ইস্কুল বা বিদ্যাগৃহ হলো একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যা সমাজের মোরাল গ্রাউন্ড প্রতিষ্ঠা করবে। একে আমরা সোশ্যালাইজেশন ইনস্টিটিউট বা সোস্যাল মোরাল ফ্যাক্টরি বলেও অভিহিত করতে পারি।
এই মোরাল গ্রাউন্ডে জীবনের সমস্ত পজিটিভ আচরণের সমষ্টি অন্তর্ভুক্ত হবে, যেমন—শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসা, সিমপ্যাথি, এম্পাথি, পরিচ্ছন্নতা, সহানুভূতি, সহযোগিতা, সততা, ক্ষমাশীলতা, সময়নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য এবং নম্রতা।
অন্যদিকে, এই মোরাল গ্রাউন্ডে আরও ডিফাইন করা হবে নেগেটিভ বা ইমমোরাল আচরণও। সুতরাং, নেগেটিভ আচরণ বা ইমমোরালিটি কি হতে পারে? উদাহরণস্বরূপ—অহংকার, ভ্রষ্টাচার, জিদ, অলসতা, নির্লিপ্ততা, অমার্জিত আচরণ, দুঃসাহসিকতা, অশোভন, অন্যকে অবহেলা করা, দলবাজি, মিথ্যাচার, দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা, নিষ্ঠুরতা, অসহিষ্ণুতা, এবং অন্যদের উপহাস করা।
এখন, প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কীভাবে এই পজিটিভ ও নেগেটিভ মোরালিটি ডিফাইন করবো?
এই নৈতিক আদর্শ (পজেটিভ ও নেগেটিভ মোরালিটি) সংজ্ঞা বা ডিফাইন হবে, সেই স্কুল বা সমাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে, যেখানে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে সমাজ যদি ধর্মকে গুরুত্ব দিতে চাই তবে মোরালিটি অবশ্যই ধর্ম থেকে আসবে এবং না আসলেও সমস্যা নাই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ডিফাইনকৃত মোরালিটি গুলোর বাস্তবায়ন হবে স্কুলে পড়া প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীকে সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নৈতিকতা প্র্যাকটিস করিয়ে। এবং, এই প্র্যাকটিস এমনভাবে করা হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী তার সারা জীবন এই নৈতিকতা নিয়ে সত্য ও সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনা করতে পারে।
ইস্কুল বা বিদ্যাঘরের ধারণা হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে আমার মূল্যবোধ ও ধারণার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া, এবং একই সাথে তাকে পৃথিবী ও সমাজের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। অর্থাৎ, তাকে তার পরিবেশ বা সমাজ-পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিকভাবে গড়ে তোলা। এটি আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কান্ডারী হিসেবে প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া, যারা তাদের পৃথিবী ও সমাজ সম্পর্কে মজবুত জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করবে।
এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে? উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো শিশুরা যাতে মৌলিক জ্ঞান ও ভালো মানসিকতা অর্জন করে, যেমন—সহানুভূতি, দায়িত্বশীলতা। মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের চিন্তা-ভাবনা এবং একাডেমিক দক্ষতা বাড়ানো, যাতে তারা ভবিষ্যতে সমাজে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
এই ধরনের জ্ঞান হবে মানবিক এবং সমাজ সংশ্লিষ্ট জ্ঞান, যা আসবে মূলত প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণাগুলো থেকে। এই জ্ঞানগুলো হবে এমন তথ্য যা বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য এবং সময়ের সাথে অপরিবর্তনশীল।
এছাড়া, এই জ্ঞান হবে ইউনিভার্সেল এবং সর্বজনীন, যা মানবাধিকার, সমাজ ও সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং মনস্তত্ত্ব সম্পর্কিত ধারণা প্রদান করবে। এই জ্ঞানগুলো ছাত্র-ছাত্রীদের বিশ্বজনীন সত্যতা, যুক্তি এবং মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে তোলে, যাতে তারা সমাজে সক্রিয়, দায়িত্বশীল, এবং প্রগতিশীল সদস্য হিসেবে পরিণত হয়।
এর জন্যে প্রয়োজন প্রাইমারি ও হাই স্কুল লেভেলের শিক্ষায় ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের তুলনায় ভাষা ও মানবিকতা অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া। ভাষার মাধ্যমে মানুষ যেকোনো জ্ঞান বা ধারণাকে নিজের ভিতরে গ্রহণ এবং তার অস্তিত্ব প্রকাশ করতে পারে। প্রাইমারি ও হাই স্কুল স্তরে ভাষা ও মানবিকতার গুরুত্ব এতটাই ব্যাপক যে, এই দুইটির অবহেলা আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থী এবং আগামী প্রজন্মের সোশ্যালাইজেশনের ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা ও ডিসফাংশন সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের ডিসফাংশন থেকে এমন একটি প্রজন্মের উদ্ভব হতে পারে, যারা চিন্তা ও চেতনায় সংকুচিত এবং সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে অগ্রসর হতে বাধাগ্রস্ত হবে।
.jpeg)
No comments:
Post a Comment