হিউমান পারসেপশন অফ লাইফ: এ কম্পারেটিভ ডিসকাশন্স অফ ভিলেজ এন্ড আরবান পিপল


[১]
আমার সমাজ নিয়ে কিছু একটা উপলব্ধি রয়েছে এবং আমার কাছে মনে হয় সেটা খুবই গভীর একটা উপলব্ধি! যদিও উপলব্ধিটা আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত এবং এটা অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে আমার যে মোয়ামেলাত, তার ফলেই এই উপলব্ধিটা আমি স্ট্রাকচারালভাবে ডিফাইন এবং অর্গানাইজ করতে পারছি। আমার জীবনের যদি ব্যস্ত সময় বলি, তবে গত ১৫ বছরের সময়কালকে বলা যেতে পারে। এই ১৫ বছরে আমি এক দিকে যেমন  গ্রামে থেকেছি তেমন করে থেকেছি  শহরে আরো থেকেছি উপশহর বা শহরের প্রান্তেও, এরপরে থেকেছি  জেলা শহরে এবং জেলা শহরে থাকার সময় আমি সামাজিক-রাজনৈতিক ভিন্ন ভিন্ন ঘরনার মানুষ, যুবক-কিশোর সবার সাথে আমার একটা ওঠাবসা হয়েছে। আবার ঠিক তেমনই কিছু সময় আমি বিভাগীয় শহরের মতো জায়গাতেও আমার জীবনের কিছু সময় কাটিয়েছি। ওইখানেও আমি কিছু মানুষের সাথে নিজের অভিজ্ঞতার আদান প্রদানের একটা সুযোগ তৈরি করে নিয়েছিলাম। সবচেয়ে আমি বেশি কাটিয়েছি এবং আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সময়, সেটা আমি দেশের রাজধানী শহরে থেকেছি। এই রাজধানী শহরে আমি প্রায় আট থেকে সাত বছর কাটাচ্ছি, বিভিন্ন ঘরনার মানুষের সাথে আমার প্রতিনিয়ত সময় কাটছে। তাছাড়াও  আমি একটা মাস একটা প্রান্তিক গ্রামেও বাস করেছি, প্রত্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে যেটাকে বলে, সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সাথে ওঠাবসা আমার কিছুটা হয়েছে। সেক্ষেত্রে, আমার যে উপলব্ধি সমাজের মানুষ এবং গ্রাম ও শহরের মানুষের মানসিকতার তুলনামূলক পার্থক্য নিয়ে, সেটি আমি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলি, তবে বলতে পারি, গ্রাম ও শহরের মানুষের মধ্যে পার্থক্য মূলত তাদের জীবন নিয়ে ভাবনার ও বোধের  পার্থক্য!

[২]
দেখেন,
গ্রামের মানুষ জীবন নিয়ে এত ভাবনা চিন্তা করে না। গ্রামের মানুষ নিজের জীবনকে কখনো প্রশ্ন করে না, সে কী করবে? কেন করবে? কিভাবে করবে? এটা তার ব্যক্তিগত প্রশ্নের মধ্যেই আসে না। সে যেমন আত্মসমালোচনা করে না, ঠিক তেমনই সে তার নিজের জীবনের পূর্ব কোন পরিকল্পনাও হাতে নেয় না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। একজন গ্রামের মানুষের জীবন হচ্ছে খুবই সাদামাটা, যার জীবন নিয়ে কোনও চিন্তা-ভাবনা, প্রশ্ন বা বিশ্লেষণাত্মক কোনো বিষয় নেই। একজন গ্রামের মানুষ জীবনকে সরল গতিতে দেখে। সে জানে, তার জন্ম হয়েছে এবং মৃত্যুও হবেই, এর মধ্যে সে জীবনকে একটা গাণিতিক সূত্রের মতোই ধরা বাধা সীমার মধ্যেই তার জীবনকে দেখতে চাই, ব্যতিক্রম চায়না। তার জীবন একটা সরল সোজা পথে  কেটে যায়। এবং কী হবে?কেন হবে? কিভাবে হবে?  সব যেন পূর্ব নির্ধারিত এবং কোন প্রশ্নের উত্তরই আসলে সে নির্ধারণ করে না। সে মনে করেই নিয়েছে তার জীবনের ভাগ্য তার হাতে নেই, তার জীবনকে সে শপে দিয়েছে ভাগ্যের কাছে।  মানুষের উপলব্ধিতেও সেইরকম মনোভাব প্রকাশ পায়।  স্রষ্টায় যেন  তার ভাগ্য নির্ধারিত করে রেখেছে, তার কৈশোরকাল, কর্মজীবন, বিবাহ, সন্তান, সন্তানাদি, বৃদ্ধ বয়েস, মৃত্যু—এর বাইরে সে আসলে কিছুই চিন্তা করতে পারে না। এবং এর প্রত্যেকটা পর্যায়ে এসে নিজেকে আউটস্ট্যান্ডিং বা আমরা যে বলি না, আউট অফ দ্য বক্স, এরকম চিন্তা কেউ নিয়ে আসতে পারে না, এটা সকল গ্রামীণ মানুষের ক্ষেত্রেই । সুতরাং, গ্রামের মানুষের যে চিন্তা, এই চিন্তায় আপনি একটা পূর্ব নির্ধারিত বাঁধাধরা জীবনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন। আপনি যেখানে ব্যতিক্রম খুব কমই দেখবেন। এবং প্রত্যেকটা মানুষের চিন্তাগুলো প্রায় সেম, তাদের কর্মকাণ্ড সেম, তাদের নীতি-নৈতিকতা সেম, তাদের জীবনটাই যেন একটা ইউনিফর্মিটি। এখানে ভিন্নতার কোনও সুযোগ নেইম এবং গ্রামীণ পিপল যাকেই তারা ভিন্নভাবে দেখবে বা কোন ব্যক্তি যদি এই গ্রামীণ জীবনে ভিন্ন স্বাদ নিয়ে আসার ট্রাই করে, তবে তাকে তারা দমিয়ে দিতে ট্রাই করবে। এই যে, পূর্ব নির্ধারিত  ধারা, এর ফলেই আপনি দেখবেন যে, একজন ব্যক্তি যখন  শহরে গিয়ে, আবার গ্রামে ফিরে, তখন শহরের যে একটা কালচারাল প্রভাব তার মধ্যে থেকে যায় এবং গ্রামে গিয়ে সে শহুরিয়া প্রভাব তার গ্রামীণ জীবনে প্রয়োগের ফলেই গ্রামীণ মানুষ সেটাকে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে  নিতে পারে না। এর ফলে একটা কালচারাল দ্বন্দ্ব, চিন্তার দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যদিও বর্তমান সময়ে এই ধারায় পরিবর্তন আসছে, নেট ব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অথবা যোগাযোগ ব্যবস্থা সমূহের ব্যাপক সহজীকরণের ফলে গ্রামের মানুষের চিন্তাভাবনা কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে, তবুও কি তারা শহরের মানুষের মতো বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে? তা কিন্তু নয়। গ্রামীণ মানুষের এই বৈচিত্র্যময়তা, কিছুটা ডিজঅর্গানাইজেশন, ইনডিসিপ্লিন এবং ব্যাপকভাবে আনস্ট্রাকচারড ওয়েতে এগিয়ে যাচ্ছে, এবং এটা গ্রামীণ জীবনের জন্য ডেঞ্জারাস ও ভয়ংকর। আমরা এতগুলো কথা বললাম? এখানকার মূল কথাটা হচ্ছে, গ্রামীণ মানুষের জীবনবোধ খুবই সরল ও সোজা, পারোতোপক্ষে পূর্ব নির্ধারিত, যেটা শহরের মানুষের মধ্যে দেখা যায় না।

[৩]
দেখেন, শহরের মানুষের আপনি যদি বৈশিষ্ট্য বা ফিচার বলতে যান, এত এত হবে যে আপনি বর্ণনা করতে গেলে, এটা ঝামেলায় পড়ে যেতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে আমি যদি একটা বর্ণনা বলি, অর্থাৎ যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটা আমার জীবন থেকে আসে বা মানুষের চিন্তাধারার পার্থক্যের যে তুলনামূলক চিত্র আমার নিজে যে উপলব্ধি, সেইটাতে আমি বলতে পারি যে, শহরের মানুষ জীবনবোধ নিয়ে খুবই বৈচিত্র্যময়। তারা পূর্বনির্ধারিত জীবন পরিচালনায় খুবই সচেতন। তারা ব্যতিক্রম হতে চায়, তারা ব্যতিক্রম চায়। শহরের মানুষ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনকে আশ্বস্ত করে, পরিবর্তনকে তার স্বাগত জানায় এবং পরিবর্তনের ব্যাপারে শহরের মানুষের একটা উৎসাহ উদ্দীপনা, আনন্দ কাজ করে, যেটা আপনি গ্রামে দেখতে পাবেন না। শহরের মানুষ নিজেকে ভিন্নভাবে দেখতে চায়, সবার চেয়ে আলাদা, এবং সে যে ভিন্ন চিন্তা করে, সে যে ভিন্ন, সবার চেয়ে আলাদা—এটা মানুষ দেখুক, জানুক, এবং মানুষ তাকে এপ্রিশিয়েট করুক, এটা সে চায়, এবং ব্যাপকভাবে চায়। যেটা আপনি গ্রামের মানুষের জীবনবোধে খুবই অপ্রতুল। জীবনের পরিচালনায় গ্রামীণ মানুষ কিছুটা কনসার্ভেটিভ এবং ক্লোজ, অথচ সে তার জীবন পরিচালনাকে জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ড, ঘটনাকে সে চেপে রাখতে চায়। মজার বিষয় একটাই যে, গ্রামীণ মানুষ নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে অন্যকে জানাতে চায় না, কিন্তু অন্যের ঘটনাকে সে প্রচন্ডভাবে জানতে চায়। অন্যের ব্যক্তিগত ঘটনা, অন্যের পরিবারের ঘটনাকে সে আলোচনার মূল কেন্দ্রীয় বিন্দুতে নিয়ে আসে, প্রতিনিয়ত আলোচনা করে, সমালোচনা করে, কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনকে কেউ না জানুক, শহরের মানুষের মধ্যে এই বিষয়টা একদম পুরোপুরি ভিন্ন। শহরের মানুষ অন্য মানুষকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না, অন্য মানুষের জীবনে কী চলছে, এ বিষয় নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই, পারোতোপক্ষে আলোচনাকে সে এভয়েড করে, কিন্তু সে তা নিজের জীবনকে প্রকাশ করতে চায়। সে তার নিজের জীবনে, প্রত্যেকটা ঘটনা, মুহূর্তকে বিকট আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে যেতে চায়, অথচ চায় তার নিজের জীবনকে নিয়ে অন্য কেউ আলোচনা করুক, তাকে জানুক, চিনুক, এবং তার এপ্রিশিয়েট করুক। গ্রামীণ ও শহরের মানুষের জীবনবোধ এখানে আপনি দেখবেন, একটা আকাশ এবং পাতাল পার্থক্য। এই পার্থক্যের মধ্যেই দেখবেন, যখনই এই দুই প্রান্তের মানুষ এক জায়গায় হয়, একটা ব্যাপক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, এবং এই দ্বন্দ্বের শহরের মানুষেরই প্রতিনিয়ত এগিয়ে থাকে। আমার কাছে মনে হয়, সেটা যেকোনো জায়গাতেই হোক না কেন, শহরে কিবা গ্রামে। শহরের মানুষের আরও চিত্র দেখতে চান? তবে আর বলা যাবে না, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় শহরের মানুষের যে জীবনবোধ, এই জীবনবোধে আছে বৈচিত্র্যময়তা, গতিময়, পরিবর্তনশীলতা, এবং ভিন্নতা ও ব্যতিক্রমধর্মীর প্রতি ভালবাসা, যেটা আপনি গ্রামীণ মানুষের জীবনবোধে পাবেন না। পার্থক্যটা মূলত এখানেই।

No comments:

Post a Comment

গণতন্ত্র কেন মতাদর্শকে হার মানায়

পৃথিবীতে আসলে political correctness বলে কোনো চূড়ান্ত বিষয় নেই। অর্থাৎ, ডেমোক্রেসিতে কোনো রাজনৈতিক ideology ই শতভাগ সঠিক নয়।  যদি কেউ দাব...