দেশপ্রেমের অতিরঞ্জন আর মানবিকতার বিপদ !

পৃথিবীতে যদি কোনও সর্বজনীন গভীরতর ধ্বংসাত্মক  অনুভবহীন  ইমোশনাল ওয়েপেন থেকে থাকে, তবে তা হলো দেশপ্রেমের অতিরঞ্জন দেশ প্রেমের  অতিরঞ্জতা এই  ধারণা যে, দেশ ছাড়া সব কিছু গৌণ, দেশই প্রথম এবং দেশই শেষ, এই মনোভঙ্গি আজ আমাদের সামাজিক বন্ধন, মানবিক সম্পর্ক স্বাভাবিক মানব প্রকৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, অথচ আমরা তা সচরাচর বুঝতে পারি না।

এই আধুনিক বিশ্বের যত জটিলতা, দ্বন্দ্ব সংঘাত চলছে, কেউ যদি প্রশ্ন করে, এসবের মূলে কী? তবে আমি বলব, এর একমাত্র উৎস হলো এই দেশভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্য। পৃথিবীর এই সংকটগ্রস্ত অবস্থার সমাধান তখনই সম্ভব, যদি আমরা এই জাতীয়তাবাদী চেতনার ধ্বংসে সক্ষম হই। তা না হলে, কোনো মুক্তির পথ নেই।

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ হয়তো আগের তুলনায় কমেছে, কিন্তু মানবজাতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক হিংস্র, অমানবিক, ঘৃণাপূর্ণ ধ্বংসাত্মক আচরণে লিপ্ত। আমরা আজ এত প্রযুক্তির মাঝে থেকেও কোথাও যেন আটকে আছি, এক ধরনের অস্পষ্ট সংকটে। বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ মানসিক শান্তি থেকে বঞ্চিত, কারন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা সহানুভূতির জায়গায় ঘৃণা আর বিদ্বেষ স্থান দখল করে নিচ্ছে। কোন মানুশের অন্তরে ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসা থাকবে আর সে মানসিক শান্তিতে থাকবে এইটা কখনওই হতে পারে  না তাই তো পৃথিবীর অধিকাংস মানুষ মানসিক অশান্তির মধ্যে রয়েছে ।

অনেকেই একে বলবে survival of the fittest এর বাস্তবতা, যেখানে মানুষ বা দেশ একে অপরকে হারিয়ে টিকে থাকতে চায়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, মধ্যযুগের পরবর্তী রেনেসাঁসের মূল লক্ষ্যই ছিল এই ঘৃণা, বিদ্বেষ, বিভাজন এবং মানবজাতির পার্থক্যকে অতিক্রম করে একটি মানবিক আধুনিক যুগের সূচনা করা। অর্থাৎ এই সারভাইভাল অফ দ্যা ফিটেশট এর নাম দিয়ে মানুশে মানুসে যুদ্ধ , হানাহানি, ঘৃনা, বিদ্বেষ এর শেষ করে দিয়া আর এর পরিবর্তে স্থান দখল করবে ভালবাসা, পারস্পারিক সহযোগিতা, প্রেম । কিন্তু হচ্ছে এর উল্টো!

আমাদের দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক চিন্তাবিদেরা বারবার আমাদের সতর্ক করে দিয়ে গেছেন। তাহলে কি আমরা এখনও আধুনিক হতে পারিনি? আমরা কি এখনও সেই মধ্যযুগীয়, বর্বর মানসিকতার ধারাবাহিকতায় আটকে আছি?

অনেকে বলবে, এই অন্ধ জাতীয়তাবাদের পেছনে ধর্ম দায়ী। কিন্তু আসলেই কি ধর্ম দায়ী? যদি তাই হয়, তবে কি ধর্মই মানুষকে আরও ঘৃণাপূর্ণ, বিদ্বেষপ্রবণ হিংস্র করে তুলেছে? না, ধর্ম কখনও এমন ছিল না। আসলে, ধর্মের প্রকৃত ইতিহাস আমাদের কাছে পুরোপুরি সত্যভাবে পৌঁছায়নি। আপনি দেখবেন, মধ্যযুগের ইউরোপীয় বা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাস বলতে গেলে আমাদের শেখানো হয়, ধর্ম, পুরোহিত আর যাজক শ্রেণি মধ্যযুগের সব সমস্যার মূল ছিল। মনে হয় যেন ধর্মই অন্ধকার যুগের প্রধান কারণ, যেন পৃথিবীর কাল আর কলংক জনক যত  ইতিহাস তার সব  ধর্মের  ছাড়া আর  কারও না!

কিন্তু এই ইতিহাস কি সত্যিই নিরপেক্ষ? এই ইতিহাস কি কাটছাঁট করা হয়নি ? ধর্মের এই কলংক জনক ইতিহাস কি  যাচাই করা হয়েছে? মোটেও না। তাহলে কীভাবে ধর্মকে মানবতা মানবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হলো? কে বা কারা করল এই কাজ? ধর্মের বিরুদ্ধে এত ঘৃণা আমাদের সমাজে কীভাবে প্রবেশ করল?

আজকের আধুনিক যুগে ধর্ম আর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে না, ধর্মের সেই ক্ষমতা আর নেই। তবুও, সব সমস্যার জন্য ধর্মকে দায়ী করা হয়, এটা কি খুব অদ্ভুত নয়? দেখা যাচ্ছে, বহু অপরাধ সহিংসতা এমন কিছু মানুষ করছে, যারা ধর্মকে ব্যবহার করে কিন্তু আসলে নিজেরা সব দায়মুক্ত থাকে। পৃথিবীর অশান্তি, বিদ্বেষ বিভাজনের প্রকৃত কারণ না হয়েও ধর্মই যেন সেই সকলের একমাত্র দায়ী হয়ে উঠে!

এই ছায়াময় ইতিহাসের পেছনে রয়েছে এক ধরনের shadow people ,যারা ক্ষমতার স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্মকে অপরাধের মুখে দাঁড় করিয়ে নিজেরা ক্ষমতার চূড়ায় উঠে যায়। এরা সমস্যার সৃষ্টিকর্তা নয়, বরং সমস্যা সৃষ্টি করে ধর্মকে ফাঁদে ফেলে নিজেদের দায় এড়িয়ে যায়। আর এই শ্যাডো পিপল গুলাই হচ্ছে রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা, সামরিক বাহিনীর লোকেরা আর এরা যেকোনো যুগের ইতিহাসে আপনি পেয়ে যাবেন , শুধুযে এই যুগের তা কিন্তু না ! এই শ্যাডো পিপলদের কে আপনি পেয়ে যাবেন ইতিহাসের যেকোনো বাকে। আর এরাই হচ্ছে এনিমি অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড, ভালবাসা, পারস্পারিক সহযোগিতা আর প্রেমের , মানুষের   আর মানবিকতার ।

 

No comments:

Post a Comment

প্রশান্তি কী ?

প্রশান্তি কী? প্রশান্তি হলো প্রকৃতির সাথে নিঃশব্দে লেপ্টে থাকা, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা, সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। সেই সাথে আপ...