মানবসমাজের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মানুষের বেঁচে থাকার জীবনসংগ্রামে প্রতিযোগিতা, সংগ্রাম, যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উপস্থিত। যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, মানুষ একে অপরের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর প্রবণতা প্রদর্শন করেছে। ইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই আমরা এই চিত্র দেখতে পাই, মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে, রক্তপাত ঘটিয়েছে, ধ্বংস ও ধ্বংসলীলায় লিপ্ত হয়েছে। এই সহিংসতা কখনো একই জাতির মানুষের মধ্যে, কখনো ভিন্ন জাতির মধ্যে, কখনো একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে, আবার কখনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। প্রেক্ষাপট বদলালেও মানুষের এই বৈশিষ্ট্য ,সংঘাতপ্রবণতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত অপরিবর্তিত থেকেছে। ইতিহাসের আলোকে বিচার করলে যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ বলেই প্রতীয়মান হয়।
আপনি যতই ইতিহাস পাঠ করুন বা প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবনধারা নিয়ে গবেষণা করুন না কেন, মানবইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই আপনি মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ধ্বংস এবং আধিপত্যের লড়াই লক্ষ্য করবেন। অনেক সময় এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ বা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি যে এই সংঘর্ষগুলো নিজ গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সীমানার বাইরের ‘অপর’ এর সঙ্গে বেশি সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এই চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এখন ভিন্ন গোষ্ঠী বা ধর্মের বা 'অপরের' সঙ্গে সংঘর্ষের চেয়ে একই জাতির ভেতরে, একই রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যেই দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা অধিক প্রাধান্য পাচ্ছে। একে বলা যায় আন্তঃগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, স্বজাতি দ্বন্দ্ব কিংবা আন্তঃধর্মীয় সংঘর্ষ।
এই প্রবণতাটি মূলত বিংশ শতাব্দীর পর থেকে স্পষ্টভাবে বিকশিত হতে শুরু করে। এ সময় ন্যাশনাল স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের ফলে স্বজাতির মধ্যে সরাসরি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পূর্বের তুলনায় অনেকাংশে কমে যায়। বিংশ শতাব্দীর পূর্বে যেখানে গোত্রে-গোত্রে বা স্বজাতির মধ্যেই ব্যাপক সহিংসতা দেখা যেত, সেখানে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই ধরনের সংঘর্ষ তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়। একই সঙ্গে মানুষ নিজেদের পরিচয়কে বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে সংজ্ঞায়িত করতে শেখে যার নাম দেওয়া হয় রাষ্ট্র বা জাতিরাষ্ট্র। এই জাতিরাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোতে গণতন্ত্রকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিক বা গোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানোর একটি সম্ভাব্য সুযোগ তৈরি হয়। তবে একই সঙ্গে এই ব্যবস্থায় একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতাও অনিবার্য হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে এক গোষ্ঠী থেকে অন্য গোষ্ঠীর হাতে স্থানান্তরিত হয়। যে গোষ্ঠী জনসমর্থন, কৌশল বা সাংগঠনিক শক্তিতে অন্যদের ছাড়িয়ে যেতে পারে, সে-ই ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করে। এর ফলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ লাভ করে। বলা যায়, মানুষের ঐতিহাসিক যুদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রবণতাকে গণতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে এনে ‘সভ্য’ ও বৈধ রূপ দিয়েছে।
তবে এর সঙ্গে সঙ্গে একটি নতুন সমস্যারও জন্ম হয়। যদিও রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যুদ্ধ এখনো বিদ্যমান, তবু একই দেশের মানুষ, একই জাতি কিংবা একই ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই একটি স্থায়ী শত্রুতার মানসিকতা গড়ে ওঠে। এই মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনীতির মাধ্যমে সচেতনভাবে তৈরি ও উসকে দেওয়া হয়।
ডেমোক্রেসির দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পারস্পরিক লড়াইয়ের ধারণাটিকে সবচেয়ে স্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এই ব্যবস্থাতেই। অন্যান্য শাসনব্যবস্থাতেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রে এই দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতাকে একটি বৈধ ও কাঠামোবদ্ধ রূপ দেওয়া হয়।
এখানেই গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত সংকটটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থা মানুষকে কেবল ভিন্নমতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, ধীরে ধীরে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। রাজনৈতিক মতভেদ সামাজিক ও মানসিক বৈরিতায় রূপ নেয়। একসময় মতের অমিল নয়, বরং মানুষ নিজেই মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই অর্থে বলা যায়, গণতন্ত্র মানুষের সহজাত দ্বন্দ্বপ্রবণ বা যুদ্ধপ্রবণ মানসিকতাকে নতুন করে সৃষ্টি করেনি; বরং সেই প্রবণতাকেই রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করেছে।

No comments:
Post a Comment