১.
কোরআনের একটা বিখ্যাত আয়াত রয়েছে সুরা জাসিয়াতে সেখানে আল্লাহ বলছেন
أَفَرَأَيْتَ مَنِ ٱتَّخَذَ إِلَـٰهَهُۥ
"তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার খেয়াল-খুশিকে তার উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে?" (Surah Al-Jathiya, 45:23)
এবং তারপর পরেই আল্লাহ বলছেন যে তাকে আল্লাহ জ্ঞান আসার পরও পথভ্রষ্ট করেছেন। এই আয়াতের তাফসীরে বিষয়টাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে "একজন যে তার ইচ্ছা ও প্রবৃত্তিকে উপস্য বানিয়ে নিয়েছে, সেটাকেই সে ভাল মনে করে, যেটাকে তার প্রবৃত্তি ভাল মনে করে এবং সেটাকেই সে মন্দ মনে করে, যেটাকে তার প্রবৃত্তি মন্দ মনে করে। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের যাবতীয় বিধি-বিধানের উপর স্বীয় প্রবৃত্তির চাহিদাকে প্রাধান্য এবং তার জ্ঞান-বুদ্ধিকে বেশী গুরুত্ব দেয়। অথচ জ্ঞান-বুদ্ধিও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অথবা স্বার্থপরতার শিকার হয়ে প্রবৃত্তির মত ভুল ফায়সালাও করতে পারে। একটি অর্থ এর এই করা হয়েছে; যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ হতে অবতীর্ণকৃত পথনির্দেশ ও দলীল ছাড়াই স্বীয় মনমর্জির দ্বীন অবলম্বন করে।(তাফসীরে আহসানুল বায়ান)
মানুষের প্রবৃত্তি, জ্ঞান, বুদ্ধি, চাহিদা—এসবই মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে, বিশেষত উত্তর আধুনিক যুগে, যেখানে ইনডিভিজুয়ালিজম (ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ) এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার জয়জয়কার। এই আয়াতের অর্থ আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি, কারণ আজকের সমাজে মানুষ ধর্মীয় প্রথা, বিধান বা সামাজিক নীতি-নৈতিকতার যে কোনো কোডকে অবহেলা করে, নিজেকেই ত্রাতা হিসেবে দেখতে চায়। সে নিজের জীবনের নিয়ম নিজেই তৈরি করতে চায়, তার মন যা চায় তা-ই করবে, এবং তার খুশি ও সন্তুষ্টির জন্য যে কোনো সীমা অতিক্রম করতেও দ্বিধা করবে না। বর্তমান সমাজে অনেক সময় মানুষ ধর্মীয় প্রথা, সামাজিক নীতি-নৈতিকতা বা প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের বিধানগুলোকে অবহেলা করে চলে। সে নিজেকে ত্রাতা মনে করে এবং নিজের জীবনযাপনের নিয়মকানুন নিজেই নির্ধারণ করতে চায়।
২.
এ ধরনের আচরণের সমস্যা হলো, এতে সমাজের চিরাচরিত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। সমাজ মূলত একটি কমন ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলার উপর ভিত্তি করে চলে, যা সেই সমাজের অধিকাংশ মানুষের ধর্ম এবং প্রথার দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই ডিসিপ্লিন বা সামাজিক মূল্যবোধগুলো সমাজের স্থিতিশীলতা ও সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রার জন্য অপরিহার্য। যখন মানুষ এককভাবে নিজের ইচ্ছার অনুগামী হয়ে যায় এবং শৃঙ্খলা মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সমাজের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায় এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
আমি পরে কথাগুলো এই কারণেই বললাম যে বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ অনেক সময় বিশৃঙ্খল এবং স্বেচ্ছাচারিতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে।
৩.
এই যুগের আলেম ও ইসলামিক স্কলারদের অবশ্যই মাথায় রাখা উচিত যে, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের চিন্তা, চেতনা, ভাবনা, এবং চিন্তার প্রকাশ ও বিকাশের ধরনও আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। মানুষের চিন্তার ধারা, তাদের মতামত প্রকাশের পদ্ধতি, এবং জ্ঞানের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আজ আর আগের মতো নেই। তাই আলেমদেরও এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং তাদের দাওয়াহ ও শিক্ষা কার্যক্রমে যুগোপযোগী পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।
আজকের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, বিশেষত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা, তাদের চিন্তাচেতনার প্রকাশ ও বিকাশে একটি নতুন ধারা তৈরি করেছে। তারা ধর্মীয় বা ধার্মিক ব্যক্তিদের গোঁড়া ও রক্ষণশীল মনে করে, অথচ তারাই অনেক ক্ষেত্রে ততটাই উগ্র হয়ে থাকে। নিজেদেরকে অতিরিক্ত জ্ঞানী ও চিন্তুক মনে করে।
বর্তমানে অনেক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি মনে করেন, তারা সবকিছু জানেন এবং মাদ্রাসায় পড়া শিক্ষার্থীরা শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ বা ধর্ম সম্পর্কিত বিষয় ছাড়া অন্য কিছু পড়ে না। তাদের ধারণা, ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের জীবনবোধ বা পৃথিবী সম্পর্কিত জ্ঞান আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি এবং তারা এখনো "ব্যাকডেটেড" বা পিছিয়ে আছে। এই ধারণা থেকেই অনেক আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি নিজেদের "সুপিরিয়র" বা শ্রেষ্ঠতর মনে করে, যা এক ধরনের সুপেরিয়রিটি কমপ্লেক্স তৈরি করে।
এর ফলে, তারা মাদ্রাসা পড়ুয়া বা কওমি শিক্ষার্থীদের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করে এবং তাদের অর্জিত জ্ঞানকে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। অথচ, ধর্মীয় জ্ঞানও মানুষের জীবন ও সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তারও একটি নিজস্ব মর্যাদা ও গুরুত্ব রয়েছে। এই দুই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এই দূরত্ব ও ভুল ধারণাগুলো দূর করা প্রয়োজন, যাতে একটি সমন্বিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে।
আলেমদের কে বোঝা উচিত যে পৃথিবীর মানুষ তার চিন্তা চেতনায় এবং প্রবৃত্তির দাসত্বে খুবই উগ্র এবং নৈরাজ্যবাদে মৌলবাদী। তারা ধর্ম-সমাজ-রাষ্ট্র এবং এর দ্বারা তৈরিকৃত সমস্ত নিয়ম কানন জীবনাচরণকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাতে চাই সুতরাং তাদেরকে আমাদের দাওয়াতের আওতাভুক্ত করতে চাইলে অবশ্যই আমাকে তার চিন্তার কাউন্টার হিসেবে ইসলামকে তার সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
No comments:
Post a Comment