শত্রু। যারা নিজেদের সমাজের মাথা মনে করে এবং বিশ্বাস করে তারাই সমাজের সমস্ত কিছুর একমাত্র জিম্মাদার, তাদের বিরুদ্ধেই আমাদের সবচেয়ে বড় লড়াই। তাদের দমন করতে হবে, তাদের চিন্তার একচেটিয়াতা ভেঙে দিতে হবে, আর সমাজকে মুক্ত করতে হলে এই শ্রেণীর কুসংস্কারের মূলে আঘাত হানতে হবে।

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...