[১]
মানুশ নিজেদেরকে নিয়ে খুব কমই ভাবে , মানুশ অন্যকে নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে। অন্যের ভুলত্রুটি, ভালো-মন্দ সমস্ত কিছ সে জানতে চায় , অন্যের সমস্ত কিছুকে তার জাজ করা চায় ও জানার একটা অধিকার সে পেতে চায়। এইটা কে বলে নাক গলানো, এই নাক গলানোটা নেগেটিভ কিছু না। এইটাকে আমাদের পজিটিভলি দেখতে হবে। আপনি যখন সোসাইটিতে বাস করা শুরু করবেন, তখন আপনাকে কিছু বিষয় মেইনটেইন করতে হবে এবং সোশ্যাল বিইং হিসেবে সোসাইটিতে থাকতে হলে এইগুলা আগ্রাহ্য করে আপনি কখনোই সোশ্যাল মেম্বার হওয়ার পারবেন না। সোসাইটি কখন সোসাইটি হইয়া ওঠে? এর জন্য কিছু পূর্ব শর্ত রহিয়াছে এবং তার মধ্যে অন্যতম শর্ত হচ্ছে, মিউচুয়াল কোঅপারেশন এবং মিউচুয়াল ইন্টারঅ্যাকশন। দেখেন মিউচুয়াল কোঅপারেশন এবং মিউচুয়াল ইন্টারেকশন দুটাই কিন্তু একটা মাধ্যমই হয় সেটা হচ্ছে সোস্যাল এন্গেজমেন্ট বা নাক গলানো । সুতরাং আমি যে বিষয়টা বলতে চাচ্ছি নাক গলানো খারাপ কিছু না, নাক গলাটা অবশ্যই একটা পজিটিভ বিষয়। আপনার সোসাইটিতে নাক গলানো বিদ্যমান, মানে আপনার সোসাইটি একটিভ রহিয়াছে। সোসাইটি ফাংশন করে মিউচুয়াল ইন্টারঅ্যাকশন এর জন্য। আর এই মিউচিয়াল ইন্টারঅ্যাকশন হয়তে হলে অবশ্যই সমাজের সবার সমস্ত কিছু কে নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে না হলে সেইটা আর মিউচুয়াল ইন্টারেকশন থাকেনা।
[২]
আধুনিক ক্যাপিটালিজমের যুগে যেখানে ভোগই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং প্রোডাক্ট ও পণ্য গুরুত্ব হইয়া ওঠে মানুষের চেয়ে, মানুশের সম্পর্কের চেয়ে। এইখানে আপনি এই নাক গলানোকে নেগেটিভলি দেখবেন, এটাই স্বাভাবিক। পুঁজিবাদ আপনাকে এটাই শেখায়। পুঁজিবাদ মানুষকে সমষ্টি থেকে ব্যক্তি হতে শেখায় এবং ব্যক্তিকে তার নিজের জন্য বাঁচতে শেখায়। ব্যক্তি নিজের জন্য বাঁচতে গিয়ে অন্যকে ইগনোর করতে শেখে, অ্যাভয়েড করে এবং কেউ যদি তার লাইফে ইন্টারফেয়ার করতে চাই সেইটা কে নিন্দনীয় হিসাবে দেখায়। দেখেন সমাজে ইন্টারফেয়ার অনেক ধরনের আছে, এর রকম ভেদ রহিয়াছে। কিন্তু আধুনিক এই ভোগবাদী সমাজ এই ইন্টারফেয়ারকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। দেখেন ওয়েস্টার্ন পুঁজিবাদী সমাজে আপনি সমাজের থাকাকে উপলব্ধি করতে পারবেন কিন্তু সমাজের অস্তিত্বকে পুরোপুরি কাঠামোগত দাড় করাতে পারবেন না অর্থাৎ পশ্চিম পুঁজিবাদী সমাজ আসলে একটা মৃত সমাজে পরিণত হইয়াছে এই নাক গলানো না থাকার ফলে। এই কারণে আপনি দেখবেন পশ্চিমা কান্ট্রি গুলার সোসাইটির সোস্যাল বিইংরা একে অপরের নাম পর্যন্ত জানেনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে । দেখেন এশিয়ান কান্ট্রিগুলোর মধ্যে কোন দেশ যদি পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় ফার্স্ট বেঞ্চার হইয়া থাকে সেইটা হচ্ছে কোরিয়া এবং জাপান। এই দুইটা দেশের আপনি সমাজ ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য রাখলে দেখবেন তারা তাদের সোসাইটির স্ট্রাকচার এবং তার পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সোশ্যাল স্ট্রাকচারের চেয়ে একেবারেই মিল নাই, কারণ এই দুইটা দেশের নাগরিকরা যতটানা সোশ্যাল তার চেয়ে বেশি পার্সোনাল। এই যে সোশ্যাল প্রাণীর পার্সোনাল হইয়া ওঠা, এইটা কিন্তু একটা মৃত সোসাইটির লক্ষণ। ইভেন যে পাঠ্যবই অথবা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আমাদের সাহিত্য ও আধুনিক দিনকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এইগুলা কিন্তু আমাদেরকে পার্সোনাল হইতে শেখায়। প্রত্যেকের আলাদা স্টোরি, প্রত্যেকের আলাদা একটা ব্যাপার স্যাপার, প্রত্যেকের নিজের একটা সারাউন্ডিং , যে সারাউন্ডিংয়ে সেই হচ্ছে সেন্টার, এইযে প্রত্যেকের আলাদা জগত এইটারে আপনারা নাম দিয়েছেন ইনডিভিজ্যুয়ালিজম / ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা। এইখানে ব্যক্তি মূখ্য, সমষ্টির চেতনা ও স্বার্থ গৌণ। আর পুঁজিবাদ ও ভোগবাদের সার্থকতা এখানেই।
[৩]
এই যে আমি হিউম্যান কানেকশন যাকে মানব কানক্টিভিটিও বলা যায়, এর জন্য মিউচুয়াল ইন্টারেকশন বা মিউচুয়াল কোওপারেশন এর কথা বল্লাম, সেইটাতে আমি মোটা দাগে নাক গলানোতে সরলিকরণ করেছি। ফলে নাক গলানো কিন্তু সমাজের ব্যাকবোন হিসাবে সমাজকে টিকায়া রাখে। এই সমাজে প্রত্যেকটা জায়গায় আমাদের নাক গলানো ও আমাদের চিন্তাকে নিয়ে যাইতে হবে। এটাকে আমরা বলবো সামষ্টিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরি করা বা আমরা যে সমাজ নিয়ে ভাবি এবং সমাজের আমাদের একটা প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে এইটার প্রমাণস্বরূপ এই নাক গলানো ও চিন্তার প্রবেশ করানো। দেখেন আপনি যখন প্র্যাকটিস করবেন এই নাক গলানো অন্যের ব্যাপারে, আপনি মনে করবেন আপনি এম্পাথি দেখাচ্ছেন ওই ব্যক্তিকে। এইটা আপনি নিজেই ভেবে নিয়েছেন। বাট অন্যরা যখন আপনার ক্ষেত্রে এইটার প্র্যাকটিস করবে সেইটা কিন্তু আপনাকে মনে হবে আপনার সীমানায় আপনার ব্যাপারে অন্যের সীমালংঘন। মজার বিষয়টা হচ্ছে এখানেই। অন্যের বেলায় আপনার নাক গলানো, এইটা কে হারমনি, এম্প্যাথি ও এনগেজমেন্ট বইলা চালাইয়া দেন, বাট অন্যরা যখন এইটা করে সেইটা তখন আপনার কাছে উৎকট নাক গলানো মনে হয়। সোসাইটির যে চিরায়িত ধারা এইখানে এইটা কমন ব্যাপার গোড়াগোড়িই থেকেই, বাট কখন থাইকা এই নাক গলানো টাকে আমরা নেগেটিভলি দেখছি সেইটা হচ্ছে মূল প্রশ্ন। এইটা মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর পর থেকেই মানুষ এইটা নিয়ে ভাবা শুরু করে, মানুষ নিজেকে একটা আলাদা সত্বা হিসেবে ভাবতে থাকে। মানুশের যে একটা আলাদা ক্ষেত্র দরকার, সেইটা নিয়ে মানুষ জানতে শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে মানুশ নিজেকে সামজিক জীব থাইক্যা মানবিক ভাবতে শুরূ করে। এই যে মানুষের সামাজিক থেকে মানবিক হইয়া ওঠা, এটার মাধ্যমেই মূলত মানুষ মিউচুয়াল ইন্টারেকশন কে পজিটিভ ও নেগেটিভ উভয় দৃষ্টিকোন থাইক্যা দেখতে শুরু করে। আর এই পুঁজিবাদী চিন্তাভাবনারও শুরু কিন্তু এই উনবিংশ শতাব্দী থেকেই। ফলে এই মানবিক চিন্তায় মানুষকে একটা নতুন রূপ দান করে, আর এর জন্য মানুশ তার সামষ্টিক ইন্টারআকসনকে কিছুটা পাশে রেখে, ব্যাক্তিতে সীমাবদ্ধ হয় নিজে থেকেই। ভোগবাদ, পুঁজিবাদ এবং তথ্যের বিশাল প্রবাহ ব্যক্তিকে আরো বেশি ব্যক্তি কেন্দ্রিক বানায়া দেয়। ফলে সমাজের অনেক কিছু কেই সে বাতিল করে দিতে থাকে। দেখেন এই সোসাইটিতে অর্থাৎ বর্তমানে এইটা কিন্তু দোষের কিছু না। একা থাকতে চান, আপনি এই সিস্টেমকে মাইনা নিয়েই চলতে চান, সুতরাং এইটা বেস্ট অপশন ফর ইউ। বাট বাংলাদেশের মতো সমাজ ব্যবস্থায় এই সিস্টেমটা একটা সাইকো-সামাজিক দ্বন্দ্বের রূপ নিয়েছে।
[৪]
এই যে আমি বললাম ব্যাক্তি স্বাধীনতার যে প্রভাব ও গুরুত্ব, এইটা যেমন ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সোসাইটিতে প্রবেশ করছে কিন্তু বাংলাদেশ প্রথাগতভাবে অনুন্নত ও ম্যাটেরিয়ালিস্টিক না বলে যেই ঘটনাটা ঘটে, বাংলাদেশ সেইভাবে পুঁজিবাদী বা ভোগবাদী হইয়া উঠতে পারেনি অথবা ভোগবাদ-পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটলেও সেইটা মানুষের সামাজিক জীবনকে ওইভাবে প্রভাবিত করতে পারে নি। আমরা যদি ধরেও নি যে এরা সমাজ জীবনকে প্রভাবিত করে কিন্তু সামাজিক চিন্তার যে পুরাতন চিরায়িত ধারা সেটাকে এখনো আঁকড়ে ধরে আছে বাংলাদেশের সমাজ। ফলে যে ঘটনাটা ঘটে, নতুন যে প্রজন্ম এই প্রজন্ম যেমন ভোগবাদী-পুঁজিবাদী চিন্তায় ও চেতনার ফলে তাদের সাথে একটা মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব দেখা যায় বুমারস ও ওল্ড প্রজন্মের মধ্যে। দেখেন প্রত্যেকটা দেশের যে নিউ জেনেরেশন অর্থাৎ জেনজি যাদেরকে বলা হয় এরা কিন্তু ব্যাপক ওয়েস্টার্ন কান্ট্রি কালচার ও তাদের চিন্তা ও চেতনা দ্বারা পুরোপুরিই প্রভাবিত। এই যে পৃথিবীর তাবৎ দেশসমূহের যে নতুন প্রজন্ম বা পৃথিবীর যে আগামি প্রজন্ম এরা একটা বৈশ্বিক নিউ কালচারে বড় হচ্ছে এবং তাদের চেতনায় বিশ্বাসই হচ্ছে ভোগবাদ, পুজিবাদ সচেতন কিবা অসচেতনভবে। এদের সাথে পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশের স্থানীয় কালচার, চিন্তা-চেতনার সাথে এদের এই মনো-সামাজিক দন্দ্বটার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই। সুতরাং এইযে নতুন প্রজন্ম এদেরকে আপনি দেখবেন প্রচন্ডরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিক, একাকীত্ব, স্বার্থপর, ভোগবাদি, সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন, আত্মকেন্দ্রিক এবং অন্যের প্রতি উদাসীন। এইটাই এই নতুন পৃথিবীর চেতনায় লালিত প্রত্যেকটা ব্যক্তিবর্গের বৈশিষ্ট্য। এই কারণে এদের দেখবেন তাদপর একটা আইডেন্টিটি বা নিজস্ব ব্যক্তি এন্টিটি রহিয়াছে। এই এন্টিটিকে সে এমন করে রক্ষা করতে চায় যেমন করে বুমারস ও পূর্ব প্রজন্মের লোকেরা তাদের দেশ, জাতি ও বংশ রক্ষা করতে চাইতো। এই যে পার্থক্য এই পার্থক্যটা আপনি একটা দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখতে পারেন। উপরে উল্লেখিত আমার নাক গলানো এইটাকে নাকচ করে দেয় এই ব্যাক্তি এন্টিটি থাকা নতুন প্রজন্ম। নাক গলানো কে তারা ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে করে। এবং তাদের জীবনের সবচাইতে মূল্যবান হইয়া উঠে তার এই ব্যাক্তি এন্টিটি। ব্যক্তি এনটিটি ধ্বংস হওয়া কে সে জীবনের ধ্বংস হওয়া মনে করে। সুতরাং তার মান ইজ্জতের সম্পূর্ণ অংশটাই হচ্ছে তার এই ব্যক্তি এন্টিটি। আর এভাবেই সামাজিক এন্টিটি ব্যাক্তি এন্টিটিতে রূপ নেয়। এইটাকে আবার এরা নাম দিছে ব্যাক্তি প্রাইভেসি।

No comments:
Post a Comment