গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বাংলাদেশ !

স্ট্রং ইকোনমিক দেশগুলোতে ডেমোক্রেসি সাধারণত ভালোভাবে কাজ করে এবং তুলনামূলকভাবে বেশি ইফেক্টিভ হয়। কিন্তু দুর্বল অর্থনীতি, কম শিক্ষা, এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশে ডেমোক্রেসি প্রায়ই ব্যর্থ হতে বাধ্য। এবং ডেমোক্রেসির এই ব্যর্থতা পুরোটাই সেই দেশের জনগণের উপর বর্তায়। যদিও একটি গণতন্ত্রের কার্যকারিতা তার জনগণের উপরই নির্ভর করে এবং জনগণই নির্ধারণ করে গণতন্ত্র কীভাবে পরিচালিত হবে, তবুও বাস্তবতা হলো গণতন্ত্রের সফলতা বা ব্যর্থতা অনেকাংশে একটি দেশের জনগণের চিন্তাভাবনা, চেতনা, শিক্ষা এবং সামগ্রিক মানসিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গণতন্ত্র মানুষকে একটি ক্ষণস্থায়ী চেতনা দেয় ,এই অনুভূতি যে সে নিজেই তার নেতা নির্বাচন করতে পারছে। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা শুরু হয় এই নির্বাচনের পর। নির্বাচিত নেতার চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকার অনেক ক্ষেত্রেই তার জনগণের চিন্তা ও চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈপরীত্য এতটাই গভীর হয় যে নেতা ও জনগণের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী গ্যাপ তৈরি হয় চিন্তার গ্যাপ, চেতনার গ্যাপ এবং উন্নয়নের গ্যাপ। এই গ্যাপ পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ প্রায়ই নিজেদের বঞ্চিত, নির্যাতিত ও বৈষম্যের শিকার বলে মনে করে। এই কারণেই কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই পুরোপুরি সফল বলা যায় না। এমনকি সবচেয়ে সফল গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও জনগণকে গণতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করতে দেখা যায়।  
অর্থাৎ, গণতন্ত্র যেমন কিছু সাফল্য তৈরি করে, তেমনি তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে গভীর ও কাঠামোগত ব্যর্থতা।


ঠিক ওপরের এই লেখাটাকেই বা যুক্তিকে আমরা যদি বাংলাদেশী প্রেক্ষাপটে তুলনা করতে যাই তবে আমাদের গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বাংলাদেশের যে শিরোনাম এটাকে আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারব কেননা বাংলাদেশ একটি অতিরিক্ত জনবহুল দেশ, আয়তনে ছোট, জনসংখ্যা বিশাল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাপক অশিক্ষা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা, শক্তিশালী কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক এস্টাবলিশমেন্ট, স্ট্রং বুরোক্রেসি কিন্তু উইক ম্যানেজমেন্ট। তার ওপর রয়েছে অশিক্ষিত রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দল, যাদের দুর্নীতি ও দালালির ইতিহাস দীর্ঘ এবং গভীর। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে ডেমোক্রেসি কার্যকর হয় না, হয়নি, এবং নিকট ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। গত পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখা যায়, ডেমোক্রেসির মান ক্রমাগত অবনতি হয়েছে। তবে একই সময়ে মানুষ আরেকটি বিষয় উপলব্ধি করেছে: একটি শক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কিংবা শক্ত হাতে রাষ্ট্র পরিচালনা, সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে এবং জনগণের চিন্তাচেতনাকে উন্নয়নমুখী করতে পারে, শর্ত একটাই, সেই নেতৃত্ব যদি দুর্নীতিমুক্ত হয়। সমস্যা হলো, গত পনেরো বছরে আমরা এমন কোনো শাসন পাইনি। ডেমোক্রেসিহীন শাসন হলেও তা দুর্নীতিতে ডুবে থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনার সেই সম্ভাবনাটিও নষ্ট হয়েছে।

আমি এখানে স্বৈরশাসন বা ডিক্টেটরশিপের পক্ষে কথা বলছি না। আমি বলছি বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ডেমোক্রেসি , বুরোক্রেসি এবং মিলিটারি ক্যাপাসিটির মধ্যে একটি কার্যকর মেলবন্ধন। এমন একটি সমন্বিত কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার ভারসাম্য থাকবে। শুধুমাত্র নেতা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়া, এই বাস্তবতায় ক্রমশ একটি ভয়ংকর ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।


No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...