ভঙ্গুর সমাজ, স্বৈরাচারী স্বাধীন ব্যক্তিসত্বাঃ ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যত দ্বন্দ্ব

আগামী সমাজ কোন দিকে যাবে, সেটি নিয়ে মানুষ মানুষের চিন্তার শেষ নেই তবে মানুষ যে আগামীর সমাজ-সংস্কৃতি কোন দিকে যাবে তার ভবিষ্যৎ করবে না তাতো হয় না । কেউ বলেছে সভ্যতা ধ্বংস হবে, কেউ বলেছে প্রযুক্তি মানুষকে মুক্ত করবে, কেউ বলেছে মানুষই হবে ভবিষ্যতের ঈশ্বর। কিন্তু আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা যেন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে, আমরা আসলে কোন ভাল দিকেই যাচ্ছি কিনা ? কারণ চারপাশের বাস্তবতা ক্রমাগত এমন এক জটিলতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ভবিষ্যতের আভাসও যেন অন্ধকারময় । আর এই জটিল বাস্তবতা গুলা তৈরি করেছে আমাদের রাজনীতি, সমাজ ও সামাজিকতার অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের ভাঙন আর এগুলোর চাইতেও ভয়ংকর হচ্ছে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ব্যক্তি স্বৈরাচারীতা যা ব্যক্তির সমস্ত রকম চিন্তা-চেতনার ভাঙন ধরাচ্ছে। যদিও ব্যক্তি এখানে কিছুটা দ্বন্দ্বমূলক অবস্থায় রয়েছে সে দ্বন্দ্ব তার অভ্যন্তরীণ আরে বাহ্যিক বিভিন্ন বিষয়ে জড়িয়ে আছে তবে ব্যক্তি নিজেকে এত বেশি পাওয়ারফুল মনে করছে যার কোন কিছু কে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ  মনে হচ্ছে না । এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এই উত্তরাধুনিক পৃথিবীতে ভাইরাসের মত ছড়িয়েছে আর এই বিষয় কোন আঞ্চলিক বা দেশ- মহাদেশে আবদ্ধ নেই, উন্নত কি অনুন্নত প্রায় সব দেশেই এই সমস্যা। আর এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা পৃথিবীতে হিউম্যানিজম বা হিউম্যান সেন্ট্রিক চিন্তার উত্থান ঘটিয়েছে …।

আজকের সমাজে ব্যক্তির ভূমিকা যতটা বাড়ছে, সমাজের শক্তি যেন ততটাই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ব্যক্তি হয়ে উঠছে শক্তিশালী, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী, নিজের জীবনের একমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্ত সত্তা। পরিবার, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকেও তার দূরত্ব বাড়ছে। ডেভিড হার্ভে যেভাবে নব্যউদারবাদের ভাষ্যে তুলে ধরেছেন, ব্যক্তির উপর বাজারের নির্ভরতা বাড়ছে ঠিক ততটাই, যতটা সমাজের ওপর নির্ভরতা কমছে।তাছাড়া ব্যক্তি এখন যতটা না স্বাধীন তার চেয়ে বেশিই পরাধীন এখন যদিও সে নিজেকে স্বাধীন ভাবে তবে সে মূলত এত পরিমাণ পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে আটকে গেছে যে এই পুঁজিবাদী সমাজ ও পৃথিবীতে সেও মূলত ভোগকারী ছাড়া কিছুই নয় কেননা পুঁজিবাদী সমাজের সমস্ত পণ্যের ক্রেতা বা ভোগকারিই মূলত ব্যক্তি । যদিও ব্যক্তির কাছে মনে হয় সেই কেন্দ্র আর সবকিছু গৌণ তাইতো তার মধ্যে একটা প্রচণ্ডরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা তৈরি হয়েছে যার কাছে আর অন্যকিছুর কোন মূল্য নেই। ছেড়েছে। সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সম্প্রদায়ভিত্তিক সম্পর্ক ,সবকিছু যেন পিছিয়ে পড়ছে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কাছে যদিও এধরনের চিন্তা ব্যক্তিকে দ্রুতই একাকী করে দিচ্ছে সাথে সাথে সমাজবিরোধীও । এই অবস্থাই তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি শোশাল চিন্তার সম্মীলনও ঘটছে। এধরনের পরিস্থিতি ব্যক্তিকে ভঙ্গুর আর নিরাপত্তাহীন করে। দুর্খাইমের ভাষায় বললে, সমাজের এই অবক্ষয় ও মূল্যবোধের ভাঙন আমাদের এক ধরনের Anomie-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে ব্যক্তি লক্ষ্যহীন, বিচ্ছিন্ন এবং একা। এমন এক সময়ে যখন ব্যক্তি সর্বশক্তিমান, তখনই সে হয়ে উঠছে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন। বর্তমান সমাজ-রাষ্ট্র যেন এই ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার কাছে প্রতিনিয়ত কনফ্লিক্টের মূখামূখী হচ্ছে । তবে রাষ্ট্রের জন্য এইটা মোকাবিলা করার ঊপায় থাকলেও সমাজ সামহাও একটা সমস্যার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে । কারণ ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্রের কাছে আইন আদালত থাকলেও সমাজের জন্য ব্যক্তিকে বাধ্য করবে এমন কোন কিছু নেই। সুতরাং সামনের দিন গুলা সমাজের জন্য অস্তিত্বের হুমকির মত হতে পারে। তবে রাষ্ট্রযে খূব ঝামেলার মধ্যে থাকবে না এইটা ভালভাবে বলা যায় না এখনও। কারণ ব্যক্তির স্বাধীনতার যে ধারনা এই সময় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে সহজে ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রের ভালোই বেগ পেতে হবে মণে হয়। কারণ রাষ্ট্র যদিও আইন করে ব্যক্তির সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে এইটা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য ব্যাকফায়ার করতে পারে বলে ধারনা করা যায়। আমরা ফুকোর Biopower ধারণাও রাষ্ট্রের জন্য আজকের বাস্তবতায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক দেখি । রাষ্ট্র কেবল আইন করে নয়, বরং জীবনের খুঁটিনাটি নিয়ম  স্বাস্থ্য, যৌনতা, পরিবার, নিরাপত্তা, সবকিছুর ওপর ক্ষমতা চালিয়ে ব্যক্তি ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কিন্তু যখন এই কাঠামো ভেঙে পড়ে বা দুর্বল হয়, তখন একপ্রকার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির জন্ম হয়। তখন রাষ্ট্রেই একধরনের অ্যানারকি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক পরিসরেও এই সংকট বিদ্যমান। যখন রাষ্ট্র ব্যক্তি ও সমাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখনই দেখা দেয় ক্ষমতার নতুন কাঠামো, যার ভিতরে লুকিয়ে থাকে উগ্র নেতৃত্ব, চরম আদর্শ, এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি। আর এই পরিস্থিতিই আমরা দেখি ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশেই । ধর্মীয় গোড়ামী, ধর্মীয় রাজনীতি আর সোশীও-রিলীজিয়াশ মূল্যবোধ সংরক্ষণের নামে সামাজিক মোরাল পুলিশিঙ, মানুষের মাঝে আইডেন্টিটি পলিটিক্সের জন্য জাতপাত প্রথার বাড়ন্ত। ফলে মানুষ হয়ে পড়েছে নৈতিকতাহীন আর নিজস্ব মূল্যবোধহীন ফলে সে হয়েছে আত্ম-শক্তিহীনও। গ্রামসির হেজেমনি ধারণায় যেমন দেখা যায়, ক্ষমতা তখন কেবল বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারিতেও পরিণত হয়। ফলে মানুষ নিজের অজান্তেই মেনে নেয় সেই আদর্শ, যেটা তাকে অবচেতনভাবে শাসন করছে। এর ফলে মানুষ খূজে ফেরে এমন কিছুর যা তাকে মানসিক ও আত্মিক-শান্তি দেবে। এই কারণেই মানুষ মূলে ফেরার এক তাড়না দেখা যায় তার মধ্যে। এরজন্য সে রাষ্ট্রীয় কীবা যেকোন ধরনেরই হোক না কেন নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব মেনে প্রস্তুত থাকে। এর ফলেই আধুনিক রাষ্ট্রগুলা তে আমারা বিভিন্ন ক্রেজি নেতৃত্ব দেখছি , আরও দেখছি ফার রাইট উত্থান। যারা সমাজ-রাষ্ট্র উভয়ের জন্য হুমকি হয়ে আসতে যাচ্ছে।    

আর এত সব ঘটনা আর ভবিষ্যৎবানী যাই হোক না কেণ আমাদের নিজেদের মধ্যে একধরনের অস্তিত্বের সঙ্কট হিসাবে দেখা যাচ্ছে, যেন একধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি আমরা। এই অনিশ্চয়তা আমাদের মূল্যবোধেও আঘাত করছে। এই অনিশ্চয়তা আমাদের নতুন কিছুকে পজেটিভ বা ভালভাবে গ্রহণ করার শক্তিও হ্রাস করেছে। আমরা নতুন ভাল কিছুকে আর ভাল বলে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়, সেটা নলেজ বা বস্তু যাই হোক না কেন? আমরা আছি এক ডিশটোপিয়াণ ঘোরের মধ্যে। ফলে মানুষ কোন নতুন আদর্শকে আর বিশ্বাস করা ভুলে গেছে।  Jean-François Lyotard এর মতে, আজকের বিশ্বে 'গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ' ,বড়ো কোনো আদর্শিক কাঠামো—এর মৃত্যু ঘটেছে। ফলে আমরা আর কোনো বড় সত্যে বিশ্বাস রাখতে পারি না, ছোট ছোট, বিচ্ছিন্ন সত্যের ভিতরে খুঁজে নিতে হয় আমাদের অবস্থান। ফলে রাজনৈতিক আদর্শ, নৈতিক বিশ্বাস, এমনকি প্রেমও, ভালবাসা, লয়ালীটি বা বিশ্বাস, বন্ধন, আত্মীয়তার মত সবকিছুই আজ প্রশ্নবিদ্ধ উলরিচ বেক-এর Risk Society ধারণায় যেমন বলা হয়েছে, আধুনিকতা নিজের ভেতরেই এমন সব বিপদ তৈরি করে যার নিয়ন্ত্রণ আর মানুষের হাতে থাকে না। পরিবেশ বিপর্যয়, প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা, অর্থনৈতিক ধস ,সবই এমন জটিলতা তৈরি করছে যা আগের নিয়মে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ হয়ে উঠছে অনির্ধারিত, অনিরাপদ।সবমিলিয়ে সমাজ এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে ভবিষ্যতের প্রশ্ন কেবল ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, বরং বর্তমানের কাঠামোকে কতটা আমরা ধরে রাখতে পারছি, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যক্তির স্বাধীনতা যদি সমাজকে ভেঙে ফেলে, তবে সেই স্বাধীনতা কি সত্যিই মুক্তি, না কি এক নতুন প্রকারের নিঃসঙ্গতা?

এই প্রশ্নগুলো আজ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ সমাজ তার নিজের ভবিষ্যত নিয়েই আজ নিশ্চিত নয়। আর এই অনিশ্চয়তার ভিতর দিয়েই গড়ে উঠবে এক নতুন ইতিহাস ,হয়তো বিকল্প সমাজের, হয়তো বিকল্প ভবিষ্যতের। 

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...