সামাজিক অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরুপ যেকোনো ইভিল এর মধ্যে সবচেয়ে ডেঞ্জারাস বা ধ্বংসাত্মক হচ্ছে গ্রামীণ রাজনীতি অথবা সিম্পলি জাতীয় রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন।

 



[১]


সমাজের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন বিষয়কে আমরা সামাজিক শত্রু বা সামাজিক ইভিল হিসেবে চিনি, যেমন বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, অশিক্ষা, মারামারি, কাটাকাটি, দুর্নীতি ইত্যাদি। এগুলো সমাজের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। তবে প্রশ্ন হলো, এগুলোর চেয়েও কি বেশি ধ্বংসাত্মক নয় অপরাজনীতি, অর্থাৎ জাতীয় রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন। আমরা জানি, রাজনীতি মূলত রাষ্ট্রের ব্যাপার— কে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে এবং কোন মতবাদ বা স্কুল ওফ রাজনৈতিক থট রাষ্ট্রক্ষমতা অধিগ্রহণ করবে, তা রাষ্ট্রীয় রাজনীতির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যখন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা রাজনীতিকে গ্রামপর্যায়ে টেনে আনে, তখনই ঘটে রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন, যা গ্রামের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। রাজনীতিকে গ্রামীণ পর্যায়ে টেনে আনার অর্থ মূলত জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন স্কুল অফ থট বা মতবাদকে গ্রামীণ সমাজে প্রবেশ করানো। এর প্রক্রিয়া হলো— যখন কোনো রাজনৈতিক মতবাদকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের জন্য বিতর্ক তৈরি করা হয়, অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার উপযুক্ত, তাদের পরিকল্পনা, নীতি, ইস্তেহার বা ম্যানিফেস্টো সবচেয়ে কার্যকর— এই বিষয়গুলো যখন গ্রামীণ সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তখনই তা রাজনীতির গ্রামীণ সামাজিকায়ন ঘটে।

[২]

জাতীয় রাজনীতির যেকোনো মতবাদ বা রাজনৈতিক চিন্তাধারা গ্রামীণ শান্তিকে বিঘ্নিত করতে পারে, গ্রামের স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে কলুষিত করতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামীণ পর্যায়ে দেখা যায়, অধিকাংশ বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, মারামারির মূলে রয়েছে এই রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ। কারণ, আপনাকে মনে রাখতে হবে যে গ্রামীণ মানুষ শহরের মানুষের মতো এতটা সমালোচনামূলক (critical) চিন্তা করে না। তাদের চিন্তাধারা প্রায়শই বাইনারি হয়ে থাকে—কোনো কিছু হয় একেবারে সঠিক, নয়তো সম্পূর্ণ ভুল। মাঝামাঝি কোনো জটিল বা বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি তারা সহজে গ্রহণ করতে পারে না। এরই প্রতিফলন ঘটে রাজনৈতিক মতবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রেও। তারা যাকে ভালো মনে করে, সেটাকেই একমাত্র সত্য বলে গ্রহণ করে, আর বিপরীত মতাদর্শকে শত্রু বা শয়তানি কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখে। ফলে শহরের তুলনায় গ্রামীণ সমাজে মতের বৈচিত্র্য ও সহনশীলতা অনেক কম। এই কারণেই রাজনৈতিক যে কোনো বিতর্ক গ্রামীণ সমাজের বাইরেই থাকা শ্রেয়; সেখানে এ ধরনের আলোচনা বেশি মানানসই।

[৩]

আমাদের বুঝতে হবে, নগররাষ্ট্রের ধারণা মূলত শহরকেন্দ্রিক। আগেকার নগর রাষ্ট্রের যে ধারণা তা মূলত যেকোন রাষ্ট্রের রাজধানী ও বড় শহর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। রাজধানী বা গুরুত্বপূর্ণ নগরীগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়। কিন্তু যখন গ্রামীণ সমাজে এই রাজনীতিকে অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়, তখন সেখানকার স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যায়, যা আমাদের ইতিহাসে বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।

এ কারণেই আমি মনে করি, সামাজিক অস্তিত্বের জন্য যত ধরনের হুমকি বিদ্যমান, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক হলো রাজনীতির গ্রাম্য সামাজিকায়ন। সামান্য পরিমাণেও এটি গ্রামীণ শান্তিকে ভঙ্গুর করে দিতে পারে এবং সমাজে স্থায়ী অস্থিরতার বীজ বপন করতে পারে।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...