বাংলাদেশের সম্ভাব্য ইসলামী পুনর্জাগরণ

বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় এক নীরব ধর্মীয় নবজাগরণের সম্ভাবনা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই নবজাগরণ কোনো সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং এটি শিক্ষা, সংস্কৃতি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসলামি মূল্যবোধ, জ্ঞানচর্চা সাংগঠনিক সক্রিয়তার বিস্তার এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। এই নবজাগরণ কীভাবে সংঘটিত হচ্ছে, কী ধরনের সাংস্কৃতিক কাঠামো এর ভিত নির্মাণ করছে, এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্র সমাজে এর প্রভাব কী হতে পারে। তাই তো ধারনা করা যায় বাংলাদেশের সমাজে এক ধরনের নীরব উত্তরণ লক্ষ করা হচ্ছে যা অনেকের নজরের বাইরে রয়ে গেলেও, বাস্তবতাকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এই উত্তরণ কোনো সরাসরি বিপ্লব নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্মভিত্তিক নবজাগরণ যা তরুণ সমাজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে এবং ধীরে ধীরে দেশের সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের এই পরিবর্তন একটি সম্ভাব্য ইসলামী নবজাগরণকে নির্দেশ করে, যার ফলাফল ভবিষ্যতের রাষ্ট্র কাঠামো, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দিতে পারে।

বর্তমান প্রজন্মের ইসলামকে শুধু  আনুষ্ঠানিক আচার হিসেবে নয়, বরং একটি জীবনবোধ আদর্শিক অবস্থান হিসেবে গ্রহণ করছে। এই তরুণরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পাশাপাশি ইসলামি স্কলারশিপ, আর ধর্মীয় স্ক্রিপচারের মাধ্যমে তাদের চিন্তা নির্মাণ করছে। তাদেরকে আর নিছক অনুসারী  না হয়ে তারা হয়ে উঠছে জিজ্ঞাসু, বিশ্লেষক এবং প্রচারক আর তারা সমাজে এর মাধ্যমে তারা এখন ন্যায্য হিস্যার দাবিও করছে। এই প্রজন্ম নিজেদের ইচ্ছায় হিফজখানা বা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করছে, বিভিন্ন ইসলামি কোর্স আয়োজন করছে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে(ফেসবুক, ইউটিউব, পডকাসট)  ইসলামি দাওয়াহ নিয়ে কাজ করছে। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আজ গ্রামে গ্রামে এই তরুণ ইসলামিক ইন্টেলেকচুয়ালরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করছে গত দশ বছরে এত পরিমান মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে যা কল্পনাও করা যায় না।  আপনারা আর আশ্চর্যন্বিত হবেন যে গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার তাদের সন্তান কে সরকার পরিচালিত স্কুলে পাঠানোর চাইতে এইসব মাদ্রাসাই পাঠাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।

 গত দেড় দশকে বাংলাদেশে ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সাথে বিভিন্ন ঘরনার ইস্লামিক বক্তা, তরুণ, ইন্টেলেকচুয়াল , আর আলেম ওলামা  ব্যাপকভাবে দমন-পীড়নের সম্মুখীন হয়েছে। আর তাদের উপর এই দমন পীড়ন দেখে তরুণরা নিজেদের কে আরও পরিশীলিত করেছে , তারা মনে করেছে তাদের কোন অভিভাবক কেই নির্যাতন করা হচ্ছে। এইটাতে তারা যেমন মানসিক ভাবে আঘাত পেয়েছে এবং একে তাদের এই শোক দুঃখ কে উৎসাহে রুপান্তর করেছে কিন্তু এই দমনমূলক নীতি কার্যত ইসলামি চেতনার বিকাশকে থামাতে পারেনি, বরং তাকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে সাংস্কৃতিক শিক্ষামূলক পরিসরে ঠেলে দিয়েছে। ফলে, আজ যে পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করছি, তা স্লোগাননির্ভর রাজনীতি বা  লোক দেখানো সামাজিক কোন উথান বা আন্দোলনের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, সাহিত্য, মিডিয়া এবং সমাজচর্চার মাধ্যমে গঠিত হচ্ছে।  এই পরিবর্তন অনেকটাই অবচেতনভাবে ঘটছে, যেখানে এক শ্রেণির তরুণ রাজনীতিতে সক্রিয় না থেকেও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি নির্মাণে যুক্ত হচ্ছে। যে পরিবর্তনগুলো আমরা দেখছি তা শুধু আবেগ নয়, বরং সংগঠিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক। তরুণেরা নিজস্ব ফাউন্ডেশন, ট্রাস্ট, পাঠচক্র, ইসলামি থিংক ট্যাংক এবং সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তুলছে। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলো নিজস্ব শিক্ষা কার্যক্রম, অনলাইন কোর্স এবং স্কলারশিপ প্রোগ্রাম চালু করেছে।  একটি লক্ষ্যযোগ্য বিষয় হলো এই তরুণ উদ্যোগগুলোর মধ্যে অনেকেই ইসলামি আদর্শের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা যুক্ত করছে, যা পূর্ববর্তী প্রজন্মের ইসলামী কর্মকাণ্ডে ছিল না।

 আর এই ইসলামিক রিভাইভালিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসলামী চেতনায় উজ্জীবিত তরুণ লেখকদের উত্থান। গত ১০ বছরে ইসলামিক লেখকগোষ্ঠীর বইয়ের সংখ্যা বিক্রি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব বই কেবল ধর্মীয় দিকনির্দেশনা নয়, বরং দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, নারীবাদ, আধুনিকতা প্রযুক্তি নিয়েও বিশ্লেষণ তুলে ধরছে। তাদের লেখাগুলো  কতটুকু প্রাঞ্জল, তথ্যনির্ভর, গবেষণামূলক তা পরের বিষয় বাট  তাদের এই লিখার বিষয় আর কন্টেন্ট অনেক সময় সেক্যুলার চিন্তাবিদদের গ্রন্থের সঙ্গে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতা তৈরি করে। এক্ষেত্রে বইমেলা, বইবাজার ডটকম বা রকমারি ডটকমের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ইসলামি বইয়ের বিক্রির পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করে যে, পাঠকপছন্দ এখন ক্রমেই ধর্মীয় চিন্তার দিকেই ঝুঁকে পড়ছে।

পূর্বে ইসলামী চিন্তাবিদরা মূলত মাদ্রাসা বা ওয়াজ মাহফিলকেন্দ্রিক ছিলেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের ইসলামি স্কলাররা সেই গণ্ডি ভেঙে ইউটিউব, ফেসবুক, ব্লগ, -বুক, পডকাস্ট সব মাধ্যমে সক্রিয়। তারা এখন ক্যামেরা-সচেতন, ভাষা-সচেতন এবং দর্শক-সচেতন। তারা কোরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, কিন্তু একই সঙ্গে আধুনিক বিশ্ব, বিজ্ঞান, পুঁজিবাদ, নারীবাদ, গণতন্ত্র, সেক্যুলারিজম সব বিষয়েই তারা বক্তব্য রাখছেন। এই বহুমাত্রিক ইসলামি চিন্তাবিদরা দেশে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি গড়ে তুলছেন। ফলে বলাই যায় গত দশ বছরে বাংলাদেশে ইসলামী পাবলিক ইনটেলেকচুয়ালের উত্থান ঘটেছে ব্যাপক ভাবে আবার তাদের পরিচিতি আর স্বীকৃতি যে নাই সেটা বলা যায় ন। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইসলামি চিন্তার প্রসারের একটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একদিকে যেমন ধর্মীয় বক্তাদের খ্যাতি বেড়েছে, অন্যদিকে ইসলামিক meme culture, বই রিভিউ, শর্ট ভিডিও ইত্যাদির মাধ্যমে একধরনের নতুন ইসলামী সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। এটি এখন শুধুপ্রচারণানয়, বরং ইসলামিক  জীবনদর্শনকে পপুলার কালচার করার আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছে আবার প্রচেষ্টা বিফলে যাচ্ছে না একেবারে তাও বলে দেয়া যায় তবে  এক্ষেত্রে তরুণ সমাজের কিছুটা পিছুটান আছে তারা মানসিক ভাবে চাই যে ইসলামিক জীবনদর্শন আসুক বাট বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেটা তাদের নিজ জিবনে বাস্তবায়ন করা তার পক্ষে সম্ভাব হচ্ছে না।

এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্র বা সেক্যুলার সমাজ এই নবজাগরণকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছে বলে মনে হয় না। একদিকে তারা এটিকে হয় তুচ্ছ করছে, নয়তো একে "ফান্ডামেন্টালিজম" বলে গাল দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই নবজাগরণ কিছু ক্ষেত্রে  সংগঠিত আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসংগঠিত , আর কিছু ক্ষেত্রে যুক্তিনির্ভরতা আর কিছু ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বিষয়ও আছে  তবে এই উত্থান যথেষ্ট প্রভাবশালী। যদি রাষ্ট্র বিষয়ে উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিত নীতিগত প্রস্তুতি না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই শক্তির সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে কেননা বাংলার রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সেকুলার আর সেকুলার মাইন্ডই ধারন করে সমস্ত সরকারি পলিসি পরিকল্পনায় তবে একে যদি অগ্রহণযোগ্য হিসেবে না দেখে সহাবস্থানের ভিত্তিতে সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তবে এটি হতে পারে একটি নতুন সমঝোতার যুগ।

বাংলাদেশের সমাজে একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের গতি লক্ষণীয় এটি ধর্মীয় আবেগে নয়, বরং চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি নেতৃত্বের পুনর্গঠনে আবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন নিছক ভীতিকর বা রোমান্টিক কিছু নয়; বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতা, যা সমঝোতা, বিশ্লেষণ প্রস্তুতির দাবি রাখে। নবজাগরণ যদি সহাবস্থানের ভিত্তিতে এগিয়ে যায়, তবে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে। আর যদি তা অবজ্ঞা দ্বন্দ্বের পথে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তার ফলাফল অনিবার্য সংঘাতে রূপ নিতে পারে।সুতরাং, সময় এসেছে এই ইসলামী নবজাগরণকে বোঝা, ব্যাখ্যা করা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নির্মাণে তা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে তা নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে গভীর আলোচনা শুরু করার।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রবণতা ধরনের নবজাগরণের এক নিঃশব্দ সূচনা হতে পারে। তবে এই নবজাগরণ কি বিপ্লবের ইঙ্গিত দেয় ? যা বাংলাদেশের আগামির পথ চলাকে কণ্টকময় করে দেবে।  করে দেবে বাংলাদেশের আগামির পথ চলা কে রুদ্ধও ?

 

 


No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...