নতুন প্রজন্মের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা: সামাজিক হস্তক্ষেপ ও স্বাধীনতার সংঘাত



মানুষ সাধারণত নিজের সম্পর্কে কম ভাবে, বরং অন্যের জীবন নিয়ে ভাবতে বেশি পছন্দ করে। অন্যের ভুল-ত্রুটি, ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামানো মানুষের স্বভাব। এই "নাক গলানো"কে আমরা নেতিবাচকভাবে দেখলেও, আসলে এটি সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া। যখন আপনি সমাজে বসবাস শুরু করেন, তখন কিছু নিয়ম ও আচরণ মেনে চলতে হয়। সমাজে সামাজিক সদস্য হিসেবে টিকে থাকতে হলে এই নাক গলানোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।  

সমাজ কখনই সমাজ হয়ে ওঠে? এর জন্য কিছু পূর্বশর্ত প্রয়োজন, যার মধ্যে অন্যতম হলো পারস্পরিক সহযোগিতা (মিউচুয়াল কোঅপারেশন) এবং পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া (মিউচুয়াল ইন্টারেকশন)। এই দুটিই মূলত নাক গলানোর মাধ্যমেই ঘটে। সুতরাং, নাক গলানো খারাপ কিছু নয়, বরং এটি একটি ইতিবাচক প্রক্রিয়া। আপনার সমাজে নাক গলানো থাকা মানে আপনার সমাজ সক্রিয় ও জীবন্ত। সমাজের কার্যকারিতা নির্ভর করে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার উপর, আর এই মিথস্ক্রিয়া তখনই সম্ভব যখন আমরা অন্যের জীবন নিয়ে ভাবি।  

আধুনিক পুঁজিবাদী যুগে, যেখানে ভোগবাদ ও পণ্যের মূল্য মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেখানে নাক গলানোর বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখা স্বাভাবিক। পুঁজিবাদ মানুষকে সমষ্টি থেকে ব্যক্তিতে পরিণত করতে শেখায়। এটি মানুষকে শেখায় কীভাবে নিজের জন্য বাঁচতে হয়, অন্যকে উপেক্ষা করতে হয় এবং কেউ যদি তাদের জীবনে হস্তক্ষেপ করে তবে তা নিন্দনীয় বলে মনে করতে হয়।  

পুঁজিবাদী সমাজে বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপ (ইন্টারফেয়ার) থাকলেও, আধুনিক ভোগবাদী সমাজ এই হস্তক্ষেপকে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজে আপনি সমাজের অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারবেন, কিন্তু সমাজের গতিশীলতা অনুভব করতে পারবেন না। কারণ, পশ্চিমা সমাজে নাক গলানোর অভাব রয়েছে। এই কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোর সামাজিক সদস্যরা একে অপরের নাম পর্যন্ত জানেন না।  

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় অগ্রগামী। কিন্তু তাদের সামাজিক কাঠামো তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুই দেশের নাগরিকরা সামাজিক হওয়ার চেয়ে বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা একটি মৃত সমাজের লক্ষণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, সাহিত্য ও সামাজিক মাধ্যমও আমাদেরকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে শেখায়। প্রত্যেকে নিজের আলাদা জগৎ তৈরি করে, যেখানে সে নিজেই কেন্দ্রবিন্দু। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাকে আমরা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (ইনডিভিজুয়ালিজম) বলি, যেখানে ব্যক্তি মুখ্য এবং সমষ্টির চেতনা গৌণ।  

মানবিক সংযোগ (হিউম্যান কানেকশন) বা মানবিক সম্পৃক্ততার জন্য পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি এটাকে নাক গলানোর মাধ্যমে সরলীকরণ করেছি। নাক গলানো সমাজের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে এবং সমাজকে টিকিয়ে রাখে। সমাজের প্রতিটি স্তরে আমাদের চিন্তা ও নাক গলানো প্রয়োজন। এটাকে আমরা সামষ্টিক দায়বদ্ধতা বা সামাজিক প্রাসঙ্গিকতার প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারি।  

মজার বিষয় হলো, আপনি যখন অন্যের ব্যাপারে নাক গলান, তখন আপনি এটাকে সহানুভূতি ও সম্পৃক্ততা হিসেবে দেখেন। কিন্তু যখন অন্যরা আপনার ব্যাপারে নাক গলায়, তখন আপনি এটাকে আপনার ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করেন। সমাজের এই দ্বৈততা চিরাচরিত। কিন্তু কখন থেকে আমরা নাক গলানোর বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখতে শুরু করেছি? এই পরিবর্তন মূলত ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু হয়, যখন মানুষ নিজেকে একটি আলাদা সত্তা হিসেবে ভাবতে শুরু করে।  

পুঁজিবাদ ও ভোগবাদ মানুষের সামাজিক চিন্তাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তায় রূপান্তরিত করেছে। তথ্যের বিশাল প্রবাহ ও ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষকে আরও বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলেছে। ফলে, মানুষ সমাজের অনেক কিছুকে বাতিল করে দিয়েছে। বর্তমান সমাজে একা থাকার ইচ্ছা বা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা দোষের কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সমাজব্যবস্থায় এই প্রবণতা একটি মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে।  

বাংলাদেশের সমাজে ভোগবাদ ও পুঁজিবাদের প্রভাব থাকলেও, এটি এখনও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক চিন্তাকে আঁকড়ে ধরে আছে। নতুন প্রজন্ম, যারা পশ্চিমা ভোগবাদী ও পুঁজিবাদী চিন্তায় প্রভাবিত, তাদের সাথে পুরোনো প্রজন্মের মধ্যে একটি মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব দেখা যায়। এই নতুন প্রজন্ম ব্যক্তিকেন্দ্রিক, একাকীত্বপূর্ণ, স্বার্থপর, ভোগবাদী এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। তারা নাক গলানোর বিষয়টিকে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করে।  

এই নতুন প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য হলো তারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তারা তাদের ব্যক্তিসত্তাকে এমনভাবে রক্ষা করতে চায়, যেমনভাবে পুরোনো প্রজন্ম তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করে। এই পার্থক্য একটি সামাজিক বহিঃপ্রকাশ, যা নতুন ও পুরোনো প্রজন্মের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। নাক গলানোর বিষয়টি নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে হয়, যা তাদের সামাজিক চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...