জাতীয় পুনর্জাগরণ না জাতীয় সচেতনতা ?

আমরা যখন দেখি কোনো জাতি বা দেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রায়ই লক্ষ্য করি, সে জাতির কিছু মানুষ আকাঙ্ক্ষা করে যে তাদের জাতির লোকেরা জেগে উঠুক, হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনুক, পুরোনো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাক। তারা প্রায়ই একটি শব্দ ব্যবহার করে ,জাতীয় পুনর্জাগরণ বা  nation reawakening, যা মূলত দেশের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট জাতির জাগরণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতি ও  দেশ  ,এই দুইটি ভিন্ন বিষয়। আধুনিক পৃথিবীর কাঠামোতে কোনো দেশই কেবলমাত্র একটি জাতির একক প্রতিনিধিত্ব করে না। বাস্তবে, খুব কম দেশই এখন একক জাতিগোষ্ঠীর; বরং একটি দেশের ভেতর বহু জাতি, ধর্ম ও ভাষার মানুষ বসবাস করে। এই বহুজাতিক, বহু ধর্মীয় পরিচিতি কোনো দেশের তথাকথিত  জাতীয় পুনর্জাগরণ ধারণাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। কারণ, বর্তমান বিশ্বে মানুষ নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের প্রতি এতটাই অনুরক্ত যে, তা দেশের সামগ্রিক পরিচয় ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে। দেশগুলোর ভেতরে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর রাজনৈতিক টানাপোড়েন অবশেষে দেশের শান্তি বিনষ্ট করে দিতে পারে।

ফলে দেখা যায়, যখন কোনো দেশে জাতি গঠনের বা উন্নয়নের কথা ওঠে, তখন সেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগোষ্ঠী নিজেদের পরিচিতিকে গোটা দেশের জাতীয় চেতনায় পরিণত করার চেষ্টা করে। তারা নিজেদের জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বড় করে দেখাতে চায়। এর ফলে দেশটির অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী, তাদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও ধর্ম বিপন্ন হয়ে পড়ে।

ঠিক এই চিত্র আমরা বর্তমানে ভারতের ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ করছি। ভারতের হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং তার ক্রমবর্ধমান বিস্তারের কারণে সমাজে গভীর বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে এক ধরনের অহংকারী গর্ব কাজ করছে, যার ফলে তারা সংখ্যালঘুদের অস্বীকার করছে। এর ফলস্বরূপ ভারতের সামাজিক ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ছে, এবং দেশটি ক্রমাগত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন ভারতে যেকোনো উদ্যোগের আগে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, ব্যক্তিটির ধর্ম কী? এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও সংকটজনক হবে বলেই মনে হয়।

সুতরাং, যখন আমরা  জাতীয় পুনর্জাগরণ  বা  জাতীয় পুনর্গঠন  নিয়ে কথা বলি, আমাদের বুঝতে হবে, এই ভাষ্য বহুজাতি, বহুধর্ম ও বহুসাংস্কৃতিক দেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যেখানে কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কারণ তখন মিথ্যা জাতীয় গর্ব, অহংবোধ এবং অতীত ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ প্রয়াসের মাধ্যমে জাতিগত সংঘাত শুরু হয়।

এই কারণেই, আমাদের দেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো মানুষের চেতনাবৃদ্ধি, যেখানে শান্তি, সহাবস্থান এবং সম্প্রীতির চেতনা সর্বাগ্রে থাকবে। কারণ, এই বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক বিশ্বের জন্য সহাবস্থানের বিকল্প আর কিছুই নেই। আর এই সহাবস্থান নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো দেশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সচেতনতার প্রসার ঘটানো।

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...