প্যানিক পলিটিক্স ও আল্ট্রা সেক্যুলার এলিট শাহবাগী!

 

এক.

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইনে নারী নিপীড়ন, হেনস্তা এবং ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের নামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসছে। তবে প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনা কি আকস্মিকভাবে বেড়ে গেছে, নাকি আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়ার হার বেড়েছে? বিষয়টি সরল নয়, বিগত সময়েও নারীরা শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তবে বর্তমানের পার্থক্য হলো এসব ঘটনা শহরকেন্দ্রিক এবং মিডিয়ার কাভারেজের আওতায় আসছে। একইভাবে, অন্যান্য অপরাধ যেমন চুরি, ছিনতাই এগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই, ঘটনাগুলোর অধিকাংশই ঢাকা ও আশপাশের শহরকেন্দ্রিক। প্রায় প্রত্যেকটা ঘটনায় দ্রুতই মিডিয়া কভারেজ পাচ্ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া ছড়িয়ে যাচ্ছে। এটি কি নিছকই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে?  আমার কাছে মনে হয়েছে এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক, সামাজিক, সংস্কৃতিক ও তামুদ্দনিক  ক্ষমতার লড়াই। 

দুই.

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী শহুরে এলিট শ্রেণী আধিপত্য বিস্তার করেছিল,যারা নিজেদেরকে হাজার বছরের খাঁটি বাঙালি পরিচয় দিয়ে এসেছে।  যাদের অনেকেই বামপন্থী, সেক্যুলার বা লিবারেল দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। গত দুই-তিন দশক ধরে তারা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশি সমাজকে প্রভাবিত করেছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, টিভি-সিনেমা ও একাডেমিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এদের অনেকে শাহবাগী, সুশীল,বা প্রগতিশীল বলে পরিচিত হলেও, এদের আসল পরিচয় হলো—তারা ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক হেজেমনি প্রতিষ্ঠাকারী শ্রেণী। 

এই শ্রেণী একটি ডি-ফ্যাক্টো (de facto) বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল, যেখানে তারাই নির্ধারণ করত, কীভাবে বাংলাদেশি সমাজ চিন্তা করবে, কোন নৈতিকতা গ্রহণযোগ্য হবে, এবং কোন বিশ্বাস বা রীতিনীতি আধুনিকতার মানদণ্ডে টিকবে। সাধারণ জনগণ তাদের এই একচেটিয়া আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করলেও, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমর্থনের  এবং, ডেমোক্রেসির অনুপস্থিতির ফলে তারা এটি বজায় রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে হাসিনা শাহীর সাথেই এই এলিট শ্রেণীর ক্ষমতার পতন ঘটে। তারা বুঝতে পারে যে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের হেজেমনিক ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাদের স্থানচ্যুতি ঘটেছে। ফলে তারা একটি নতুন কৌশল গ্রহণ করছে—গণমাধ্যম এবং নগরভিত্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

তিন.

এই সাবেক কালচারাল ফ্যাসিস্ট এলিট শ্রেণী এখন এক ধরনের প্যানিক পলিটিক্স (panic politics) বা আতঙ্ক-সৃষ্টির রাজনীতি অনুসরণ করছে। তারা প্রচার করছে যে, নারীদের স্বাধীনতা ভয়াবহ হুমকির মুখে, রাস্তাঘাটে নারীরা নিরাপদ নয়, ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বাড়ছে, এবং বাংলাদেশ আরও রক্ষণশীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এটা সত্য যে, সমাজে নারীরা নিপীড়নের শিকার হয়, এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোও নারীবিরোধী বক্তব্য দেয়। তবে প্রশ্ন হলো, এই সাবেক এলিট শ্রেণী হঠাৎ করে নারী অধিকারের বিষয়ে এত উদ্বিগ্ন হলো কেন? এর উত্তর নিহিত রয়েছে তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টায়। তারা চায় একটি সামাজিক মেরুকরণ সৃষ্টি করতে, যেখানে একদিকে থাকবে তথাকথিত প্রগতিশীল গোষ্ঠী এবং অন্যদিকে থাকবে  রক্ষণশীল বা ইসলামপন্থী গোষ্ঠী। এই মেরুকরণের মাধ্যমে তারা নিজেদের হারানো রাজনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে চায়।

ফলে তারা শহরকেন্দ্রিক ঘটনাগুলোকে সামনে এনে জাতীয় পর্যায়ে সংকট তৈরি করতে চায়। তাদের কৌশল হলো মিডিয়া ও সংস্কৃতি জগতে আধিপত্য বজায় রাখা, নারীবাদী ও সেক্যুলার এজেন্ডাকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের উপর প্রভাব বিস্তার করা  ইসলামপন্থীদের সাথে দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়া, যাতে সমাজের দুই প্রান্তে দুটি চরমপন্থী অবস্থান তৈরি হয় এবং তারা নিজেদের  আধুনিক ও মানবিক গোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে,  রাজনৈতিক পুনরুত্থান ঘটানো। সমাজে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাষ্ট্রকে বাধ্য করা যাতে তারা সাংস্কৃতিক পরিসরে আবারও জায়গা ফিরে পায়। তাদের এই পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছে শহরে আরবান নারী ও সামাজিক মাধ্যম ইউজ করা নারীরা। 

চার.

বাংলাদেশে নারী নিপীড়ন, ধর্মীয় উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সংঘাত নিছকই সামাজিক ঘটনা নয়—এটি একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের লড়াই। সাবেক শহুরে এলিট শ্রেণী তাদের হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে প্যানিক সৃষ্টি করছে, এবং শহরকেন্দ্রিক বাস্তবতাকে ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। আমাদের এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে শুধুমাত্র মিডিয়ার প্রচারিত চিত্র নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করা হবে। না হলে, আমরা শুধুমাত্র এক শ্রেণীর প্রোপাগান্ডার শিকার হবো এবং বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব হবে না।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...