[এক]
আমাদের সমাজে ব্যক্তি বিশেষ থেকে শুরু করে সমষ্টিগত পর্যায়ে সবাই রাজনীতি এবং রাজনীতির আলাপ নিয়ে সচেতন কিবা রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী , কিন্তু তারা নিজেরা সরাসরি রাজনীতি করে না বা রাজনীতিতে যুক্ত হতে পছন্দ করে না। যারা রাজনীতি করে, তাদেরকে অনেকে মন থেকে থেকে ঘৃণা করে এবং মনে করে যে রাজনীতির সাথে জড়িতরা দুর্নীতিগ্রস্ত, অথবা তারা দুর্নীতি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে না। এর ফলে, সাধারণ মানুষ নিজেদেরকে খুব একটা রাজনৈতিক বলে মনে করে না। তবে, তারা রাজনীতির গল্প শুনতে এবং এর খবরাখবর রাখতে ভালোবাসে। রাজনীতির প্রতি তাদের প্রচণ্ড আগ্রহের মূল জায়গা হলো ক্ষমতার কাঠামো এবং ক্ষমতার আশেপাশে যারা আছে তাদের নিয়ে আলোচনা ও গালগল্প করা।
[দুই]
পৃথিবীর ইতিহাসে ক্ষমতার প্রতি মানুষের এক ধরনের মোহ সবসময় ছিল। এই মোহ থেকেই কিছু মানুষ নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আরোহন করতে চাইত, এবং এ থেকে তারা ক্ষমতাশালী হয়ে একধরনের মানসিক শান্তি পেত। অন্যদিকে, আরেক দল মানুষ ক্ষমতার প্রতি লোভী ছিল না, কিন্তু ক্ষমতাকে নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক স্থিরতা বা অবসেশন কাজ করত। এই সরলীকরণের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রাজনীতির প্রতি তাদের মনোভাবকে ব্যাখ্যা করতে পারি।
বর্তমানে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই বিভিন্ন মাধ্যমে রাজনীতির খবর পেয়ে যায়। তারা টেলিভিশনে দেখে, বা আজকাল প্রায় সবার হাতেই স্মার্টফোন থাকায় ইউটিউবে প্রচুর রাজনীতির খবর জানতে পারে। এমনকি আমাদের মা-খালারা পর্যন্ত ইউটিউবের কল্যাণে নানা রাজনৈতিক খবর ও বিশ্লেষণ জানেন। মজার ব্যাপার হলো, জনপ্রিয় ইউটিউবারদের মধ্যে যেমন পিনাকী, ইলিয়াস, জাহেদ, নিঝুম সাহেব, কিংবা কিছু চিহ্নিত আওয়ামী লীগ সমর্থক ইউটিউবাররাও সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়। যদিও মানুষ সবসময় এদের কথাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না, তবুও তাদের কথাগুলো সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে।
কিন্তু কেন এমন হয়? এ প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ।
[তিন]
আমার মতে, কারণটি হলো, প্রচলিত টেলিভিশন চ্যানেল, মিডিয়া বা সরকারি প্রচারণা মেশিন সবসময় একই ধরনের কথা বারবার বলে, যা সাধারণ মানুষের কাছে একঘেয়ে এবং বিশ্বাসযোগ্যতাহীন মনে হয়। ফলে, পিনাকী বা ইলিয়াস সাহেবরা যখন বিরোধী বা সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে হয় যে কেউ তাদেরই মতো মানুষদের কথা তুলে ধরছে। এর ফলে, তাদের কথাগুলো মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলে, কারণ তারা সরাসরি সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলে। ফলে, পিনাকী বা ইলিয়াস সাহেবরা যখন বিরোধী বা সাধারণ মানুষের ভাষায় রাজনীতির কথা বলেন, তখন সাধারণ মানুষ মনে করে, হ্যাঁ, কেউ যেন তাদের চায়ের আড্ডায় বসে রাজনীতির খুঁটিনাটি তুলে ধরছে।
এখানে লক্ষণীয় যে, পিনাকী বা ইলিয়াস সাহেবদের চেয়ে দক্ষ সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রয়েছেন, যারা রাজনীতির জটিল দিকগুলোও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম, কিন্তু তবুও তাদের ভিউ বা জনপ্রিয়তার মাত্রা পিনাকী সাহেবদের তুলনায় অনেক কম। এর অন্যতম কারণ হলো, পিনাকী সাহেবরা সাধারণ মানুষের চায়ের টং বা গ্রামের আড্ডায় পৌঁছে গেছেন। তারা এমন ভাষায় কথা বলেন, যা একজন কৃষিজীবী, চাষি বা শ্রমিকও সহজেই বুঝতে পারেন।
পিনাকী সাহেবরা রাজনীতির "ক-খ" খুবই সাধারণ ও সহজভাবে উপস্থাপন করেন, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে মিল রেখে সাজানো হয়। এই সাধারণ ভাষায় কথা বলার ক্ষমতাই তাদের বক্তব্যকে মানুষের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। গ্রামের মানুষজন, যদিও রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন নন, তবুও রাজনীতির খবর জানার প্রবল আগ্রহ তাদের রয়েছে। তারা রাজনীতির সরাসরি অংশ হতে বা ক্ষমতায় আগ্রহী না হলেও, রাজনীতি নিয়ে তাদের ব্যাপক কৌতূহল কাজ করে। এটা দেখা যায় যে, রাজনীতির ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেক বেশি, তবে তারা নিজেরা সেই রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চান না, বরং রাজনীতির খবর ও বিশ্লেষণ শুনতেই বেশি আগ্রহী।
[চার]
গ্রামের সাধারণ মানুষ মুজিব আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানের আমল পর্যন্ত রাজনীতির ইতিহাস এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী সম্পর্কে সবসময়ই সচেতন থেকেছে। আগের দিনে রেডিও ছিল তাদের জন্য প্রধান তথ্যের উৎস। যারা পত্রিকা পড়তে পারত, তারা সেখান থেকে রাজনীতির খবরাখবর নিত।
সত্তরের দশকে রেডিও ছিল গণমানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তথ্যের প্ল্যাটফর্ম, আর বর্তমানে সেই ভূমিকা পালন করছে ইউটিউব এবং ফেসবুক। রেডিও, ইউটিউব, ফেসবুক, এবং টেলিভিশন মাধ্যমে আপনি লক্ষ্য করবেন, রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ অত্যন্ত গভীর। তবে তাদের এই আগ্রহ ক্ষমতার পালাবদল বা ক্ষমতার আসা-যাওয়া নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে। ক্ষমতায় কারা এলো, কারা গেল, এবং ক্ষমতায় কারা আছে—এই ধরনের খবরে তাদের অধিকাংশেরই আগ্রহ জন্মে, যা মূলত রাজনীতির প্রতি তাদের গভীর আকর্ষণের ফল।
আমার মনে হয়, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সাধারণ মানুষের রাজনীতি সম্পর্কে যে প্রবল আগ্রহ, তা যথাযথভাবে তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারেনি। টেলিভিশন এবং প্রিন্ট মিডিয়া মূলত শিক্ষিত, শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভাষায় কথা বলে। ফলে, এসব প্রচারমাধ্যম গ্রামের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আগ্রহ এবং চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, ইউটিউব এবং ফেসবুকের পিনাকী কিংবা ইলিয়াস সাহেবদের মতো ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের ভাষায় রাজনীতির গল্প তুলে ধরে এই চাহিদা সফলভাবে পূরণ করতে পেরেছেন। তারা যেভাবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করে, তা সেই মানুষের চায়ের টং পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
পিনাকী এবং ইলিয়াস সাহেবরা সাধারণ মানুষের ভাষায় রাজনীতির বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন, যা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও বোধগম্য মনে হয়। ষাট-সত্তরের দশকে রেডিও যেমন সাধারণ মানুষের কাছে রাজনৈতিক খবর পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, এখন ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সাররা একই ভূমিকা পালন করছে, গণমানুষের জন্য রাজনৈতিক তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে।
[পাঁচ]
প্রত্যেকটি গ্রামে আপনি দেখতে পাবেন যে, মাত্র এক বা দুই, তিনটা পরিবার রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকে, এবং সেই পরিবারগুলোর মধ্য থেকেই মেম্বার বা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয় বা গ্রামের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোকে এরাই নিয়ন্ত্রিত করে । ফলে এই পরিবার গুলা গ্রামীণ মানুষের রাজনৈতিক অনাগ্রহকে ব্যাপকভাবে ইউজ করে এবং অ্যাবিইউজও করে।
মজার বিষয় হচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষ কিন্তু ওই পরিবার সমূহের রাজনৈতিক অপতৎপরতা এবং দুর্নীতির কথা তারা জানে কিন্তু তারা প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করে না এর অন্যতম কারণ গ্রামের সাধারণ মানুষের রাজনীতি করার প্রতি অনাগ্রহ এবং অসচেতনতা। রাজনৈতিক খবরে তাদের আগ্রহ প্রচণ্ড।
তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে প্রায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষ, যেমন—চাচা, চাচি, কৃষক, চাষি, এবং গ্রামের মোড়ল, সবাই ইউটিউবে এসব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেখতে পান।
গ্রামের মানুষের রাজনৈতিক মনোভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হলেও তা কার্যকরীভাবে অংশগ্রহণের দিকে ঝোঁকেন না। তাদের মনে ক্ষমতা সম্পর্কিত যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা মূলত নেতিবাচক। তারা ক্ষমতাকে সবসময় দুর্নীতির সাথে যুক্ত করে দেখেন, এবং রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাদের ধারণা হলো—এরা দুর্নীতিবাজ, এবং নিজেদের স্বার্থের জন্য প্রতারণা করতে সক্ষম। ফলে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতি তাদের আগ্রহ একরকম খর্বিত হয়ে যায়। তারা কখনোই ভাবেনি যে, ক্ষমতা তাদেরও হতে পারে কিংবা সাধারণ মানুষও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে ক্ষমতাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে।
[ছয়]
গ্রামীণ জীবনে সামাজিক নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহের অভাব লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনের সমস্যাগুলো—যেমন জমি-জমা, পারিবারিক সম্পর্ক—এবং ছোটখাটো সামাজিক বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেয়। তাদের পারিবারিক বিষয়কে তারা আপন ভাবে, রাজনীতিকে তার অনেকটা প্রতিবেশীর পারিবারিক ঝামেলার মতো মনে করে এইটা নিয়ে কথা বলতে তারা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, মজা উপায় । চায়ের দোকানে বা ছোট টঙের দোকানে আলোচনাগুলো সাধারণত সমাজের বড় ব্যক্তিদের নিয়ে হলেও, এসব আলোচনা তাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে না।
গ্রামীণ মানুষের ওই রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব আসলে খুবই ইন্টারেস্টিং এবং গবেষণার বিষয়। আমরা কিছু কিছু ব্যক্তি মনে করি যে গ্রামীণ মানুষ খুবই সহজ এবং সরল আবার একটা গোষ্ঠী বলে গ্রামীণ মানুষ খুবই জটিল এবং কঠিন। এই কারণেই দেখবেন বিষয়টি এটা বলেই ভিলেজ পলিটিক্স। কিন্তু গ্রামীণ মানুষ ভিলেজ পলিটিক্স যে খুবই সরল এবং টানাটাকে বলা যায় গ্রামের সচ্ছল অংশেরই পলিটিক্স এইটা বলা যায়।
তাদের মনস্তত্ত্ব বোঝার জন্য শহরের মানুষকে গ্রামীন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে হবে। শহরের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে গ্রামীণ মানুষকে বিচার করলে তা ভুল ধারণা । এজন্য, গ্রামীণ বাস্তবতা, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং তাদের মূল্যবোধকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
[সাত]
গ্রামীণ সমাজকে সরলভাবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। গ্রামীণ মানুষের রাজনৈতিক মনোভাব একটি জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। তারা রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হলেও, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনাগ্রহী। ক্ষমতার প্রতি তাদের ধারণা সাধারণত নেতিবাচক, যা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। এ কারণে, গ্রামীণ সমাজের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা অনেকাংশে সীমাবদ্ধ। গ্রামীণ সমাজের এই রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করা ও তাদের মূল্যবোধ বোঝার জন্য গবেষণা ও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে, যা সমাজের রাজনৈতিক কাঠামোকে উন্নত করার পথ প্রশস্ত করবে।

No comments:
Post a Comment