[1]
মানুষ এখন বয়ান বা ওয়াজ শুনে তার ভালো লাগা না লাগা থেকে। মানুষ, এখন যারা খাঁটি, সহি কথা বা ওয়াজ করছেন বা বলছেন, তাদের গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং যার বয়ানে সে তৃপ্তি পায় , সেই বয়ানই সে শুনছে। অথচ বয়ান বা ওয়াজ মূলত শেখার জন্য, মানার জন্য। মানুষ এখন নিজের সন্তুষ্টির জন্যই ওয়াজ বা বয়ান শুনছে। ধর্মীয় যে বয়ান, তা হওয়া উচিত ছিল আত্ম-সংশোধনের জন্য এবং নিজের বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করার জন্য। কিন্তু এখন এই বয়ান ভিন্ন আঙ্গিকে, শুধু তৃপ্তি পূরণের জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে। অনেকটা যেমন গান মানুষকে মানসিক তৃপ্তি দেয়, ঠিক সেই রূপে মানুষ ওয়াজ বা বক্তব্য শুনে মানসিক তৃপ্তি পেতে চাচ্ছে। বয়ান বা ওয়াজ মূলত বিনোদনের অংশ হিসাবই মানুষ এইটাকে নিচ্ছে।
[2]
এখন এত ওয়াজের বা বক্তা কেন সমাজে? এর অন্যতম কারণ হলো মানুষ বিনোদন চায়, মানুষ ভিন্নতার মধ্যে নিজের সন্তুষ্টি চায়, মানুষ নিজেকে ব্যতিক্রম দেখাতে চায়। ব্যক্তি ও সমাজ এখন যতটা না সংশোধিত হতে চায় বা নিজের সমস্যার সমাধান করতে চায়, তার চাইতে বেশি প্রাসঙ্গিক বা রিলেটেড থাকতে চায়। অর্থাৎ সব জায়গায়তে জালসা ও ওয়াজ হচ্ছে, সুতরাং আমাদেরও ওয়াজ ও জালসার আয়োজন করতে হবে। এবং এমন কোনো এক ওয়াজের বা বক্তাকে নিয়ে আসতে হবে, যিনি ভাইরাল বা আলোচিত। ফলে এই ক্যাটাগরিতে জেনুইন ওয়াজ ও বক্তারা বাদ পড়ে যাচ্ছেন। আপনি যদি বর্তমানে জেলা শহর বা গ্রামীণ যে ওয়াজ মাহফিলগুলো দেখেন, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখবেন অধিকাংশ ওয়াজ মাহফিলের অতিথি এবং বক্তারা সাধারণত সমাজ বা রাষ্ট্রের আলোচিত ব্যক্তিত্ব। এদের মধ্যে অনেকেই নতুন মুখ, যাদের সামাজিক মাধ্যম বা মিডিয়াতে খুবই পরিচিত বা ভাইরাল মুখ। এখন বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে শিল্পী শ্রেণি, যারা ইসলামিক গান গায় বা ইসলামিক কৌতুক করে, এদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে, এটা ঠিক। তবে আমাদের ভাবতে হবে যে মানুষের চিন্তা-ভাবনারও একটা ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
[3]
আগের গ্রাম বাংলার যে ওয়াজ মাহফিলগুলো আমরা দেখেছি বা শুনেছি, সেগুলোতে খুবই অপরিচিত এবং বিজ্ঞ আলেম সমাজকে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হতো। মানুষ তরিকতের ও ইসলামিক মন মানসিকতার সঙ্গে এসব মাহফিলে অংশগ্রহণ করত। কিন্তু দিন দিন এটা কমে যাচ্ছে। আপনি দেখবেন, যেসব জায়গায় জেনুইন ওয়াজ মাহফিল করার চেষ্টা করা হয় এবং কোনো এক অপরিচিত আলেমকে নিয়ে আসা হয়, যিনি মিডিয়া বা ভাইরাল নয়, সেখানে দর্শক-শ্রোতা শূন্যের কোটায় থাকে। মানুষ এসব জলসায় যেতে চায় না। ফলে আলেম সমাজ ও বক্তারাও এমন ধরনের ওয়াজ করেন যাতে মানুষকে ইমপ্রেস করা যায়, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। এজন্য এমন সব কথা বলেন, যাতে তিনি আরও ভাইরাল ও পরিচিত হয়ে যান। এটা খুবই বাজে একটা প্র্যাকটিস।
[4]
এখন জালসা অনেকটা মেলা কেন্দ্রীক হয়েছে। মূলত জালসার নামে বিশাল আকারের মেলা বসানো বেড়ে যাচ্ছে দিনদিন। এবং এই মেলায় আমার মনে হয় বাজার ও অনৈসলামিক কাজই বেশি হয়। উঠতি বয়সী ছেলে- মেয়ে, তরুণ, কিশোর গ্যাংদের মারামারি-ঝগড়া খুবই কমন ব্যাপার যে কোনো জালসায়। আপনি এমন একটা জালসা পাবেন না, যেখানে কিশোর গ্যাং ঝগড়া করবে না এবং সেই জালসা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পূর্ণ হবে। জলসাগুলো তার আগের সেই ইসলামিক জৌলুস হারিয়ে গেছে। জলসা বা ওয়াজের যে একটা ইসলামিক ভাইব থাকতো, এইটা আর দেখা যায় না।
[5]
অনেকেই বলবেন, জালসা তো হচ্ছে, মানুষ তো কিছু ভালো কথা শুনছে; এটা ঠিক আছে। কিন্তু জালসা বা ওয়াজ মাহফিলের যে মূল স্পিরিট, তা হারিয়ে যাচ্ছে এবং হারিয়ে যেতে বসেছে। আমার মতে, জলসা ওয়াজ-মাহফিল মসজিদকেন্দ্রিক করে দেওয়া উচিত। দশটা গ্রাম মিলে একটাই জালসা হবে – এই ধরনের একটা সীমাবদ্ধতা আনা উচিত। এবং ওয়াজ মাহফিলে পরিচিত ওয়াজকারী বা বক্তা ডাকার চেয়ে যারা জ্ঞানী, গুণী ও বিজ্ঞ আলেম তাদেরই ডাকা উচিত। অবশ্যই স্থানীয় আলেম ওলামাদের পরামর্শে আলেম বা ওয়াজকারী নির্ধারণ করা উচিত। এবং জালসাতে অবশ্যই ভাইরাল, পরিচিত মুখ, কৌতুক করে এমন ওয়াজের, আলতু ফালতু কথা বলে এমন ওয়াজের ও বক্তা, এদেরকে এভোয়েড করা উচিত।

No comments:
Post a Comment