বামপন্থার আত্মসংকট ! প্রান্তিক মানুষের রাজনীতি নাকি পলিটিক্যাল ফ্যাশন ?

আমরা ধরেই নিয়েছি যে বামপন্থা এখন একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক ধারার নাম। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত, বামপন্থা অন্তত এমন একটি রাজনৈতিক আদর্শ, যার কেন্দ্রে সাধারণ মানুষ এবং তাদের কল্যাণের কথা থাকে। তাহলে প্রশ্ন জাগেএমন একটা আদর্শ পৃথিবীর নানা দেশে কেন আজ এই দুর্দশায় পড়েছে?

এই পতনের পেছনে কেবল বাইরের কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত নেই। বরং, এই পতনের মূলে রয়েছে বামপন্থীদের নিজেদের ব্যর্থতা, লোভ, স্বার্থপরতা এবং জনমানুষের বাস্তবতার বদলে তত্ত্ব, মতবাদ জটিল রাজনৈতিক পরিকল্পনায় বেশি জড়িয়ে পড়া। তারা এমন সব তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক নীতিকে গ্রহণ করেছে, যেগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তাদের আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

এটা শুধু দূরত্ব তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এই বামপন্থীদের এমনভাবে দেখা হচ্ছে, যেন তারা জনগণেরই এক ধরনের শত্রু। যেন তারা সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই বিভ্রান্তি বা বিদ্বেষের ফলাফল ভয়াবহ।

ইতিহাস আমাদের কী বলে? ইতিহাস বলে, যখন সমাজের অন্যসব রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন বামপন্থীরাই ছিল তাদের পাশে। তারাই ছিল তাদের কণ্ঠস্বর। কিন্তু বিশ শতকের শেষে এসে এই বামপন্থীরাই এমন কিছু চিন্তা-চেতনার ধারক হয়ে উঠলো, যেগুলো সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। বরং তাদের কাছে এগুলো অদ্ভুত, বিভ্রান্তিকর ক্ষতিকর মনে হয়েছে।

এই অদ্ভুত অবস্থানগুলো কী হতে পারে? যেমন: জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চরম পদক্ষেপ বক্তব্য, যা অনেকের কাছে বাস্তববিচ্ছিন্ন মনে হয়। অথবা, gender identity LGBTQ+ বিষয়ক এমন সব অবস্থান, যা অনেক সাধারণ মানুষের কাছে সমাজের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা সংহতির বিরুদ্ধে এক ধরনের আঘাত হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। অনেকে ভাবছে, এই বামপন্থীরাই যেন সমাজ ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

অন্যদিকে, বামপন্থীরা সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বলছে এমনভাবে, যেন তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকেই দায়ী করছে সকল সমস্যার জন্য। এই ভাষা, এই মনোভাব, আরও বেশি করে বামপন্থীদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। শুধু উন্নত দেশেই নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এই প্রক্রিয়া চলছে। আর যেখানে এখনো বামপন্থীরা রাজনীতি করছে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা রূপ নিয়েছে এক ধরনের দমন-পীড়নের যন্ত্রে।

আমার মনে হয়, বামপন্থার এই সংকটের পেছনে অনেক হাত থাকতে পারে। কিন্তু একটি বড় কারণ হলোনতুন প্রজন্মের অনেক বামপন্থী নেতাকর্মীর মধ্যে মানুষের প্রতি সহানুভূতি, মমতা দরদের বদলে ঘৃণা, বিদ্বেষ তাচ্ছিল্যের মনোভাব জন্ম নিয়েছে। তারা ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতিএমনকি সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনার প্রতিও এক ধরনের ঘৃণা পোষণ করে। ফলাফল? সাধারণ মানুষ তাদের চিন্তাধারাকে ভয় পায়, তাদেরকে নিজের প্রতিপক্ষ মনে করে।

তাছাড়া, বর্তমান প্রজন্মের অনেক বামপন্থী আদর্শটিকে আত্মস্থ করছে যেন এক ধরনের ফ্যাশন হিসেবে। গভীর রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার বদলে "আলাদা কিছু" করার মোহে তারা বামপন্থা বেছে নিচ্ছে। এই মনোভাবও তাদের ভাবনার গভীরতা বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সুতরাং, বামপন্থার পতনের অনেক কারণ থাকতে পারে। আমি যে বিশ্লেষণ করলাম, তা একান্তই আমার নিজস্ব উপলব্ধি। তবে আমি মনে করিএখন বামপন্থীদের ভাবা দরকার, তাদের রাজনীতিকে কী খেয়ে ফেলছে? কেন তারা জনগণের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারছে না? কেন তারা শত্রুরূপে প্রতিভাত হচ্ছে?

আমার মনে হয়, এই পতন আমাদের সবার জন্যই অমঙ্গলজনক, বিশেষ করে সেই নির্যাতিত, নিপীড়িত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য, যাদের কণ্ঠস্বর হয়ে একসময় বামপন্থারাই কথা বলতো।








No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...