যুমারস অ্যান্ড দেয়ার পলিটিক্যাল বোঝাপড়া



 ১.

আমাদের আগামী প্রজন্ম বা যুমারসরা  তারা জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ দেখেনি। তারা কখনো রাজনৈতিক সুস্থ পরিবেশের মুখোমুখি হয়নি। এর ফলে, রাজনীতি কি, সরকার কী এবং সরকারি নীতি বাস্তবায়নে তারা যে একটি স্টেকহোল্ডার—এই বিষয়ে তাদের কোনো সচেতনতা নেই। তারা জানে না যে, তারা সরকারি নীতিতে, কর্মকাণ্ডে এবং নীতি বাস্তবায়নে প্রভাবিত করতে পারে এবং তাদের পলিসি ও আইডিয়া রাখার অধিকার রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো গত ১৫ বছরের একনায়কতান্ত্রিক, দমনমূলক শাসন।

এই শাসন ব্যবস্থা, যা সমাজে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় ঘটিয়েছে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাজনীতি বিমুখতা, রাজনৈতিক শূন্যতা এবং রাজনীতির প্রতি ঘৃণা তৈরি করেছে। তাদের জীবনের যে সময়ে রাজনীতির ধারণা, রাজনৈতিক পরিবেশ ও কার্যকলাপ সম্পর্কে জানতে পারার কথা ছিল, সে সময় তাদের রাজনীতির কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাদের স্মৃতিতে রাজনীতির কোন সুন্দর নস্টালজিয়া নেই; তাদের মাথায় ঘোরে না রাজনৈতিক কোনো শুভ চিন্তা।

নতুন প্রজন্ম, যারা নিজেদের এই দেশ ও জাতির অংশীদার হিসেবে মনে করে, যারা আগামী দিনে কান্ডারী হবে, তারা রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন এবং এর ভেতর-বাহির সম্পর্কে অবগত হবে—এটি খুব জরুরি। তবে, এই প্রজন্ম অত্যন্ত আত্মমুখী, তাদের চিন্তাগুলো অনেকটা কেন্দ্রীভূত এবং শুধুমাত্র নিজেদের জ্ঞান ও বন্ধুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর ফলে, বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার প্রতি তাদের সচেতনতা কম।

আমাদের তাদেরকে নতুনভাবে রাজনীতির শিক্ষা দিতে হবে। রাজনৈতিক শিক্ষা শুধু শ্রেণীকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে হবে। তাদেরকে বোঝাতে হবে যে রাজনীতি কীভাবে সামাজিক পরিবর্তন এবং উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। নাহলে, দেশের আমুল পরিবর্তনে যতই সংস্কার কমিশন গঠন করি না কেন, কিংবা কাঠামোগত বা অবকাঠামোগত সংস্কার নিয়ে আসি না কেন, যারা দেশের হাল ধরবে, তাদের মধ্যে নতুন রাজনীতি নিয়ে অসচেতনতা ও অনাগ্রহ বাড়তেই থাকবে।


২.

আমাদের আধিপত্যবাদী, নিয়ন্ত্রণবাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে নতুন প্রজন্মের তরুণ-যুবক-যুবতীদের রক্ষার জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক শিক্ষার প্রয়োজন। তবে, এর মানে এই নয় যে আমাদের ক্যাম্পাসগুলোকে রাজনৈতিক স্লোগানে ভরিয়ে দিতে হবে; বরং আমাদের রাজনীতিকে ক্যাম্পাসের বাইরেও নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে রাজনীতি বরাবরই পেশিশক্তি কেন্দ্রিক, এবং ক্যাম্পাস থেকে আসা দলগুলো কৃষিশক্তি ও জনবল দিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক কার্যকলাপ সাধারণত ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যাপক আধিপত্যের কারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীন সরকারগুলো ছাত্র সংগঠনগুলোকে পেশি শক্তি প্রদর্শনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছে, যা ছাত্র রাজনীতির একটি বিকৃত রূপ। এর ফলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি; শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বার্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শিক্ষকরাও তাদের গতিশীলতা হারিয়েছেন। বর্তমানে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজগুলোতে গতানুগতিক শিক্ষা ধারার কোনো পরিবর্তন আসেনি, যদিও পৃথিবী ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

ছাত্র রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি স্বাধীনতা আন্দোলন, গণ আন্দোলন ও রাজনৈতিক সচেতনতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে, বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির নামে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির সংস্কৃতির গড়ে ওঠার কারণে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দিতে পারছে না। কিছু ছাত্র রাজনীতির পক্ষে সাধারণত নিজেদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছে।

আমি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই, বরং মনে করি আমাদের ক্যাম্পাসগুলোকে লেজুড়ে ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। তবেই শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার দিকে মনোযোগ দিতে পারবে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সুশৃঙ্খল ও আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালনা করা উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

এখন সময় এসেছে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আলোচনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার, যাতে শিক্ষার্থীরা রাজনীতির প্রতি সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে পারে। তবেই বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত স্বাতন্ত্র্য ফিরে আসবে, এবং শিক্ষার্থীরা নিজেদের পেশাদারিত্বের দিকে মনোযোগ দিতে সক্ষম হবে।


৩.

আমরা স্বাধীনতার পর থেকে বা ১৯৪৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যত গণ আন্দোলনই দেখি না কেন, সবগুলোতেই এই ছাত্র রাজনীতি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। ছাত্র রাজনীতি আমাদের দেশের রাজনীতিতে, ক্ষমতার গতিপ্রবাহ নির্ধারণে এবং স্বাধীনতার আন্দোলনে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ২০২৪ সালের গণআন্দোলন—প্রতি ঘটনায় ছাত্র রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল।

২০২৪ সালের গণআন্দোলনও এর প্রমাণ, যেখানে অনেক শিক্ষার্থী তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা তুলে ধরেছে। যদি আমরা ২০১৮ সালের সড়ক আন্দোলনের উদাহরণ দেখি, এ আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল না; বরং এটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। এর অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিল কলেজ এবং স্কুলের শিক্ষার্থী। মজার বিষয় হলো, এ আন্দোলনে বিভিন্ন ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠন গুলো সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। এ আন্দোলন রাজনীতিহীনদের দ্বারা পরিচালিত ছিল, তবে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে ছাত্র রাজনীতির বাইরে থেকেও শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার ও মঙ্গলের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন করতে পারে।

সুতরাং, যদি কেউ বলে যে ছাত্র রাজনীতি বাতিল করলে দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে, আমি মনে করি এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। সাধারণ জনগণ ও শিক্ষার্থীরা যে কোনো সময় প্রয়োজনে আন্দোলন করতে পারে, এবং ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও ২০১৮ সালের সড়ক আন্দোলন তার চাক্ষুষ প্রমাণ।

তবে, ক্যাম্পাস ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে দেশের জন্য মঙ্গল জনক হবে। ছাত্র রাজনীতি থাকতে পারে, কিন্তু ক্যাম্পাসগুলোতে কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো উচিত নয়। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আলোচনা হবে, রাজনৈতিক শিক্ষা দেওয়া হবে, কিন্তু ছাত্র রাজনীতি করতে হবে ক্যাম্পাসের বাইরে।



৪.

বর্তমান সময়ে অনেকেই ছাত্র রাজনীতিহীন ক্যাম্পাসগুলোকে বিরাজনৈতিকরণ হিসেবে অভিহিত করেন। তারা যুক্তি দেন যে বিরাজনীতি ফ্যাসিবাদের ভাষা। তবে, এই ধারণা সঠিক নয়। বিরাজনীতি তখনই ফ্যাসিবাদের ভাষা হয়ে দাঁড়ায়, যখন রাষ্ট্র ও সমাজে আধিপত্যবাদী কোনো শাসনব্যবস্থা বিরাজমান থাকে এবং আমরা অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে অক্ষম হই।

ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি না থাকা মানে এটি বিরাজনীতি নয়; বরং লেজুড় ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতিই রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণের অভাব তৈরি করে, যা শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক অচেতনতা ও নিষ্ক্রিয়তা বাড়ায়। ছাত্র রাজনীতি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি ও দলীয় স্বার্থের কারণে কলুষিত হয়, ফলে শিক্ষার্থীরা রাজনীতি থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করার মাধ্যমে, তারা একটি সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। সঠিক নীতি ও নিয়ম প্রবর্তনের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। তাই, লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির উপস্থিতি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ক্ষতি সাধন করে এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।

অতএব, আমরা যদি আমাদের নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি, তাহলে তাদেরকে একটি সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে, যাতে তারা আগামী দিনের নেতৃত্বে সঠিকভাবে অবদান রাখতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, নতুন রাজনৈতিক শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি, যা দেশের ভবিষ্যৎকে নতুন আঙ্গিকে গড়ে তুলবে।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...