প্রশ্নহীনতায় সমাজে ধর্মের আধিপত্য ও ব্যক্তির হঠকারিতা

যদিও আমরা মনে করি ধর্ম একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের মানুষদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এটি একটি নৈতিক ও আদর্শিক যন্ত্র (moral and ethical factory) হিসেবে ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে, তথাপি এটি শুধুই একটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নয়। প্রতিটি ধর্মেরই একটি স্বতন্ত্র বিশ্বাসব্যবস্থা থাকে, যার মাধ্যমে তা সমাজের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর নৈতিকতা, আদর্শ, আচার বা সংস্কারকে প্রভাবিত করে। যারা মনে করেন সমাজ ধর্ম সৃষ্টি করে, তারা এক অর্থে ভুল করেন। ধর্মের উৎপত্তি ব্যক্তি থেকে, আর ব্যক্তি যখন সমাজে এই ধর্মের বাস্তবায়ন করে, তখন তা সমাজের ধর্মে রূপ নেয়।

ধর্ম সমাজে তার আধিপত্য বজায় রাখার জন্য নানা উপায়ে কাজ করে বটে, তবে সমাজে ধর্মের প্রভাব মূলত আসে সমাজে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাসভিত্তিক ধর্মচর্চা থেকে, আর ধর্ম চর্চা মূলত ব্যক্তি থেকে শুরু হয়, কিন্তু যখন তা সমাজের সামগ্রিক স্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই ধর্ম একটি সামাজিক ধর্মে রূপ নেয়। এই অবস্থায় ধর্ম চেষ্টা করে সমাজের নৈতিকতা বা মোরালিটি , শিষ্টাচার বা ইথিকিস, ট্র‍্যাডিশন  এবং কাস্ট্ম কিবা প্রথাগুলোকে তার আচরণবিধির মতো করে গড়ে তুলতে। যদিও এই প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের কাছে অনেক সময় মনে হতে পারে যে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম সমাজকে প্রভাবিত বা আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, কোনো ধর্মই সমাজে আধিপত্য স্থাপন করতে চায় না  বরং প্রতিটি ধর্মই তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সমাজে শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য আনতে চায়। তবে ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক পর্যায়ে যদি মানুষই না চায়, তাহলে ধর্ম নিজের চেষ্টায় সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

আমাদের বুঝতে হবে, সমাজ নিজে থেকে কোনো ধর্ম সৃষ্টি করে না। ধর্ম মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক - এটি ব্যক্তির অন্তর্গত বিশ্বাস, উপলব্ধি ও অনুশীলনের বিষয়। ধর্ম চায় ব্যক্তি যেন তার নির্দেশনা মেনে চলে, তার বিশ্বাসকে ধারণ করে ও চর্চা করে। কিন্তু এই চর্চা শুধু ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ ধর্ম ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সমাজে প্রবাহিত হয়, আর এই ধারাবাহিকতাতেই সমাজে ধর্মের উপস্থিতি তৈরি হয়। আর এই উপস্থিতি ধর্মকে একটি অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যার ফলে ধর্মের নিয়ন্ত্রণ সমাজে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, একবার সেটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে, তাকে টেনে নামানো সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ওই প্রতিষ্ঠিত ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করতে হলে, হয়তো অনেক বেগ পেতে হয়, এমনকি ধর্মযুদ্ধ পর্যন্ত করতে হতে পারে।

একটি "শান্তিপূর্ণ" ধর্মকে প্রতিস্থাপন করা আসলে এক বিশাল সংগ্রামের বিষয়, কারণ তা কেবল একটি বিশ্বাসব্যবস্থাকে নয়, বরং গোটা সমাজব্যবস্থার উপর গাঁথা এক ধরনের শাসন কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করার নামান্তর। কারণ ব্যক্তিমাত্রের কাছেই ধর্ম হলো একটি চিরসত্য, যা কখনো মিথ্যা হতে পারে না, তা যেই ধর্মই হোক না কেন। আর যখন কোনো ধর্ম সমাজের প্রথা, রীতি-নীতি, নৈতিকতা এবং মানুষের বিশ্বাসব্যবস্থার সঙ্গে নিজেকে সমন্বিত করে ফেলে, তখন সেটিকে প্রশ্ন করবার আর কোনো জায়গা থাকে না।

এই ধর্ম যদি একবার সমাজের মূল কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বা প্রভাবহীন করতে হলে আপনাকে এমন এক বেগ, এমন এক শক্তি অর্জন করতে হবে, যা কল্পনারও বাইরে। এই শেকড় টেনে তোলার জন্য শুধু যুক্তি বা চিন্তা নয়, বরং এক বিপ্লবাত্মক প্রচেষ্টা প্রয়োজন হতে পারে—যার তুলনা কেবল এক গভীর, রক্তক্ষয়ী মানসিক বা সাংস্কৃতিক সংঘাতের সঙ্গেই করা চলে। এবং এই সবকিছুই ঘটে সমাজে বসবাসরত সাধারণ মানুষের—অথবা ব্যক্তির—নিজস্ব চিন্তার ক্ষেত্রে। কারণ সে কখনোই প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত ধর্মকে প্রশ্ন করার সাহস দেখাতে পারে না, সে যত বড় যোদ্ধা বা বিপ্লবীই হোক না কেন। আর এই কারণেই ধর্ম এক পর্যায়ে হয়ে ওঠে এক 'unquestionable' ক্ষমতা ,এক সর্বগ্রাসী, সর্বব্যাপী সত্তা, যাকে শুধু ভয় করতে হয় এবং শ্রদ্ধা জানাতে হয়, কিন্তু যার প্রতি প্রশ্ন তোলার সাহস সমাজে আর কারো থাকে না।

কারণ তখন সমাজের প্রায় প্রতিটি মানুষই নিজেকে ভাবতে শুরু করে ধর্মের রক্ষক হিসেবে, সে মনে করে ধর্ম তাকে রক্ষা করবে নয়, বরং তাকেই যেন ধর্মকে রক্ষা করতে হবে। এই উল্টো দায়িত্ববোধ থেকেই ব্যক্তি ধর্মকে প্রশ্ন না করে বরং রক্ষার যুদ্ধে নামে, এবং যে-ই ধর্মকে প্রশ্ন করে, তাকেই সমাজের চোখে ‘ভিলেন’ করে তোলে। আর তখন ধর্মকে মনে হয় সমাজেই ধর্ম,  সামাজিকতাই ধর্ম। তখন ধর্ম আর ব্যক্তির থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক দূরের কোনো বিষই। আর তখনই ধর্ম থেকে ব্যক্তি বা কোনো আনঅর্থোডক্স সামাজিক সত্তা নিজেকে ধর্ম থেকে আলাদা করে ফেলে, এবং শুরু হয় এক সাইক্লিক সামাজিক কনফ্লিক্ট, যার ওপর ধর্মের আর কোনো কন্ট্রোল থাকে না। এভাবেই সমাজ একটি চেঞ্জ প্রোসেসের মধ্যে চলতে থাকে।


No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...