প্রকৃতির অনুষঙ্গ ও সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবন



আকাশে প্রচণ্ড মেঘ। সন্ধ্যার আলো আঁধারে মেঘগুলো যেন আরও কুৎসিত  রূপ ধারণ করেছে। কালো ও ঘন হোক না কেন, আমার তা দেখতে ভালো লাগে। মেঘের একটা বার্তা থাকে—সে হয়তো বৃষ্টি নিয়ে আসবে, বা কোনো ঝড়। দুটোই আমার পছন্দ। মেঘকে আমি আগমনী বার্তা মনে করি। সে আগমন হয়তো বৃষ্টির রূপে, অথবা শুষ্ক শীতল বাতাস হয়ে মনকে ছুঁয়ে যায়। বৃষ্টি আমার খুবই প্রিয়। বৃষ্টির আগমনে আমি অন্তরে এক অতি আনন্দচ্ছল ঝড় অনুভব করি। এ ঝড়কে কেউ থামাতে পারে না, আমিও না।

একটা বাচ্চা যেমন মাকে অনেকক্ষণ পর দেখলে আনন্দে পা ছুঁড়ে নাচে, বৃষ্টির সময় আমার অবস্থাও তেমন হয়। এর কারণ আমি কখনও খুঁজিনি, খুঁজতেও যাইনি। হয়তো বৃষ্টির সাথে আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির সময় আমি কারো কথা মনে করি না—কারো না। আজকের এই  মেঘ আমাকে অনেক  কথা ভাবতে বাধ্য করেছে। ঝড়, মেঘ, বৃষ্টি এগুলো আমার খুব প্রিয়, খুব ব্যক্তিগত বিষয়। 

তবে একটা বিষয় খেয়াল করেছি—বৃষ্টির সময় আমার মন প্রচণ্ড উদ্দীপ্ত হয়। এই উদ্দীপনা মনের অবাধ্যতা এনে দেয়। হয়তো নিজেকে বিশাল কিছু মনে হয়, অথবা পুরো পৃথিবীর সাথে পৃথিবীর খুঁটিনাটি বিষয়কে মনের অভ্যন্তরীণ চিন্তার সাহায্যে বিশ্লেষণ  করে দেখার একটা আগ্রহ জাগে। ঝড়, মেঘ, বৃষ্টি—সবই প্রকৃতির অনুষঙ্গ । প্রকৃতির এই বিষয়গুলোর সাথে মানুষের সম্পর্ক অনেক গভীর। মানুষ প্রকৃতির কাছে অবসর তুল্য উপহার পেতে চায়। বৃষ্টির কারণে সেই আগ্রহটা বেড়ে যায়। ঝড়, মেঘ, বৃষ্টি এগুলো মনের এক উদ্দীপনা তৈরি করে।

আজকের সন্ধ্যার এই নিস্তব্ধ বিদ্যুৎ চমকানো, যেটাকে গ্রামের ভাষায় বিজলি পড়া বলে, যেন ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটের মতো সেকেন্ডে দুই-তিনবার আলো দিয়ে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে চারপাশ । আকাশ সাদা-কালো মেঘে আচ্ছাদিত। এই আকাশের কাছে আমাদের কিছু প্রত্যাশা থাকে। আকাশ তো কোন কাঠামো নয়, এরও একটা রঙ, রূপ, আকৃতি আছে। যদিও এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব দেখার মত সুযোগ নেই, আকাশ আসলে একটা রহস্য। যদিও বিজ্ঞানীরা এই রহস্যের সমাধান করেছেন, তবু আকাশ আমাদের কাছে এক অমীমাংসিত ভাবনায় বেঁচে থাকে।

আকাশ নিয়ে ভাবতে গিয়েই মনে আসে—আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে আকাশ নিয়ে কী ভাবি? সাধারণ মানুষরা ছোট ছোট বিষয়গুলোকে অনেক বড় করে দেখতে চায়। আকাশ, সূর্য, গ্রহ-তারা—এই সবই সাধারণ মানুষের কাছে খুব কাছের বিষয়। কেননা এগুলোই তাদের জীবনের অংশ। যেমন মেঘ, ঝড়, বৃষ্টি আমার কাছে খুব প্রিয় মনে হয়, ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষের কাছেও এগুলো খুব কাছের মতই।

আচ্ছা, বৃষ্টি, ঝড়, মেঘ, আকাশ, সূর্য, গ্রহ—এগুলোর বিশেষত্ব কী? সাধারণ মানুষ এগুলোকে জীবনের অংশ হিসেবে দেখে। জীবনে অন্তর্ভুক্ত  ভালোবাসা, ঘৃণা, আগ্রহ-অনাগ্রহ, চাঁদ-সূর্য যেন মানুষের মনের ভাষাহয়ে এই বিষয়গুলোকে  আরও গভীরভাবে প্রকাশ করতে পারে। তাইতো এই প্রকৃতির প্রতিটি বিষয় আমাদের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

আমার চিন্তার মাঝখানে সাব্বির সাহেব কল দিয়েছেন। সাব্বির একজন আত্মবিশ্বাসী ছেলে, যার নিজের প্রতি প্রচণ্ড বিশ্বাস। সে মনে করে, বড় কিছু করবে এবং সমাজের জন্য ভালো কিছু দেবে। কিন্তু বড় হওয়া আসলে কী, সেটা সে হয়তো জানে না। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই, আমরা হয়তো তাকে বোঝাইনি, বড় পদ মানে শুধুই সম্মান কিবা বিখ্যাত হওয়া  নয়; বড় পদের আলাদা গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে এ বিষয়গুলো তাকে বোঝাতে হবে আমাদের সমাজের সবাইকে । সাব্বিরদের মতো ছেলেদের আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা, প্রত্যাশা আমরা কি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি?

বাইরে একটা বাচ্চা খেলা করছে, হয়তো তার দাদি বা নানির সাথে। তার নিখুঁত হাসি একদিন হয়তো এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। পৃথিবী তাকে কুটিলতা, জটিলতা , দায়িত্ব, পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা দিয়ে বেঁধে ফেলবে, আর ধীরে ধীরে তার হাসি ম্লান হয়ে যাবে। পৃথিবী কি আমাদের জন্য বাধা? নাকি পৃথিবী নিজেই আমাদের জন্য বাধা  করে?নাকি আমরাও পৃথিবীর জন্য বাধা?  পৃথিবীতে মানুষের গুরুত্ব আসলে কী? মানুষের কাছে পৃথিবীর গুরুত্বটাই বা কী?

একজন সাধারণ মানুষ আসলে কী? সাধারণ ব্যাপারটাই কী? আর মানুষ বা কী? আমি যদি এর উত্তর খুঁজতে যাই, হয়তো এই সাধারণ মানুষের সংজ্ঞা আমার কাছে যেমন একরকম মনে হবে। তেমনি প্রত্যেকটা মানুষের কাছে আলাদা আলাদা ভাবে এই বিশেষায়নটা আলাদা রকম হবে। কারণ, সাধারণ মানুষ আসলে অসাধারণ। একজন সাধারণ মানুষ জানে কীভাবে জীবনটাকে সরলভাবে নিতে হয়; এ কারণেই তো সে অসাধারণ। অসাধারণ মানুষরা, যাদেরকে আমরা মেধাবী বা প্রতিভাবান হিসেবে দেখি, তারা কিন্তু জীবনে সাধারণ চাহিদাগুলো মেটাতেও হিমশিম সাধারণ মানুষদের চেয়েও সাধারণ । তাদের প্রতিভা যতটা না তাদের জীবনের আশা প্রত্যাশা কিবা জীবনের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে তাদের জন্য সহায়ক, ততটাই জীবন তাদের জন্য জটিল হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষ পারিবারিক বা ব্যক্তিগত জীবনে অসুখী ছিলেন। এই সাধারণ জীবনকেও তারা পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যর্থ ও ব্যর্থতায় পর্যবশত হয়েছেন। 

সাধারণ মানুষ জীবনকে জীবনের মতো চালায়। তাদের কাছে জীবনই সবকিছু—জীবনের চাওয়া, পাওয়া, আশা, আকাঙ্ক্ষা এসব তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে। তারা জীবনকে এতটাই গুরুত্ব দেয় যে জীবনের বাইরে অন্যান্য বিষয়কে সেকেন্ডারি  ভাবে। এজন্যই আমরা দেখি, একজন সাধারণ মানুষ কম আয়েও সুখে জীবনযাপন করে, এবং তার পরিবারও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। কারণ, সে জানে কীভাবে জীবনের প্রতিটি অনুষঙ্গ ও জীবনের প্রত্যেকটা সময় মুহূর্তকে  জীবনের মতো করে পরিচালনা করতে হয়। এ কারণে সে সাধারণ হয়েও, আসলে অসাধারণ।

এই পৃথিবী সাধারণ মানুষের। পৃথিবীর প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সাধারণ মানুষদের কেন্দ্র করে সাজানো। এমনকি পৃথিবীর সমস্ত অসাধারণ মানুষও সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর করতে কাজ করেন। পৃথিবী মূলত অসাধারণদের জন্য নয়, সাধারণদের জন্য। পৃথিবীর আকাশ, বাতাস, ঝড়, বৃষ্টি, মেঘ, চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, তারা এবং অন্যান্য সবকিছুই সাধারণ মানুষদের জন্যই সজ্জিত।  বিখ্যাত মানুষেরাও সাধারণ মানুষদের জন্যই পৃথিবীকে গড়ে তোলেন।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...