মানুষের ব্যক্তিগত ব্যস্ততা কীভাবে সামাজিক অনুষ্ঠানাদি, উদযাপন (ধর্মীয় উদযাপনও ) গুলোকে প্রভাবিত করছে?


[১]
এর আগে আমাদের বুঝতে হবে, সামাজিক ব্যস্ততা আসলে কী? সামাজিক ও ব্যক্তিগত ব্যাস্ততার তুলনামূলক চিত্রও! 
আমরা ব্যক্তিগত ব্যস্ততা বলতে বুঝি ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তা-চেতনা, পারিবারিক কার্যক্রম এবং আন্ত-ব্যক্তিক সম্পর্কের সাথে সম্পর্কিত সমস্ত কার্যকলাপ। যখন কেউ গভীরভাবে ব্যক্তিগত কাজে নিমগ্ন থাকে, তখন সেটাকে ব্যক্তিগত ব্যস্ততা বলা হয়। যদিও কিছু ব্যক্তিগত কার্যক্রম সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, তবে তা প্রকৃত অর্থে সামাজিক ব্যস্ততা নয়। কারণ, এখানে ব্যক্তির নিজস্ব স্বার্থ এবং উদ্দেশ্য মুখ্য থাকে। অর্থাৎ, এটি সমাজের সামগ্রিক ইন্টারঅ্যাকশনের পরিবর্তে মূলত one-to-one relationship with the social people or social kinship of the person-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই ব্যক্তিগত ব্যস্ততা বলতে ব্যক্তির নিজস্ব পরিবেশ এবং তার সাথে সম্পর্কিত সকল ব্যক্তিগত কার্যক্রমকে বোঝানো হয়।

[২]
এবার প্রশ্ন আসে, সামাজিক ব্যস্ততা কী? সমাজের মানুষ যখন নির্দিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, যা সমষ্টিগতভাবে সমাজকে প্রভাবিত করে এবং গতিশীল রাখে, তখন আমরা তাকে সামাজিক ব্যস্ততা বলতে পারি। সমাজ নিজেই একটি গতিশীল কাঠামো; কোনো স্থির সমাজ আসলে dead society। প্রতিটি জীবন্ত সমাজে কিছু না কিছু কার্যক্রম চলতে থাকে, যা সামাজিক সম্পর্ক, বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে।

সামাজিক ব্যস্ততার অন্যতম উদাহরণ হলো ঈদের নামাজ, পূজা পার্বণ, ইফতার পার্টি, বৈশাখ উদযাপন, নৌকাবাইচ বা নির্বাচনী ভোট। এই ধরনের ইভেন্টে সমাজের বৃহৎ অংশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং এটি সামাজিক সংহতির প্রতিফলন ঘটায়। আবার, যখন এই ধরনের কার্যক্রম আয়োজন করতে গিয়ে একাধিক কার্যক্রম একসাথে সংঘটিত হয়, তখন সেটাকে সামাজিক ব্যস্ততা বলা যায়।

[৩]
তবে, বর্তমান সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ক্রমশ সামাজিক ব্যস্ততাকে প্রতিস্থাপন করছে। মানুষের জীবন এখন অত্যন্ত আন্ত-ব্যক্তিক হয়ে উঠেছে, যার ফলে সামাজিক ইন্টারঅ্যাকশনের প্রতি স্বাচ্ছন্দ্য কমে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক উদযাপন নিয়ে একধরনের discipline-এর অভাব দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে তা alien or foreign cultured হয়ে উঠছে। ফলে, পুরাতন প্রজন্ম একে মেনে নিতে পারছে না, আবার নতুন প্রজন্মও সামাজিকভাবে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী নয়, যার ফলে সামাজিক দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এর প্রতিফলন আমরা ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। আগে ঈদ উদযাপনে সামাজিক সম্পৃক্ততা অনেক বেশি ছিল—খেলা, মেলা, সমষ্টিগত আয়োজন সমাজের মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করত। এখন ঈদ উদযাপন মূলত ঈদের নামাজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, তারপর অধিকাংশ মানুষ একান্ত পারিবারিক পর্যায়ে উৎসব পালন করে। ফলে, ধর্মীয় রিচুয়াল এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো, যা একসময় সামাজিক কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হতো, সেগুলো ক্রমশ ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে। এটি শুধু ব্যক্তি বা সমাজের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও ধর্মের জন্যও একটি গুরুতর সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
আমরা ব্যক্তিগত ও সামাজিক ব্যর্থতার তুলনামূলক চিত্র দেখলাম, কিন্তু আমাদের মূল প্রশ্ন হলো, কেন আমাদের ধর্মীয় রিচুয়াল, উৎসব ও সামাজিক উদযাপন এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে যেখানে মানুষ এগুলোকে ব্যক্তিগত পরিসরে পালন করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে?

[৪]
বর্তমান সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত আন্ত-ব্যক্তিক হয়ে উঠেছে, যেখানে ব্যক্তি সমাজের সাথে মিশতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। নতুন প্রজন্মের ক্ষেত্রে এটি আরও প্রকট। প্রজন্মের ধারণাগত বিভেদ (generation gap) পুরাতন ও নতুনদের মধ্যে এক অদৃশ্য দূরত্ব সৃষ্টি করেছে, যা সামাজিক সংহতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণেই নতুন প্রজন্মের উদযাপনে কোনো শৃঙ্খলা (discipline) বা নিয়মবোধ দেখা যায় না; বরং তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় উচ্ছৃঙ্খল, অশ্লীল এবং alien or foreign cultured-এর সংমিশ্রণে গঠিত।

ফলে, একদিকে পুরাতন প্রজন্ম এই পরিবর্তন নিয়ে কিছু বলতে পারছে না, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও সামাজিক সংযোগের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ফলে সামাজিক দূরত্বের সৃষ্টি হচ্ছে এবং সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি একধরনের নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে পড়ছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের ঈদ উদযাপন। আগে ঈদ শুধু নামাজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল না; ঈদের পর সমাজের মানুষ বিভিন্ন খেলা, মেলা, এবং সমষ্টিক কার্যক্রমের মাধ্যমে একে আরও প্রাণবন্ত করে তুলত। এসব আয়োজন সমাজের প্রতিটি মানুষকে সামাজিকভাবে সংযুক্ত রাখত। কিন্তু এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঈদের উদযাপন শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা সর্বোচ্চ পারিবারিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। সমাজের মধ্যে ঈদ উপলক্ষে বড় কোনো সামাজিক কার্যক্রম সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা কমে গেছে।

[৫]
এই কারণেই বলা যায়, ধর্মীয় উৎসব ও রিচুয়াল, যা মূলত সামাজিক কার্যক্রম হিসেবে বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এটি যেমন সমাজের জন্য এক উদ্বেগজনক সংকেত, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও তা আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যখন কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন ধর্মীয় সংহতি এবং সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যও এক অশনি সংকেত হয়ে উঠতে পারে।
তাইতো আমরা বলতে পারি যে আমাদের যেসব ধর্মীয় রিচুয়ালস, অনুষ্ঠানাদি ও উদযাপন সামাজিক হয়ে ওঠার পরিবর্তে যখন ব্যক্তিগত হইয়া উঠে তখনই আপনাকে বুঝতে হবে সেটা আমাদের সমাজের জন্য ভয়ংকর, আমাদের দেশ ও জাতির জন্য ভয়ঙ্কর এবং তার চেয়ে বেশি ভয়ংকর আমাদের ধর্মের অস্তিত্বের জন্য।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...