ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বিশ্বে কি প্রভাব পড়তে পারে!

[এক]

বাংলাদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার প্রভাব পড়তে পারে কি না, তা ভিন্ন কথা; কিন্তু বিশ্বে এর ব্যাপক প্রভাব দেখা যাবে। আমেরিকান প্রভাব বিশ্বজুড়ে কমবে, যা নিয়ে ট্রাম্পের বিশেষ চিন্তা নেই। তিনি মূলত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগী থাকবেন এবং আমেরিকার অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেবেন। এজন্য নীতি বা পলসি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনি অভ্যন্তরীণ গুরুত্ব দিবেন এবং এইটাতে খুবই আক্রমণাত্মক থাকবেন, যেমনটা তার প্রথম মেয়াদেও দেখা গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, woke culture নিয়ে বড় বিতর্ক দেখা দেবে। বাইডেন প্রশাসনে এই woke culture অনেক প্রভাব বিস্তার করেছিল, যা আমেরিকান বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনায় প্রবলভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। ট্রাম্প এদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। আমেরিকান সমাজ অনেক আধুনিক ও প্রগতিশীল হলেও, এই ultra-liberal-woke আন্দোলন এতটাই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গিয়েছিল যে জনগণকেও তাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের জয়ে woke culture-এর বিরুদ্ধে একটি প্রবল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। ফলে আল্ট্রা ওক কালচার বা আল্ট্রা লিবারেল আরো বেশি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষ্যাপা হয়ে থাকবে।  এতে ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই ব্যস্ত থাকবেন, এবং আমেরিকান প্রশাসনের সাথেও কিছুটা বিরোধে পড়বেন, যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রভাব বিস্তারে বাধাগ্রস্ত করবে।

[দুই]

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ট্রাম্প আসার ফলে যুদ্ধ কমতে পারে। তিনি পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি এলে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার চেষ্টা করবেন। রাশিয়া নিজেও চায় না যে এই যুদ্ধ স্থায়ী হোক এবং ট্রাম্পের সাথে রাশিয়া তুলনামূলক বেশিই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাই ট্রাম্প যেভাবেই হোক পুতিনকে রাজি করিয়ে ইউক্রেন সংকটে সমাধান আনতে পারেন। এতে ইউক্রেনকে কিছুটা ছাড় দিতে হতে পারে এবং হয়তো ট্রাম্পের আমলেই ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আমরা দেখতে পাব অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট জেলনেস্কির মেয়াদ হয়তো শেষের পথে।  ইউরোপও যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে বাধ্য হবে। ইরাক থেকেও হয়তো পুরোপুরি সৈন্য সরিয়ে আনবেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করবেন, তবে সামরিক সরঞ্জামের আমদানি হয়তো আরো বাড়বে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পুরোপুরি থামবে না। ইসরাইল আরো আগ্রাসী হতে পারে, কিন্তু তাদেরও কিছু ছাড় দিতে হতে পারে,  এক্ষেত্রে হয়তো তাকে লেবানন থেকে নিয়ে আসতে হতে পারে কিবা গাজা হতেও । তবে হামাসের জন্য ট্রাম্প অবশ্যই কঠোর এবং ভয়ংকরই হবেন। সৌদি আরবের সাথে তার সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হবে, কেননা তার জামাতা জ্যারেড কুশনার সৌদি যুবরাজ MBS-এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। দুবাইয়ের MBZ-এর সাথেও তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে, ফলে আরব আমিরাতের সাথেও সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এর ফলে সুদান ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ আরও স্থায়ী হতে পারে। তুলনামূলক কম প্রভাবশালী দেশগুলো বাইডেন ও ওবামা প্রশাসনের আমলে যে ধরনের আমেরিকান  domination বা প্রভাবের অধীন ছিল, তা অনেকটাই কমে যাবে, এবং তারা স্বাধীনভাবে তাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োগ করতে পারবে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন, কারণ তিনিই একমাত্র আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, যিনি উত্তর কোরিয়ার কোনো উচ্চ পর্যায়ের নেতার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন। এক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়াকে হয়তো সামরিক সাহায্য কমিয়ে দিতে পারেন অথবা সামরিক সাহায্য দিলেও সে ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়া কে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। 

[তিন]

যদি ট্রাম্প কোনো দেশের জন্য হুমকি হয়ে থাকেন, তবে সেটি হলো চীন। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে চীনের সাথে আমেরিকার একটি তীব্র বাণিজ্যিক যুদ্ধ শুরু হবে, এবং এতে চীন কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের দিকে আরো ঝুঁকতে পারে, কারণ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও তারা চীনের সাথে সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। ট্রাম্পের চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে সংঘাত হওয়া নিশ্চিত, এবং চীনও সেটি জানে। সুতরাং ট্রাম্প যদি কারো জন্য হুমকি হয়ে থাকেন, তবে সেটি চীন। তাইওয়ান ইস্যু আরও গুরুত্ব পাবে এবং ট্রাম্প প্রশাসন চীনকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে এটি কাজে লাগাবে। ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে পারে, এবং মোদি প্রশাসনও এই সম্পর্ক কাজে লাগাতে পারে চীনের বিরুদ্ধে। চীন-বিরোধী জোটগুলো আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হবে বলেই মনে হয়। 

[চার]

যে যাই বলুক, বাংলাদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় নির্বাচনের সরাসরি বড় প্রভাব না পড়লেও কিছুটা প্রভাব দেখা যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, ড. মুহাম্মদ ইউনুস বড় কোনো ঝামেলায় পড়বেন না বলেই মনে হয়। ভারতীয় লবি বা অনেক বাংলাদেশি মনে করেন যে ট্রাম্প ড. ইউনুসের বিরোধী, এবং মোদি প্রশাসন হয়তো ট্রাম্পকে কাজে লাগিয়ে ইউনুস-বিরোধী কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা কম, কারণ ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ইউনুসের বিরোধী হলেও, আমেরিকান প্রশাসন মূলত ইউনুসের পক্ষেই থাকবে। ফলে এই বিষয়ে ট্রাম্প খুব বেশি সক্রিয় হবেন না।

সর্বোচ্চ যা ঘটতে পারে, তা হলো আওয়ামী লীগ হয়তো নিষিদ্ধ হবে না এবং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা বাংলাদেশি রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ এনে দিতে পারে। তবে সবচেয়ে ট্র্যাজিক যে ঘটনাটা ঘটবে সেইটা হচ্ছে জুলাই আগস্টের গণহত্যার বিচার হয়তো থমকে যাবে এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর আরও বেশি করে সক্রিয় হয়ে যাবে।  অন্যদিকে, ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর উপর আক্রমণের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে—বিশেষত হিন্দু, বৌদ্ধ, বা খ্রিস্টানদের উপর হামলার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং এটা যারাই করুক না কেন ভারত এসব ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প কে দিয়ে আরও বাংলাদেশ-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করাতে পারে।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...