অধিকার, ইতিহাস ও আধিপত্যবাদ: মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ এবং আমাদের সবার ইতিহাস

 


















[এক]

আপনি একটা বাদ/মতবাদ/চিন্তাধারা/চেতনাই  বিশ্বাস ও লালন করবেন এবং এই চেতনা সবাইকে বিশ্বাস করার জন্য তাগিদ দেবেন। যদি আপনার হাতে ক্ষমতা থাকে, তাহলে জোর করে চাপিয়ে দিবেন অথবা আপনার হাতে ক্ষমতা না থাকলে আপনি গোসসা করে বলবেন কেন তোরা এই চিন্তা লালন করবি না? এইটাকে বলে সাম্রাজ্যবাদী বা আধিপত্যবাদী চিন্তাধারা।

পলিটিক্যাল দৃষ্টিতে, এটি "সাম্রাজ্যবাদ" (imperialism) বা "আধিপত্যবাদ" (hegemonism) হিসেবে চিহ্নিত হয়। এটি তখন ঘটে যখন একটি গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র নিজেদের সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ধারণা বা বিশ্বাসকে অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এটি সাধারণত সামাজিক বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে এবং মানুষের ভিন্ন চিন্তাধারার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করে, যতই তারা নির্দোষ ও নিষ্পাপ নির্যাতিত হয়ে আসুক না কেন।

তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি "এককত্ববাদ" (monism) বা "একক সত্যের তত্ত্ব" (theory of singular truth) হিসেবে পরিচিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একমাত্র একটি সত্য বা ধারণাবা ইতিহাসই সঠিক এবং বৈধ, যা অন্য সব বিশ্বাস ও মতামতকে খারিজ করে। এই তত্ত্ব  মতে ইতিহাসের একটা সরলিকরণ করা হয়, ইতিহাসকে একক সত্যের মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, ওই মাপকাঠির বাইরে যে কোন ইতিহাসকে বাতিল বলে গণ্য করা হয়। 

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের চিন্তাধারা "সামাজিক আধিপত্য" (social hegemony) বা "সংস্কৃতিক আধিপত্য" (cultural hegemony) হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই ধারণা উক্ত সমাজের একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা শ্রেণী তাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং অভ্যাসগুলোকে সমাজের উপর চাপিয়ে দেয়, ফলে অন্য গোষ্ঠী বা সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য সৃষ্টি হয়।


[দুই]

দেখেন, আমার ওপরের এই কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে, প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের মতো পত্রপত্রিকা কিংবা আমাদের যারা এতদিনের মুক্তিযুদ্ধের বয়ান তৈরি করে আসছে, তাদের যে চেতনা, তাদের তৈরি করা মুক্তিযুদ্ধের যে ঐতিহাসিক বয়ান, সেটা তারা আমাদেরকে গিলতে বলেছে কোন রূপ যৌক্তিকতা ছাড়াই, কোনরূপ বাছ-বিচার ছাড়াই, ঐতিহাসিক কোন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ ছাড়াই। দেখেন, ইতিহাস সব সময় লেখা হয় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায়। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস, এই ইতিহাসকে ক্ষমতাসীন যেকোনো সরকার, দলভুক্ত সংস্কৃতিমনা এবং সুশীল সমাজের গণ্যমান্য সদস্যরা তাদের বয়ানে লিখেছে। এবং তারা এই বয়ানকে গত ৫০ বছর ধরে শিক্ষার্থী ও বাংলার সব শ্রেণীর পেশার মানুষকে, যারা নতুন প্রজন্ম, তাদেরকে পড়তে হয়েছে এবং এই ইতিহাসকে বিশ্বাস করতে হয়েছে এবং ইতিহাসের বাইরে কোন চিন্তাকে স্থান দেওয়া হয়নি, কোন ভিন্ন মত গ্রহণ করা হয়নি। এবং কোন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা আঙ্গিক ইতিহাসকে বাতিল করে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, আপনি তাদের যে হেজেমনিক/আধিপত্যবাদী মানসিকতা আমরা এটা দেখে আসছি গত পঞ্চাশ বছরের যে কোন সরকারের আমলে। 

দেখেন, বাংলার ইতিহাস এই ৫০ বছরের ইতিহাস নয়, বাংলার ইতিহাস হাজার বছরের ইতিহাস। এই বেঙ্গল বদ্বীপ যত দিনের, এই বাঙালির ইতিহাস তত দিনের। আমরাই তো বলি হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি। এই হাজার বছরের বাঙালি পরিচয়কে অগ্রাহ্য করা হয়েছে ও অবহেলা করা হয়েছে গত পঞ্চাশ বছরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গিয়ে। এবং আমাকে আপনাকে এমনভাবে বলা হয়েছে যেন আমি ও আপনি এই ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে আমার পূর্বপুরুষ ও  বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও অভ্যুদয় ঘটেছে। হাজার বছরের সংস্কৃতি ও বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে কি কোন নায়ক মহানায়ক ছিল না? সামাজিকতা ছিল না? আমাদের সংগ্রামমুখর জীবনের কোন ইতিহাস কি ছিল না? এইরূপ কি কোনো ইতিহাস ছিল না? তাহলে কেন আমাদের এই গত ৫০ বছরের ইতিহাসকে গ্রহণ করতে বলা হচ্ছে, সেই হাজার বছরের ইতিহাসকে ভুলে থাকতে বা ইতিহাসের প্রতি উদাসীন হতে শেখানো হচ্ছে?


[তিন]

এই যে গত ৫০ বছরের মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ, সেখানে কেন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও সংগ্রামময়  ইতিহাস কে  এক পাশে রেখে বাংলাদেশের অভ্যুদয় যে ১৯৭১-ই হয়েছে, এই বিষয়টা তারা বার বার মনে করিয়ে দেয়? এবং ইতিহাসকে কেন আমাদের সবাইকে  বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে?

১৯৭১-কে আমরা বলতে পারি প্রত্যক্ষ কোন বৈদেশিক  শোষক ও নির্যাতকের বিরুদ্ধে আমাদের শেষ মহাসাগ্রাম। এই মহা সংগ্রাম আমাদের বিদেশি হায়েনা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার সংগ্রাম। এই সংগ্রাম আমাদেরকে একটা ভূখণ্ড, আলাদা জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই সংগ্রামে কারো তার কৃতিত্ব নাই, আরো একার অধিকার নাই, এই দেশ যতদিন থাকবে, ১৯৭১ ততদিন থাকবে। ১৯৭১ আমার আপনার সবার। ১৯৭১ সালের বয়ানে কোন একক কৃতিত্ব দাবি করবে এবং ওই দাবির পেছনে একটা আলাদা বয়ান তৈয়ার করবে এবং করেছে এরা যেমন আধিপত্যবাদী ঠিক তেমনি ১৯৭১-কে যারা বাতিল বলে গণ্য করবে, এরাও ইতিহাসকে নিজেদের বয়ানে তৈরি করতে চাই এবং  এরাও ওই আধিপত্যবাদী মহাশক্তিধর স্বৈরশাসকদের মতোই সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যবাদী । ১৯৭১ আমাদের মুক্তির মহা সংগ্রাম। 


[চার]

এই দেশ আমার-আপনার-সবার। এই দেশের মাটি, মানুষ ও ইতিহাসে সবার সমান স্টেক রয়েছে। এই দেশের ইতিহাসের প্রত্যেকটি ঘটনা, সংগ্রাম ও দাসত্বের ইতিহাস এবং গৌরবের অর্জন আমাদের সবার ইতিহাস। এই ইতিহাসে কারো একার নয়। এই ইতিহাস কারো একার বয়ানে তৈরি হবে না। এই ইতিহাস লেখা হবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, সবার বিশ্বাস ও সম্মিলিত ধারণায়। আপনি এক গোষ্ঠীকে মহানায়ক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবেন এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীকে আপনি নির্লিপ্ত ও অগ্রাহ্য করবেন আমার  তৈয়ারকৃত ঐতিহাসিক ন্যারেটিভে, সেই ঐতিহাসিক ন্যারেটিভকে সাধারণ জনতা প্রত্যাখ্যান করবে।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...