মানুষ এত উদ্ধত হইয়া উঠল কেন?

 



১.

আধুনিক সময়ে মানুশ এত উদ্ধত ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠার পেছনে  নানাবিধ কারণ রয়েছে। এই উদ্ধত স্বৈরাচারিতা মানুশকে যেন এক খাপছাড়া ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর ফলে মানুশ সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মুখামুখি হচ্ছে প্রতিনিয়ত এবং মানুশের অস্থিরতা পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে কেওাটিক সিচুয়েশেন। অর্থাৎ, আধুনিক জীবনের যে দোলাচলপূর্ণ অবস্থা, তাতে মানুশ নিজেকে ঠিকভাবে মানিয়ে নিতে পারছে না বা এই কেওাটিক পরিস্থিতির সাথে অ্যাডাপ্ট করতে পারছে না। 


উপরের বিষয়গুলো যদি যুক্তিসংগতভাবে বিশ্লেষণ করি এবং এর উত্তর দিতে চাই তাহলে বলতে হবে পরিবর্তন  অর্থাৎ দেখা যাবে যে মানুশের এই উদ্ধত স্বৈরাচারিতার অন্যতম কারণ হলো পরিবর্তন, বিশেষ করে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানুষের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা এনে দিয়েছে, যার ফলে সে পৃথিবীর ওপর অসীম প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। মানুশের হাঁতে বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে ব্যাপক এবং এই ব্যাপকতা মানুশকে পৃথিবীতে দিয়েছে অসীম প্রভাব ও ক্ষমতা । এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তনে মানুশের হাতের ব্যাপক ক্ষমতায়নে তার উদ্ধত ও স্বৈরাচারিতার চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করছে। সে সমাজকে সমাজ মনে করে না, সমাজের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চায় না পারতপক্ষে, তার কাছে ব্যক্তি বড় হয়ে উঠেছে সমষ্টির চাইতে এই ধরনের নানা রকম নেতিবাচক  পরিস্থিতির জন্য মানুশ এই পরিবর্তন দায়ী। 

২.

বিংশ শতাব্দীর আগেও পৃথিবীতে মানুষের সামাজিক পরিবর্তন ও দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই ধীরগতির ছিল। একটি আবিষ্কার থেকে আরেকটি আবিষ্কারের পথে যেতে মানুষের হাজার হাজার বছর লেগে যেত। যেমন, আগুন আবিষ্কার করতে মানুষের মিলিয়ন মিলিয়ন বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, চাকা আবিষ্কার করতেও লেগেছে দীর্ঘ সময়। এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষ অস্ত্র, তীর-ধনুক, কৃষিকাজের জন্য লাঙল ও হালের মতো প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এই গুলায় মানুশ ব্যাবহার করতো আগে পাথর এবং তারপর পাথর থেকে লোহায় আস্তে লেগেছে আরো হাজার হাজার বছর। বাট এই গুলার পরিবর্তন খুব ধীরগতির হওয়ায় মানুষ সবসময় সংগ্রামমুখর জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল এবং পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। সেই সময় মানুষ একদিকে প্রকৃতিকে ভয় পেত, অন্যদিকে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাও ছিল। এর ফলে মানুষের বিনয় ও সংযম বজায় থাকত। এইটার জন্য মানুশের ছিল এক ভারসম্যপুর্ন অবস্থা পৃথিবীর সাথে। যেখানে না ছিল উদ্ধততা না স্বৈরাচারিতা। 

৩.

কিন্তু বিংশ শতাব্দী থেকে একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের পর এই পরিবর্তনের গতি এতটাই তীব্র হয়েছে যে, এর আর কোনো সীমা নেই। যা প্রতিনিয়ত বাড়তেই আছে।  প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হচ্ছে, যা মানুষের জীবনের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ প্রতিদিন নতুন ধারণা ও প্রযুক্তির মুখোমুখি হচ্ছে, কিন্তু সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় সে পাচ্ছে না। আবার সামাজিকতাতে আসছে নতুনত্ব, সামাজিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় এসেছে ভিন্নতা এইসব কিছুকে মানুশেরা ঠাওর করে ওঠতে পারছে না। ফলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যার ওপর মানুষের নিজেরও নিয়ন্ত্রণ নেই। সে প্রতিনিয়ত নতুন কিছুর সন্ধান করছে, এবং এটাতে সে সফল হচ্ছেও। কিন্তু তাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে সে বর্তমানকে ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না, অতীতকে ধারণ করতে পারছে না, ভবিষ্যৎকেও পরিষ্কারভাবে কল্পনা করতে পারছে না। এই হত-বিহবল পরিস্থিতিতে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে যার ফলেই সে ও তার জীবন হয়ে উঠেছে লাগামহীন,  বিশৃঙ্খল। 

এরই ফলে মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে। সমাজে নানাবিধ বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতা ও বিশৃংখলাকে ট্যাকল দিতে মানুশকে দ্রুত অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে যার ফলে  সিদ্ধান্ত নিতে নিতে মানুশ নিজেকে স্বৈরাচারের ভূমিকায় নিয়ে গেছে।  এই পরিস্থিতি তাকে বানায় দিচ্ছে ব্যাপক উদ্ধত।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...