ধর্ম বনাম সমাজ












১.
সমাজ হলো মানুষের বিচরণ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার স্থান। সমাজের মূল উপাদান বা এলিমেন্টস হলো মানুষ এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। এগুলোর বাইরে সমাজে যা কিছু আছে, সেগুলো গৌণ উপাদান। ওভারঅল দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি বিচার করি তাহলে দেখতে পাবো এই গৌণ উপাদান গুলা থাকলেও চলে, না থাকলেও চলে। শুধু মানুষ এবং তাদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াই একটি সমাজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে পারে। 

সুতরাং, সাধারণভাবে বলা যায় যে, সমাজে ধর্ম একটি অপরিহার্য বা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নয়। অর্থাৎ, ধর্ম ছাড়াও একটি সমাজ তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে। ধর্ম না থাকলেও সমাজ চলতে পারে। কারণ, ধর্মের মূল উপাদান হলো বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসের গতিপ্রকৃতি। একটি সমাজের যদি কোনো কেন্দ্রীয় বিশ্বাস ব্যবস্থা (কোর বিলিভ সিস্টেম) না-ও থাকে, তবুও তা টিকে থাকতে পারে। কিন্তু যখন একটি সমাজের কেন্দ্রীয় বিশ্বাস ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তখনই তা ধর্মে রূপ নেয়। আর সমাজের কোর বিলিভ সিস্টেম গড়ে ওঠে সমাজের  ব্যক্তিবর্গের সম্মিলিত চিন্তাধারায়।

তাই বলে কি আমরা সমাজ থেকে ধর্মকে অস্বীকার করব  এবং ছুঁড়ে ফেলে দিব? উত্তর হচ্ছে, না। আপনি করতে চাইলেও এটা কখনোই করতে পারবেন না, কারণ ধর্মের ভিত সমাজের থেকেও স্ট্রং এবং স্বাধীন। 


২.
আমরা দেখলাম যে সমাজের অস্তিত্বে ধর্মের ভূমিকাটা পরে আসছে। সুতরাং এখন ধর্মের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। মজার বিষয় হচ্ছে ধর্মের উদ্ভব মানুষের ব্যক্তিগত চিন্তা জগৎ থেকে। মানুষের আভ্যন্তরীণ চিন্তা-ভাবনা এবং বিশ্বাসের জগতই ধর্মের ভিত্তি তৈরি করে। দেখেন মানুষের আন্ত-ব্যাক্তিক চিন্তা এতবেশি ঈশ্বরপ্রবণ যে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না ।  অর্থাৎ একজন মানুষকে তার ঈশ্বর নিয়ে ভাবতেই হবে জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে, এটা একটা স্বাভাবিক ওয়েতে এই চিন্তাটা মানুষকে জারি রাখতে হয়। মানুষের চিন্তার একটি স্বাভাবিক প্রকাশ হলো কোনো সর্বোচ্চ সত্তা বা সুপ্রিম পাওয়ারকে মেনে নেওয়া বা তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা অথবা তার চিন্তার কোন পর্যায়ে লজিক্যাল ওয়েতে ওই ঈশ্বর বা সুপ্রিম পাওয়ার কে রিজেক্ট করে দেওয়া । একটি সমাজ যতই ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মহীন হোক না কেন, একজন ব্যক্তি কখনোই সম্পূর্ণ ধর্মহীন হতে পারে না। কারণ, প্রত্যেক মানুষেরই কিছু না কিছু বিশ্বাস বা বিশ্বাস ব্যবস্থা থাকে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সর্বোচ্চ শক্তিতে বিশ্বাস করলেই কি তাকে ঈশ্বর বা খোদায় বিশ্বাস করতে হবে? উত্তর হলো, তা নয়। কারণ, একজন নাস্তিকেরও কিছু বিশ্বাস থাকে, যা তাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পরিচালিত করে। নাস্তিকের ধর্মই হলো ঈশ্বরের অস্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা। সে ঈশ্বরের অনুপস্থিতিকে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ঠিক একইভাবে, একজন আস্তিকের ধর্ম হলো ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস, এবং সে এই বিশ্বাসকে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।


৩.
সুতরাং, সমাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো মানুষ এবং তাদের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে, ধর্মের উৎস হলো ব্যক্তির আন্তরিক বিশ্বাস ও বিশ্বাস ব্যবস্থা। এখানেই মানুষ ঈশ্বর, ঈশ্বরের গুণাবলি, শক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। একটি সমাজের নিজস্ব কোনো স্বাধীন চিন্তা বা বিশ্বাস ব্যবস্থা নেই। সমাজ নিজে থেকে চিন্তা করতে পারে না। সমাজের ব্যক্তিবর্গই চিন্তা করে, এবং তাদের চিন্তার সমষ্টিই সমাজের চিন্তা হিসেবে প্রকাশ পায়। সুতরাং, একটি সমাজের অধিকাংশ মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস ব্যবস্থাই সমাজের বিশ্বাসকে সংজ্ঞায়িত করে। তখনই সমাজ ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, সমাজের অধিকাংশ মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এটি নির্ধারিত হয়। একটা সমাজের অধিকাংশ মানুষ আস্তিক হবে কিংবা নাস্তিক হবে সেটা ওই সমাজের অধিকাংশ ব্যক্তিবর্গের চিন্তার সমষ্টির ফল অর্থাৎ সমাজের অধিকাংশের বিশেষ ব্যবস্থায় সমাজের ধার্মিক বা  অধার্মিকতা ঠিক করে দেয়।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমরা অনুভব করেছি যে সমাজ ধর্ম ছাড়া চলতে পারে ও মানুষই সমাজ তৈরি করলেও, ধর্মকে মানুষ বা সমাজ তৈরি করে না। বরং, মানুষ স্বপ্রণোদিত হয়ে ধর্মকে অনুভব করে, সে ধর্মের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে চাই বা স্বীকার করতে চাই না এটাই অনুভব করা। সমাজের ব্যক্তিবর্গ ধর্মীয় বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখে, তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্ম একটি স্বাধীন বাস্তবতা, যা মানুষের ইচ্ছাধীন নয়। মানুষ চাইলেও কিবা না চাইলেও ধর্মের অস্তিত্ব, ঈশ্বরের ধারণা বা কোনো সুপ্রিম পাওয়ারের চিন্তার অস্তিত্ব তাকে স্বীকার করতেই হয়।

অন্যদিকে, সমাজ হলো মানুষের তৈরি এবং মানুষের উপর নির্ভরশীল একটি প্রতিষ্ঠান। যদি ধরে নিই, পৃথিবীর সব ব্যক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল অর্থাৎ, সবাই আলাদাভাবে বসবাস করতে লাগল এবং পৃথিবী সমাজহীন হয়ে গেল ও মানুষ সমাজের অস্তিত্ব ভুলে গেল, তাহলেও ধর্ম টিকে থাকবে, কারণ ধর্মের অস্তিত্ব সমাজের উপস্থিতির উপর নির্ভরশীল নয়। এখানেই ধর্মের নিত্যতা এবং তার স্বতন্ত্র বাস্তবতার সূত্র নিহিত।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...