বাংলাদেশের রাজনীতি: বিরোধিতার সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ







১.

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধিতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা যেন এক অনিবার্য বাস্তবতা। আমরা রাজনীতিকে এমনভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, এক দল অপর দলের বিরুদ্ধে লেগে থাকাই যেন রাজনীতির মূল চেহারা। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রতিপক্ষকে শুধু বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করে, যা প্রায়শই ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সংঘাতে পরিণত হয়। এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এতটাই তীব্র যে, রাজনীতির সুস্থ পরিবেশই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা একে অপরকে সহ্যই করতে পারে না; সুযোগ পেলে হয়তো প্রতিপক্ষকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতেই উদ্যত হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই চরম বিরোধিতার শেকড় কোথায়? বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিক বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু তা কি শুধু ঘৃণার ওপর ভিত্তি করে চলবে? ৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হলেও এই বিদ্বেষমূলক রাজনীতির পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বরং বিরোধিতা আরও চরম রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেন এখন আদর্শ বা নীতির লড়াই নয়, বরং ব্যক্তিগত আক্রমণ, ষড়যন্ত্র ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার এক নোংরা খেলা।


২.

একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শ, নীতি ও পরিকল্পনার প্রতিযোগিতা। জনগণ তখন বিচার করতে পারবে, কোন দলের নীতি ও দর্শন দেশের জন্য উপযোগী। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় সরকার পরিবর্তন হয় জনগণের রায় অনুযায়ী, যেখানে আদর্শের প্রতিযোগিতায় যোগ্য দল জয়ী হবে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আদর্শ মানুষের কাছে তুলে ধরার পরিবর্তে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচারে বেশি মনোযোগী। ফলাফল—জনগণ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃত আদর্শ সম্পর্কেই জানে না।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক শিক্ষার অভাব। জনগণকে রাজনীতির শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর, কিন্তু দলগুলোর মধ্যেই রাজনৈতিক পরিপক্বতা নেই। তাদের রাজনীতি একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গোষ্ঠীসংঘর্ষে রূপ নিয়েছে, যেখানে নীতি ও আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা দখলই প্রধান লক্ষ্য। এই অদূরদর্শী রাজনীতির কারণে দলগুলো জনগণের পরিবর্তে অগণতান্ত্রিক শক্তির কাছে আশ্রয় নেয়—ভারত, সামরিক বাহিনী কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী শক্তির সমর্থন লাভের চেষ্টা করে। জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে ক্ষমতায় যাওয়ার এই প্রবণতাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে।


৩.

ফলশ্রুতিতে, আমরা এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস করছি যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিণত হয়েছে এক ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষে। প্রতিদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমরা দেখি, দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রেষারেষি ও বিদ্বেষ কেবল বাড়ছে। এই সংস্কৃতি থেকে মুক্তি না পেলে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ সম্ভব হবে না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝাতে হবে—রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং জনগণের কল্যাণের জন্য আদর্শ ও নীতির প্রতিযোগিতা। অন্যথায়, আমাদের রাজনীতি শুধুই দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর বিশৃঙ্খলার একটি চক্র হয়ে থাকবে। তাদের এই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেখানে ঘৃণা বিদ্বেষ ও শুধুই বিরোধিতার ছড়াছড়ি, এই রাজনীতি দেখতে দেখতে বাংলার জনগণ খুবই বিরক্ত এবং তাদের এগুলো দেখতেও দৃষ্টিকটু।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...